নাফিজ এসেছিল তবে লাশ হয়ে: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক শহীদ
- আপডেট সময় : ০৮:০৮:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

নাফিজ বলেছিল মা আসতেছি। কিন্তু নাফিজ এসেছে, তবে লাশ হয়ে। ২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট দিনটি তার পরিবারের জন্য এক শোকগাঁথা। সেদিন সকাল সাড়ে ৬টায় ঘুম থেকে উঠে মাথায় টুপি দিয়ে পড়তে বসে নাফিজ। মা নাজমা আক্তার তাকে নামাজ পড়তে দেখে জিজ্ঞেস করলে নাফিজ হেসে উত্তর দেয়। রান্নার ফাঁকে নাফিজ বারবার মায়ের কাছে ছুটে গিয়ে রান্না নিয়ে প্রশ্ন করে। মা বেগুন ভাজা দিয়ে ডিম রান্নার কথা জানালে নাফিজ তা পছন্দ করে।
বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পাস করা নাফিজ ঢাকা নৌবাহিনী কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল। মাত্র ১৭ বছর বয়সে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া এই বীর শহীদ ৪ঠা আগস্ট ফার্মগেটে গুলিবিদ্ধ হন। মানবজমিনে প্রকাশিত রিকশার পাদানিতে নাফিজের ছবি দেখে পরিবার তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়। বাবা গোলাম রহমান সন্তানের লাশ বহন করার ভারে এখনো স্তব্ধ হয়ে যান। নাজমা আক্তার জানান, সকাল সাড়ে আটটার দিকে নাফিজ তার কাপড় নিজে ধোয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে মাকে কষ্ট করতে নিষেধ করেছিল। সকাল ১০টার দিকে মা খেতে ডাকলে নাফিজ নিজেই খাবার খেয়ে মেসেঞ্জারে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করছিল।
বাবার বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি দেখে নাফিজ তার কাছে কিছু টাকা বায়না ধরে। বাবা তাকে ২০ টাকা দিলে সে আরও কিছু টাকা চায়। তখন আরও ১০ টাকা হাতে দিয়ে বাবা বলেন, “তুমি কিন্তু একা বাইরে যাবে না। আমি ফিরে এসে তোমাকে বাইরে নিয়ে যাবো।” বাবা বাইরে যাওয়ার সময় নাফিজও বের হয়ে আবার বাসায় ফিরে আসে।
এর মধ্যে নাফিজের ফোনে তিনবার কল আসে তার বন্ধুর। মা নিজেই ফোনটি নাফিজকে ধরিয়ে দেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নাফিজ মায়ের বাধা উপেক্ষা করে বলে, “আমি একটু সামনে থেকে আসিতেছি আম্মু।” বেলা ৩টার দিকে বন্ধুর মোবাইল থেকে ফোন দিয়ে নাফিজ মাকে জানায় সে ‘এক দফা এক দাবির মিছিলে’ আছে। বাসায় ফেরার অনুরোধে সে ‘আসতেছি আম্মু’ বলে ফোন রাখে, যা ছিল তার শেষ কথা।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে কারফিউ শুরুর আগে নাফিজের বড় ভাই ফেসবুক আইডিতে তার নিখোঁজ হওয়ার কথা জানায়। এরপর পরিবারের সদস্যরা তেজগাঁও, কলাবাগান ও শাহবাগ থানায় খোঁজ নিয়ে ঢাকা মেডিকেল ও পিজি হাসপাতালে যায়। কুর্মিটোলা হাসপাতালে যাওয়ার পথে মানবজমিন অফিসের নিচে নাফিজের ভাই রিকশার পাদানিতে তার ছবি দেখতে পায়। পরে ছোট মামার মাধ্যমে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নাফিজের মরদেহ পাওয়ার তথ্য নিশ্চিত হয়।
৫ই আগস্ট ভোরের আলোয় নাফিজকে গোসল করানোর পর তার দাদার বাড়ি দক্ষিণখানে নিয়ে যাওয়া হয়। মা নাজমা আক্তার তার সন্তানের কপালে ও গালে শেষ চুমু খেয়ে বিদায় জানান। জুলাইয়ের শেষ দিকে নাফিজ মাকে বলেছিল, “দেশ পরিবর্তন করতে হলে কাউকে না কাউকে জীবন দিতে হবে।” একজন শহীদের মা হিসেবে নাজমা আক্তারের এখন একটাই চাওয়া, তিনি যেন নাফিজ হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেন এবং ভবিষ্যতে কোনো সরকার ক্ষমতার লোভে যেন আর ছাত্র হত্যা না করে।


























