ঢাকা ০৭:১১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
অনুমতি ছাড়াই প্রাথমিক বৃত্তির ফল প্রকাশ, কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা বোস্টনের মাঠে মরক্কোকে হারিয়ে ফরাসি নীলে রঙিন বিশ্বকাপের আসর আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচে রেফারিং বিতর্ক নিয়ে ফিফার ব্যাখ্যা চীনের জুতা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ২৮ শ্রমিকের মৃত্যুতে জামায়াত আমিরের শোক কোয়ার্টার ফাইনালে ফেভারিট ফ্রান্সের মুখোমুখি মরক্কো বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করতে মুখোমুখি ফ্রান্স ও মরক্কো দেশে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির শুধু হাতবদল হয়েছে: হাসনাত আব্দুল্লাহ ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচের আগে মরক্কোর সংবাদ সম্মেলনে দুই সাংবাদিকের হাতাহাতি চীনের জুতা কারখানায় ভয়াবহ আগুন, নিহত অন্তত ২৮ জন জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন কেপিআই ঘোষণা: নিরাপত্তা জোরদার হচ্ছে

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১২:০৬:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
print news

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজধানীর গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসভবনকে ‘বিশেষ শ্রেণির’ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেপিআই) হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। এই ঘোষণার ফলে বাড়িটি এখন থেকে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থার অধীনে থাকবে এবং এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবন ও এর আশপাশের এলাকায় কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে।

এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন ইতিমধ্যে জারি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গত ৭ জুন কেপিআই–সংক্রান্ত কমিটির (কেপিআইডিসি) মাসিক সভায় গুলশানের এই ভবনটিকে কেপিআই নীতিমালার ‘বিশেষ শ্রেণি’তে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছিল। সরকারের অনুমোদনের পর গত ১৬ জুন এই প্রজ্ঞাপন জারি হয়।

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ছিল গণভবন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতন হলে বিক্ষুব্ধ জনতা গণভবনে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। পরবর্তীকালে অন্তর্বর্তী সরকার গণভবনকে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং সেখানে জাদুঘরের নির্মাণকাজ শেষে উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর থাকার সুযোগ নেই।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার পর থেকে গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাড়িতে অবস্থান করছেন। ১৯৮১ সালের ৩১ মে রাষ্ট্রপতি থাকাকালে জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর গুলশানের প্রায় দেড় বিঘা জমির ওপর নির্মিত এই বাড়িটি তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়াকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, যদিও তাঁর নামে নামজারি করা ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বছরের ৫ জুন খালেদা জিয়ার নামে বাড়িটি নামজারি করা হয় এবং পরে এটি সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হয়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই এই বাড়িতে থেকে সরকারি কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। যদিও রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা সরকারি কাজের জন্য প্রস্তুত রয়েছে, তিনি সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন না। এই পরিস্থিতিতে, নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনকে কেপিআইয়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

কেপিআই হলো এমন স্থাপনা বা অবকাঠামো, যার নিরাপত্তা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেপিআই নিরাপত্তা নীতিমালা অনুযায়ী, যেসব স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের যুদ্ধ, প্রতিরক্ষা বা অর্থনৈতিক সামর্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সেগুলোকে কেপিআই হিসেবে গণ্য করা হয়। বঙ্গভবন, সচিবালয়, জাতীয় সংসদ, বিমানবন্দর এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো স্থাপনাগুলো বর্তমানে কেপিআইয়ের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

কোনো স্থাপনা কেপিআই হবে, তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নীতিমালার ভিত্তিতে ঘোষণা করে। বাংলাদেশে কেপিআইয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ১৯৯৭ সালে ইংরেজিতে ‘ইনস্ট্রাকশন ফর সিকিউরিটি অব কেপিআই ইন বাংলাদেশ’ প্রণয়ন করা হয়েছিল, যা পরে হালনাগাদ করে বাংলা ভাষায় ‘কেপিআই নিরাপত্তা নীতিমালা-২০১৩’ জারি করা হয়। এই নীতিমালার অধীনে কেপিআই ডিফেন্স কমিটি গঠিত হয়, যা নতুন কেপিআই অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেওয়া এবং স্থাপনাগুলোর মান উন্নয়নের সুপারিশ করে।

নাশকতা, সন্ত্রাসী হামলা বা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে কোনো স্থাপনাকে রক্ষা করার জন্যই সরকার কেপিআই ঘোষণা করে। কোনো স্থাপনাকে কেপিআই ঘোষণা করা হলে ভবনটির ভেতরে ও বাইরে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। প্রতিটি কেপিআই স্থাপনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একজন মনোনীত কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকেন, যিনি নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সব নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়ন করেন।

নীতিমালা অনুসারে, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোকে কেপিআইয়ের সাধারণ এলাকা থেকে আলাদা রাখতে হয় এবং এসব স্থানে প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় পুলিশ বা বিশেষ শাখার (এসবি) মাধ্যমে পরিচয় যাচাই করা হয়। বিশেষ ক্ষেত্রে, কেপিআইগুলোতে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের গতিবিধি ও কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

কেপিআই স্থাপনার নিরাপত্তাবেষ্টনী মজবুত প্রাচীর বা বেড়া দিয়ে তৈরি করতে হয়। রাতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং শ্রেণিভেদে ভবনের ভেতরে-বাইরে আসা-যাওয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য সশস্ত্র প্রহরার ব্যবস্থা রাখা হয়। কেপিআই এলাকায় কোনো অবৈধ স্থাপনা যাতে নির্মিত না হয়, তা নিশ্চিত করা হয়। এছাড়া, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে নিরাপদে রাখার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বিশেষ শ্রেণি ছাড়া অন্য সব শ্রেণির স্থাপনার নিরাপত্তার জন্য বিশেষায়িত পুলিশের ব্যবস্থা রাখা হয় এবং এর যাবতীয় ব্যয়ভার স্থাপনা কর্তৃপক্ষকে বহন করতে হয়।

কেপিআইগুলোর মধ্যে ‘বিশেষ শ্রেণি’ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নীতিমালায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের কার্যালয় ও বাসভবন বিশেষ শ্রেণির কেপিআই হিসেবে বিবেচিত হবে। এই নীতিমালাকে বিশেষ শ্রেণির কেপিআইয়ের নিরাপত্তা নীতিমালা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গুলশানের বাসভবনকে এই ‘বিশেষ শ্রেণির’ কেপিআই ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষ শ্রেণির কেপিআইগুলোর কার্যক্রম ও সেবা দেশের যুদ্ধ-সামর্থ্য ও জাতীয় গুরুত্বের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে জাতীয় অর্থনীতি বা প্রতিরক্ষা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিশেষ শ্রেণির কেপিআইয়ের সার্বিক নিরাপত্তা চারটি ভাগে (আঙিনা, কর্মকর্তা ও কর্মচারী, তথ্য ও দলিলপত্র এবং বিবিধ) ভাগ করে নিশ্চিত করা হয়। এ বিষয়গুলো তদারক করার জন্য স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) সমন্বয়ে একটি নিরাপত্তা কমিটি গঠিত হয়। নীতিমালায় বলা হয়েছে, বিশেষ শ্রেণির কেপিআই স্থাপনার সীমানাপ্রাচীরের উচ্চতা হবে ১২ ফুট এবং তার ওপর ৩ ফুট ‘ওয়াই’ আকৃতির কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করতে হবে। সীমানাপ্রাচীর সংলগ্ন ৩৩ ইঞ্চি আরসিসি ঢালাই দিতে হবে। নিকটস্থ সুউচ্চ ভবন, যেখান থেকে ছবি তোলা যায় বা বন্দুকের নিশানার আওতায় পড়ে, তা নজরদারিতে রাখা হয়।

বাসভবনের আঙিনা ও বাইরের নিরাপত্তার জন্য, সীমানাপ্রাচীর থেকে ২৫ মিটারের মধ্যে কোনো ভবন বা স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না, তবে অনুমতি সাপেক্ষে সর্বোচ্চ একতলা ভবন নির্মাণ করা যেতে পারে। সীমানাপ্রাচীর থেকে ১৫০ মিটারের মধ্যে দুই তলার বেশি কোনো ভবন নির্মাণ করা যাবে না। সীমানাপ্রাচীর থেকে ১৫০ থেকে ৩০০ মিটারের মধ্যে ২৫ ফুটের অধিক উচ্চতাসম্পন্ন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কেপিআই ডিফেন্স কমিটির (কেপিআইডিসি) মতামত নিতে হবে। এছাড়াও, বঙ্গভবন, গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের ৫০০ মিটারের মধ্যে ৮.৭৫ মিটারের বেশি উচ্চতাসম্পন্ন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর ছাড়পত্রও প্রয়োজন হবে।

সীমানাদেয়ালের ভেতরে ও বাইরে ৫ ফুটের মধ্যে থাকা গাছপালা পরিষ্কার করা এবং বৈদ্যুতিক লাইট পোস্ট ও টেলিফোন পোস্ট সরিয়ে ফেলার নির্দেশ রয়েছে। সীমানাপ্রচীর থেকে ৩০ মিটার বা তার বেশি দূরত্বে কোনো সুড়ঙ্গপথ তৈরি করে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা রোধে গোয়েন্দা সংস্থার নিবিড় পর্যবেক্ষণ থাকবে।

বিশেষ শ্রেণির কেপিআই ভবনে প্রবেশপথের সংখ্যা সীমিত রাখতে হবে এবং জরুরি প্রয়োজনে একাধিক প্রবেশপথ ব্যবহার করা হলে তা সিলগালা করে বন্ধ রাখতে হবে। প্রবেশপথে কাঁটাতারের বেড়া এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে তা ডিঙিয়ে কেউ প্রবেশ করতে না পারে। এই ধরনের কেপিআইয়ের ওপর দিয়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক তার বা কোনো ফ্লাইওভার নির্মাণ করা যাবে না। কেপিআই সংলগ্ন এলাকায় পার্ক, ভবন, সড়কে পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করার পাশাপাশি সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারার ব্যবস্থা থাকতে হবে। রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের কার্যালয় এবং বাসভবনকে ‘নো ফ্লাইং জোন’ ঘোষণা করা হবে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গোয়েন্দা নজরদারির জন্য এনএসআই, ডিজিএফআই এবং এসবি-র প্রশিক্ষিত সদস্যদের সমন্বয়ে একটি ইন্টেলিজেন্স সেল গঠন করতে হবে, যা নিরাপত্তা-সম্পর্কিত তথ্য এসএসএফকে জানাবে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রেসিডেনশিয়াল গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর) এবং বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ নিয়োজিত থাকবে।

সীমানাপ্রাচীরের কাছাকাছি ১৫ থেকে ২০ ফুট উচ্চতার প্রহরাচৌকি থাকবে, যেখানে বাইনোকুলারসহ সশস্ত্র নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োজিত থাকবেন। নিরাপত্তা সদস্যরা দিনে-রাতে টহল দেবেন। সাক্ষাৎপ্রার্থীদের জন্য পাস ইস্যু করা হবে এবং ফটকে নিরাপত্তা তল্লাশির ব্যবস্থা থাকবে। অনুমতি ছাড়া এই এলাকায় ছবি বা ভিডিও ধারণ করা নিষিদ্ধ থাকবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন কেপিআই ঘোষণা: নিরাপত্তা জোরদার হচ্ছে

আপডেট সময় : ১২:০৬:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬
print news

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজধানীর গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসভবনকে ‘বিশেষ শ্রেণির’ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেপিআই) হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। এই ঘোষণার ফলে বাড়িটি এখন থেকে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থার অধীনে থাকবে এবং এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবন ও এর আশপাশের এলাকায় কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে।

এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন ইতিমধ্যে জারি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গত ৭ জুন কেপিআই–সংক্রান্ত কমিটির (কেপিআইডিসি) মাসিক সভায় গুলশানের এই ভবনটিকে কেপিআই নীতিমালার ‘বিশেষ শ্রেণি’তে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছিল। সরকারের অনুমোদনের পর গত ১৬ জুন এই প্রজ্ঞাপন জারি হয়।

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ছিল গণভবন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতন হলে বিক্ষুব্ধ জনতা গণভবনে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। পরবর্তীকালে অন্তর্বর্তী সরকার গণভবনকে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং সেখানে জাদুঘরের নির্মাণকাজ শেষে উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর থাকার সুযোগ নেই।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার পর থেকে গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাড়িতে অবস্থান করছেন। ১৯৮১ সালের ৩১ মে রাষ্ট্রপতি থাকাকালে জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর গুলশানের প্রায় দেড় বিঘা জমির ওপর নির্মিত এই বাড়িটি তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়াকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, যদিও তাঁর নামে নামজারি করা ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বছরের ৫ জুন খালেদা জিয়ার নামে বাড়িটি নামজারি করা হয় এবং পরে এটি সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হয়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই এই বাড়িতে থেকে সরকারি কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। যদিও রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা সরকারি কাজের জন্য প্রস্তুত রয়েছে, তিনি সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন না। এই পরিস্থিতিতে, নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনকে কেপিআইয়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

কেপিআই হলো এমন স্থাপনা বা অবকাঠামো, যার নিরাপত্তা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেপিআই নিরাপত্তা নীতিমালা অনুযায়ী, যেসব স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের যুদ্ধ, প্রতিরক্ষা বা অর্থনৈতিক সামর্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সেগুলোকে কেপিআই হিসেবে গণ্য করা হয়। বঙ্গভবন, সচিবালয়, জাতীয় সংসদ, বিমানবন্দর এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো স্থাপনাগুলো বর্তমানে কেপিআইয়ের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

কোনো স্থাপনা কেপিআই হবে, তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নীতিমালার ভিত্তিতে ঘোষণা করে। বাংলাদেশে কেপিআইয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ১৯৯৭ সালে ইংরেজিতে ‘ইনস্ট্রাকশন ফর সিকিউরিটি অব কেপিআই ইন বাংলাদেশ’ প্রণয়ন করা হয়েছিল, যা পরে হালনাগাদ করে বাংলা ভাষায় ‘কেপিআই নিরাপত্তা নীতিমালা-২০১৩’ জারি করা হয়। এই নীতিমালার অধীনে কেপিআই ডিফেন্স কমিটি গঠিত হয়, যা নতুন কেপিআই অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেওয়া এবং স্থাপনাগুলোর মান উন্নয়নের সুপারিশ করে।

নাশকতা, সন্ত্রাসী হামলা বা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে কোনো স্থাপনাকে রক্ষা করার জন্যই সরকার কেপিআই ঘোষণা করে। কোনো স্থাপনাকে কেপিআই ঘোষণা করা হলে ভবনটির ভেতরে ও বাইরে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। প্রতিটি কেপিআই স্থাপনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একজন মনোনীত কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকেন, যিনি নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সব নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়ন করেন।

নীতিমালা অনুসারে, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোকে কেপিআইয়ের সাধারণ এলাকা থেকে আলাদা রাখতে হয় এবং এসব স্থানে প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় পুলিশ বা বিশেষ শাখার (এসবি) মাধ্যমে পরিচয় যাচাই করা হয়। বিশেষ ক্ষেত্রে, কেপিআইগুলোতে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের গতিবিধি ও কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

কেপিআই স্থাপনার নিরাপত্তাবেষ্টনী মজবুত প্রাচীর বা বেড়া দিয়ে তৈরি করতে হয়। রাতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং শ্রেণিভেদে ভবনের ভেতরে-বাইরে আসা-যাওয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য সশস্ত্র প্রহরার ব্যবস্থা রাখা হয়। কেপিআই এলাকায় কোনো অবৈধ স্থাপনা যাতে নির্মিত না হয়, তা নিশ্চিত করা হয়। এছাড়া, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে নিরাপদে রাখার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বিশেষ শ্রেণি ছাড়া অন্য সব শ্রেণির স্থাপনার নিরাপত্তার জন্য বিশেষায়িত পুলিশের ব্যবস্থা রাখা হয় এবং এর যাবতীয় ব্যয়ভার স্থাপনা কর্তৃপক্ষকে বহন করতে হয়।

কেপিআইগুলোর মধ্যে ‘বিশেষ শ্রেণি’ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নীতিমালায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের কার্যালয় ও বাসভবন বিশেষ শ্রেণির কেপিআই হিসেবে বিবেচিত হবে। এই নীতিমালাকে বিশেষ শ্রেণির কেপিআইয়ের নিরাপত্তা নীতিমালা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গুলশানের বাসভবনকে এই ‘বিশেষ শ্রেণির’ কেপিআই ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষ শ্রেণির কেপিআইগুলোর কার্যক্রম ও সেবা দেশের যুদ্ধ-সামর্থ্য ও জাতীয় গুরুত্বের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে জাতীয় অর্থনীতি বা প্রতিরক্ষা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিশেষ শ্রেণির কেপিআইয়ের সার্বিক নিরাপত্তা চারটি ভাগে (আঙিনা, কর্মকর্তা ও কর্মচারী, তথ্য ও দলিলপত্র এবং বিবিধ) ভাগ করে নিশ্চিত করা হয়। এ বিষয়গুলো তদারক করার জন্য স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) সমন্বয়ে একটি নিরাপত্তা কমিটি গঠিত হয়। নীতিমালায় বলা হয়েছে, বিশেষ শ্রেণির কেপিআই স্থাপনার সীমানাপ্রাচীরের উচ্চতা হবে ১২ ফুট এবং তার ওপর ৩ ফুট ‘ওয়াই’ আকৃতির কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করতে হবে। সীমানাপ্রাচীর সংলগ্ন ৩৩ ইঞ্চি আরসিসি ঢালাই দিতে হবে। নিকটস্থ সুউচ্চ ভবন, যেখান থেকে ছবি তোলা যায় বা বন্দুকের নিশানার আওতায় পড়ে, তা নজরদারিতে রাখা হয়।

বাসভবনের আঙিনা ও বাইরের নিরাপত্তার জন্য, সীমানাপ্রাচীর থেকে ২৫ মিটারের মধ্যে কোনো ভবন বা স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না, তবে অনুমতি সাপেক্ষে সর্বোচ্চ একতলা ভবন নির্মাণ করা যেতে পারে। সীমানাপ্রাচীর থেকে ১৫০ মিটারের মধ্যে দুই তলার বেশি কোনো ভবন নির্মাণ করা যাবে না। সীমানাপ্রাচীর থেকে ১৫০ থেকে ৩০০ মিটারের মধ্যে ২৫ ফুটের অধিক উচ্চতাসম্পন্ন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কেপিআই ডিফেন্স কমিটির (কেপিআইডিসি) মতামত নিতে হবে। এছাড়াও, বঙ্গভবন, গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের ৫০০ মিটারের মধ্যে ৮.৭৫ মিটারের বেশি উচ্চতাসম্পন্ন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর ছাড়পত্রও প্রয়োজন হবে।

সীমানাদেয়ালের ভেতরে ও বাইরে ৫ ফুটের মধ্যে থাকা গাছপালা পরিষ্কার করা এবং বৈদ্যুতিক লাইট পোস্ট ও টেলিফোন পোস্ট সরিয়ে ফেলার নির্দেশ রয়েছে। সীমানাপ্রচীর থেকে ৩০ মিটার বা তার বেশি দূরত্বে কোনো সুড়ঙ্গপথ তৈরি করে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা রোধে গোয়েন্দা সংস্থার নিবিড় পর্যবেক্ষণ থাকবে।

বিশেষ শ্রেণির কেপিআই ভবনে প্রবেশপথের সংখ্যা সীমিত রাখতে হবে এবং জরুরি প্রয়োজনে একাধিক প্রবেশপথ ব্যবহার করা হলে তা সিলগালা করে বন্ধ রাখতে হবে। প্রবেশপথে কাঁটাতারের বেড়া এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে তা ডিঙিয়ে কেউ প্রবেশ করতে না পারে। এই ধরনের কেপিআইয়ের ওপর দিয়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক তার বা কোনো ফ্লাইওভার নির্মাণ করা যাবে না। কেপিআই সংলগ্ন এলাকায় পার্ক, ভবন, সড়কে পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করার পাশাপাশি সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারার ব্যবস্থা থাকতে হবে। রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের কার্যালয় এবং বাসভবনকে ‘নো ফ্লাইং জোন’ ঘোষণা করা হবে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গোয়েন্দা নজরদারির জন্য এনএসআই, ডিজিএফআই এবং এসবি-র প্রশিক্ষিত সদস্যদের সমন্বয়ে একটি ইন্টেলিজেন্স সেল গঠন করতে হবে, যা নিরাপত্তা-সম্পর্কিত তথ্য এসএসএফকে জানাবে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রেসিডেনশিয়াল গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর) এবং বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ নিয়োজিত থাকবে।

সীমানাপ্রাচীরের কাছাকাছি ১৫ থেকে ২০ ফুট উচ্চতার প্রহরাচৌকি থাকবে, যেখানে বাইনোকুলারসহ সশস্ত্র নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োজিত থাকবেন। নিরাপত্তা সদস্যরা দিনে-রাতে টহল দেবেন। সাক্ষাৎপ্রার্থীদের জন্য পাস ইস্যু করা হবে এবং ফটকে নিরাপত্তা তল্লাশির ব্যবস্থা থাকবে। অনুমতি ছাড়া এই এলাকায় ছবি বা ভিডিও ধারণ করা নিষিদ্ধ থাকবে।