ঢাকা ০১:৫৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
দুই সপ্তাহেও কাটেনি গ্যাস সংকট, বিপাকে শিল্প ও আবাসিক খাত শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর ফরিদপুরের নগরকান্দায় ৯ বছরের শিশু হত্যা: তদন্তে আটক ২ বনানীর ফুডকোর্টকে খালি জায়গা দেখিয়ে বিএনপি নেতাকে ভাড়া দিল ডিএনসিসি আগস্টেই যোগদানের দাবিতে শাহবাগে অবস্থান নিলেন ১৪ হাজার শিক্ষক রাজধানীর কাঁঠালবাগানে জামাতার ছুরিকাঘাতে মা ও মেয়ে নিহত ইরানে হামলার পরিকল্পনা নিয়ে ট্রাম্পকে সতর্ক করলেন সৌদি যুবরাজ পুলিশ কোনো দলের লাঠিয়াল বাহিনী নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভাবের অন্ধকার পেরিয়ে শিলার শিক্ষিকা হওয়ার অনুপ্রেরণামূলক গল্প প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৪ হাজার ৩৮৪ শিক্ষকের যোগদান ১ অক্টোবর

দাসপ্রথার করুণ ইতিহাস: উত্থান, বিস্তার ও বিলোপের সংগ্রাম

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১০:০৫:২৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
print news

মানবসভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম অমানবিক প্রথা ছিল দাসপ্রথা। হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন সভ্যতা, সাম্রাজ্য ও উপনিবেশে মানুষকে সম্পত্তির মতো কেনাবেচা করা হতো। যুদ্ধবন্দি, ঋণগ্রস্ত বা অপহৃত মানুষকে জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত রাখা হতো এবং তাদের কোনো মৌলিক অধিকার ছিল না। দীর্ঘ আন্দোলন, বিদ্রোহ ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ প্রথার অবসান ঘটে।

দাসপ্রথা এমন একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে একজন মানুষ অন্য একজন ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের মালিকানাধীন সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হতেন। দাসদের কেনাবেচা করা যেত, উত্তরাধিকারসূত্রে হস্তান্তর করা হতো এবং মালিকের অনুমতি ছাড়া তারা কোথাও যেতে বা নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। ইতিহাসবিদদের মতে, দাসপ্রথার সূচনা প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার বছর আগে, প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, মিশর, গ্রিস ও রোমান সভ্যতার সময়। যুদ্ধবন্দিদের শ্রমে ব্যবহার থেকেই এ ব্যবস্থার বিস্তার ঘটে। পরে এটি ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

১৫শ শতাব্দী থেকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো আফ্রিকা থেকে লাখ লাখ মানুষকে ধরে বা কিনে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে নিয়ে যেতে শুরু করে। ইতিহাসে এটি ট্রান্স-আটলান্টিক দাস বাণিজ্য নামে পরিচিত। ধারণা করা হয়, ১৫শ থেকে ১৯শ শতাব্দীর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ আফ্রিকানকে জোরপূর্বক দাস হিসেবে জাহাজে তোলা হয়েছিল। তাদের মধ্যে বহু মানুষ সমুদ্রযাত্রার সময়ই প্রাণ হারান। দাসদের পরিবার ভেঙে বিক্রি করে দেওয়া, সন্তানদের আলাদা করে নেওয়া এবং মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা ছিল এ ব্যবস্থার নির্মম বাস্তবতা।

১৮শ শতাব্দীর শেষ দিকে ইউরোপ ও আমেরিকায় দাসপ্রথার বিরুদ্ধে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে ওঠে। উইলিয়াম উইলবারফোর্স, থমাস ক্লার্কসনসহ বহু সমাজসংস্কারক ও মানবাধিকারকর্মী এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। একই সময়ে দাসদের বিভিন্ন বিদ্রোহও দাসপ্রথা বিলোপের দাবিকে আরও জোরালো করে।

দাসপ্রথার অবসান একদিনে হয়নি; বিভিন্ন দেশে ভিন্ন সময়ে এটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১৮০৭ সালে ব্রিটেন দাস বাণিজ্য নিষিদ্ধ করে। ১৮৩৩ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট Slavery Abolition Act পাস করে এবং ১৮৩৪ সালের ১ আগস্ট থেকে অধিকাংশ ব্রিটিশ উপনিবেশে দাসপ্রথা বিলোপ কার্যকর হয়। ১৮৪৮ সালে ফ্রান্স তাদের উপনিবেশে দাসপ্রথা বিলোপ করে। ১৮৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র সংবিধানের ১৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে দাসপ্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করে। ১৮৮৬ সালে কিউবা এবং ১৮৮৮ সালে ব্রাজিল দাসপ্রথা বিলোপ করে। ব্রাজিল ছিল পশ্চিমা বিশ্বের শেষ দেশ, যেখানে আইনিভাবে দাসপ্রথার অবসান ঘটে।

দাসপ্রথা শুধু একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ছিল না; এটি ছিল মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার হরণের এক ভয়াবহ অধ্যায়। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা আজও আধুনিক দাসত্ব, মানবপাচার ও জোরপূর্বক শ্রমের বিরুদ্ধে কাজ করছে। দাসপ্রথার ইতিহাস মানবজাতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা, সাম্য ও মানবাধিকারের জন্য সংগ্রাম কখনো থেমে থাকে না।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

নিউজটি শেয়ার করুন

দাসপ্রথার করুণ ইতিহাস: উত্থান, বিস্তার ও বিলোপের সংগ্রাম

আপডেট সময় : ১০:০৫:২৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬
print news

মানবসভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম অমানবিক প্রথা ছিল দাসপ্রথা। হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন সভ্যতা, সাম্রাজ্য ও উপনিবেশে মানুষকে সম্পত্তির মতো কেনাবেচা করা হতো। যুদ্ধবন্দি, ঋণগ্রস্ত বা অপহৃত মানুষকে জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত রাখা হতো এবং তাদের কোনো মৌলিক অধিকার ছিল না। দীর্ঘ আন্দোলন, বিদ্রোহ ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ প্রথার অবসান ঘটে।

দাসপ্রথা এমন একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে একজন মানুষ অন্য একজন ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের মালিকানাধীন সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হতেন। দাসদের কেনাবেচা করা যেত, উত্তরাধিকারসূত্রে হস্তান্তর করা হতো এবং মালিকের অনুমতি ছাড়া তারা কোথাও যেতে বা নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। ইতিহাসবিদদের মতে, দাসপ্রথার সূচনা প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার বছর আগে, প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, মিশর, গ্রিস ও রোমান সভ্যতার সময়। যুদ্ধবন্দিদের শ্রমে ব্যবহার থেকেই এ ব্যবস্থার বিস্তার ঘটে। পরে এটি ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

১৫শ শতাব্দী থেকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো আফ্রিকা থেকে লাখ লাখ মানুষকে ধরে বা কিনে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে নিয়ে যেতে শুরু করে। ইতিহাসে এটি ট্রান্স-আটলান্টিক দাস বাণিজ্য নামে পরিচিত। ধারণা করা হয়, ১৫শ থেকে ১৯শ শতাব্দীর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ আফ্রিকানকে জোরপূর্বক দাস হিসেবে জাহাজে তোলা হয়েছিল। তাদের মধ্যে বহু মানুষ সমুদ্রযাত্রার সময়ই প্রাণ হারান। দাসদের পরিবার ভেঙে বিক্রি করে দেওয়া, সন্তানদের আলাদা করে নেওয়া এবং মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা ছিল এ ব্যবস্থার নির্মম বাস্তবতা।

১৮শ শতাব্দীর শেষ দিকে ইউরোপ ও আমেরিকায় দাসপ্রথার বিরুদ্ধে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে ওঠে। উইলিয়াম উইলবারফোর্স, থমাস ক্লার্কসনসহ বহু সমাজসংস্কারক ও মানবাধিকারকর্মী এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। একই সময়ে দাসদের বিভিন্ন বিদ্রোহও দাসপ্রথা বিলোপের দাবিকে আরও জোরালো করে।

দাসপ্রথার অবসান একদিনে হয়নি; বিভিন্ন দেশে ভিন্ন সময়ে এটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১৮০৭ সালে ব্রিটেন দাস বাণিজ্য নিষিদ্ধ করে। ১৮৩৩ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট Slavery Abolition Act পাস করে এবং ১৮৩৪ সালের ১ আগস্ট থেকে অধিকাংশ ব্রিটিশ উপনিবেশে দাসপ্রথা বিলোপ কার্যকর হয়। ১৮৪৮ সালে ফ্রান্স তাদের উপনিবেশে দাসপ্রথা বিলোপ করে। ১৮৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র সংবিধানের ১৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে দাসপ্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করে। ১৮৮৬ সালে কিউবা এবং ১৮৮৮ সালে ব্রাজিল দাসপ্রথা বিলোপ করে। ব্রাজিল ছিল পশ্চিমা বিশ্বের শেষ দেশ, যেখানে আইনিভাবে দাসপ্রথার অবসান ঘটে।

দাসপ্রথা শুধু একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ছিল না; এটি ছিল মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার হরণের এক ভয়াবহ অধ্যায়। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা আজও আধুনিক দাসত্ব, মানবপাচার ও জোরপূর্বক শ্রমের বিরুদ্ধে কাজ করছে। দাসপ্রথার ইতিহাস মানবজাতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা, সাম্য ও মানবাধিকারের জন্য সংগ্রাম কখনো থেমে থাকে না।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin