নেপালে সুড়ঙ্গ থেকে বেঁচে ফিরেও সব হারিয়েছেন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের শ্রমিকেরা
- আপডেট সময় : ০২:৪০:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

নেপালের ত্রিশূলী নদীর ওপর নির্মাণাধীন ‘আপার ত্রিশূলী ৩বি’ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গে তখন কাজ করছিলেন প্রায় ৩০ জনের একটি দল। হঠাৎ করেই সুড়ঙ্গের ভেতরে তীব্র বাতাসের ঝাপটা এসে লাগে। বাতাসের গতিবেগ এতটাই প্রবল ছিল যে সেখানে রাখা প্লাইউডের পাতগুলো উড়ে যায় এবং ভারী যন্ত্রপাতিগুলোও নিজেদের জায়গা থেকে সরে যেতে শুরু করে। এর পরপরই সুড়ঙ্গের ভেতরে হুড়মুড়িয়ে পানি ঢুকতে শুরু করে। এভাবেই গত সপ্তাহের সেই প্রলয়ংকরী ও প্রাণঘাতী পাহাড়ি ঢলের মুহূর্তের কথা মনে করছিলেন অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা শ্রমিক পেমবা দুনদু তামাং।
বিপদ আঁচ করতে পেরে সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখের দিকে দৌড়াতে শুরু করেছিলেন তামাং। তাঁর পেছনের দিকে ধেয়ে আসছিল ঢলের পানি। প্রাণ বাঁচাতে প্রায় ২০ মিনিট দৌড়ে পাহাড়ের ওপরের দিকে উঠে যান তিনি। ওই সময় আঘাত পেয়ে প্রায় অচেতন হয়ে পড়েছিলেন এবং ঠিকমতো চিন্তাও করতে পারছিলেন না। তাঁর সহকর্মী ইথা ঘালে জানান, দৌড়ানোর সময় বাতাসের প্রবল ঝাপটা তাঁদের প্রায় উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তামাংয়ের ধারণা, তাঁর সঙ্গে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন সুড়ঙ্গ থেকে বের হতে পেরেছিলেন, তবে বাকিরা হয়তো ভেতরেই আটকা পড়েছেন। সুড়ঙ্গ থেকে বের হওয়ার পর তাঁরা শান্তিবাজার নামের একটি গ্রামে আশ্রয় নেন এবং দুই দিন সেখানে থাকার পর সেনাবাহিনী তাঁদের উদ্ধার করে।
সুড়ঙ্গ থেকে বেঁচে ফিরলেও তামাং ও ঘালে মুখোমুখি হয়েছেন এক চরম ও নির্মম বাস্তবতার। তামাং যখন বাড়ির দিকে তাকান, তখন দেখেন সেখানে কিছুই অবশিষ্ট নেই। এই দুর্যোগে তামাং তাঁর পরিবারের ছয় সদস্যকে হারিয়েছেন, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন তাঁর মা, বড় ভাই, ভাবি ও তাঁদের তিন সন্তান। ঢলের সময় তাঁরা নদীর তীরে নিজেদের বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। তামাংয়ের স্ত্রী, ছেলে ও এক ভাতিজা অবশ্য বেঁচে গেছেন। স্বজন ও ঘরবাড়ি হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়া তামাং বলেন, এখন তাঁর কাছে জীবন অর্থহীন মনে হয় এবং বেঁচে থাকাটাই কষ্টের। তাঁর ভাষায়, যারা মারা গেছেন তারা শান্তিতে আছেন, আর কষ্ট রয়ে গেছে কেবল বেঁচে থাকাদের জন্য। একই প্রকল্পে কাজ করা ইথা ঘালে তাঁর মা ও বড় মেয়েসহ পরিবারের আট সদস্যকে হারিয়েছেন, যদিও তাঁর স্ত্রী ও তিন ছেলে বেঁচে আছেন।
নেপালে উৎপাদিত বিদ্যুতের ৯৯ শতাংশের বেশি আসে জলবিদ্যুৎ থেকে। আপার ত্রিশূলী ৩বি প্রকল্পটি আগামী বছর চালু হওয়ার কথা ছিল, যার উৎপাদিত বিদ্যুৎ যুক্ত হতো নেপালের জাতীয় গ্রিডে। এখন ঘরবাড়ি ও স্বজন হারানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ভুগছেন তামাং। তিনি বলেন, এভাবে চলতে থাকলে তাঁদের না খেয়ে থাকতে হবে। কখনো কখনো তাঁর মনে হয়, বেঁচে না থাকলেই হয়তো ভালো হতো। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা আগে থেকে থাকলে আরও অনেক মানুষকে বাঁচানো যেত বলে তিনি মনে করেন।
নেপালে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিহত মানুষের সংখ্যা এরই মধ্যে হাজার ছাড়িয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন চার হাজারের বেশি মানুষ। নিখোঁজদের মধ্যে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া কয়েক শ শ্রমিক রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আটকে পড়া শ্রমিকদের কাছে পৌঁছাতে এবং উদ্ধার অভিযান জোরদার করতে প্রকৌশলীরা সুড়ঙ্গগুলোতে বাতাস সরবরাহের কাজ করছেন। নেপালের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত জানিয়েছেন, সেনারা সুড়ঙ্গগুলোয় অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজ চালানোর পাশাপাশি মরদেহ উদ্ধার এবং রোগব্যাধির বিস্তার ঠেকাতে কাজ করছেন। গত মঙ্গলবার সেনাবাহিনী ১১৯ জনকে উদ্ধার করেছে। বর্তমানে চীন, নেপাল ও ভারতের বিশেষজ্ঞরা একযোগে খননযন্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুর্যোগের কয়েক দিন আগেই হিমবাহের আশপাশে কিছু অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবিতে দেখা গেছে, হিমবাহের ওপরের অংশ দ্রুত সরে যাচ্ছিল, বরফ গলে জমা পানি বাদামি হয়ে উঠছিল এবং পাহাড়ি পাথরে ফাটল দেখা দিয়েছিল। এশিয়ান মাউন্টেন একাডেমিক অ্যালায়েন্স, স্টিমসন সেন্টার এবং চীনের ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেন হ্যাজার্ডস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের বিশেষজ্ঞরা জানান, এগুলো পাহাড়ের ঢালে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আগাম লক্ষণ ছিল। তবে পাহাড়ি ঢলটি এতটাই দ্রুত ও তীব্র গতিতে নেমে এসেছিল যে প্রচলিত সতর্কব্যবস্থা দিয়ে কাছের মানুষদের দ্রুত সতর্ক করা সম্ভব হয়নি। তবে ভাটির দিকে পানি পৌঁছাতে অন্তত ১০ মিনিট সময় লেগেছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেখানে একটি সমন্বিত ও উন্নত আগাম সতর্কব্যবস্থা থাকলে আরও বহু মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো।




























