ঢাকা ০৫:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
থাইল্যান্ডে জ্যেষ্ঠ নেতাকে হত্যার পর ক্ষমা চাইলেন সাবেক এমপি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে যুক্ত হলো ২১টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ইরানের যুদ্ধকবলিত জনজীবন: বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এল এক ভিন্ন চিত্র এসএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগে ছেলেদের ফলাফলে বড় অবনমন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন করে সাজাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আহ্বান বিএনপির সব পরিকল্পনা ও কর্মসূচি জনবান্ধব: প্রধানমন্ত্রী আখাউড়ায় এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেলেন ৪১ শিক্ষার্থী ফ্যাসিবাদ রুখতে ২০২৪ এর মতো ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক জামায়াত আমিরের ভঙ্গুর রাষ্ট্র পুনর্গঠনে এসডিজি বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিলেন প্রধানমন্ত্রী ইস্যু থাকবে, সমাধানও হবে: দীনেশ ত্রিবেদী

ইরানের যুদ্ধকবলিত জনজীবন: বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এল এক ভিন্ন চিত্র

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:৪৯:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
print news

বিবিসির জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদক নওয়াল আল-মাগাফির ইরান সফরের এই প্রতিবেদনে যুদ্ধের বহুমুখী প্রভাব উঠে এসেছে। মিনাবের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ধ্বংসস্তূপ, বন্দর আব্বাসের অচলাবস্থা ও তেহরানের জনসমাগম ঘুরে তিনি যুদ্ধকবলিত ইরানের সাধারণ মানুষের ভাবনা বুঝতে চেষ্টা করেছেন। বিবিসির ‘গ্লোবাল আই’-এর জন্য করা প্রতিবেদনটি দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত হয়েছে।

মিনাবের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পাঁচ মাস পরও খননযন্ত্র দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে। সেখানে এখনো এক শিশুর মরদেহ চাপা পড়ে আছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। খননযন্ত্রটি হঠাৎ থেমে গেলে শ্রমিকেরা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে একটি শিশুর খাতা বের করেন। প্রচ্ছদে লেখা ছিল মাহিয়া সালারি, যার বয়স ছিল আট বছর। মিনাবের প্রসিকিউটর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দিনে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় এখানে ১৫৬ জন নিহত হন, যার মধ্যে ১২০ জনই শিশু।

শহরজুড়ে দেয়াল, দোকানের শাটার আর রাস্তার ধারের বিলবোর্ডে টাঙানো রয়েছে মৃত মানুষের ছবি। মিনাব শহরটি যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগ ও কষ্টের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক আমাইনে নাদেমি বলেন, এটিকে আর স্কুল বলা যায় না; এখানে শুধু দেয়ালগুলো দাঁড়িয়ে আছে, যেগুলো থেকে মৃত্যু, শোক আর রক্তের গন্ধ ভেসে আসে। হামলার পর শিক্ষার্থীদের বাবা-মায়ের খালি পায়ে ভবনটির দিকে ছুটে আসার কথা স্মরণ করেন তিনি। রেড ক্রিসেন্টের উদ্ধারকর্মী রেজা বেসারাতি জানান, হামলার সেই সকালের ঘটনা এখনো তাঁর চোখে ভাসে।

মিনাবের কবরস্থানে সারিবদ্ধ ছোট ছোট কবরের মাঝখান দিয়ে শিশুরা ছোটাছুটি করছে। মাসুমেহ মেহরান শেখাবাদি নামে এক মা, যিনি তাঁর ৯ বছর বয়সী মেয়ে সেতায়েশকে ওই হামলায় হারিয়েছেন, জানান যে হামলার সময় সেখানে শুধু ধোঁয়া আর শিশুদের চুলের গন্ধ ছিল। তিনি একটি হাত ও একটি পা দেখেছিলেন, তাদের শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।

তেহরান থেকে বন্দর আব্বাসগামী ৯০০ মাইল বা ১ হাজার ৪৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ রাতের ট্রেনযাত্রায় ইরানের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের যুদ্ধের অভিজ্ঞতার গল্প উঠে আসে। শিক্ষার্থী, ফুটবলার ও ব্যবসায়ীদের এই যাত্রায় রাজনীতির প্রসঙ্গ এলে পরিস্থিতি বদলে যায়। আইনজীবী আজাদেহ জানান, ইরানিরা মানিয়ে নিতে অভ্যস্ত এবং তারা দৈনন্দিন রুটিন বজায় রাখার চেষ্টা করেন। রূপচর্চাবিশেষজ্ঞ সেপিদেহ বলেন, তিনি ইরানকে ভালোবাসেন, কিন্তু তারুণ্য ও স্বপ্ন হারিয়ে ফেলায় দেশ ছাড়া ছাড়া উপায় নেই। ফুটবলার আবদুল্লাহ জানান, শিশুভর্তি স্কুলে হামলার ঘটনায় পুরো দেশ শোকে ভেঙে পড়েছিল।

বন্দর আব্বাস, যা ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক বন্দর ও হরমুজ প্রণালির প্রবেশদ্বার, এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক নিশানায় পরিণত হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিলের মধ্যে এই শহর ও এর আশপাশে অন্তত ৯৬টি মার্কিন হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে তেহরানে পরিস্থিতি ভিন্ন। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর চার মাস পর তাঁর জানাজায় লাখো মানুষের সমাগম রাজনৈতিক ঐক্যের প্রদর্শনী হিসেবে দেখা দিয়েছে। সুরাইয়া নামে এক নারী জানান, আগে সরকারের বিরোধিতা করলেও এখন অনেকে সরকারকে সমর্থন করছেন। তবে যুদ্ধ নিয়ে ইরানজুড়ে একক কোনো ভাষ্য নেই। চলতি বছরের শুরুতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় দমন-পীড়নে হাজার হাজার মানুষ নিহত ও নিখোঁজ হয়েছেন। যুদ্ধ এখনো চলছে, আর এই সংঘাতের উত্তরাধিকার কী হবে, তা নির্ধারণের লড়াইও সমানতালে চলছে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

ইরানের যুদ্ধকবলিত জনজীবন: বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এল এক ভিন্ন চিত্র

আপডেট সময় : ০৫:৪৯:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
print news

বিবিসির জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদক নওয়াল আল-মাগাফির ইরান সফরের এই প্রতিবেদনে যুদ্ধের বহুমুখী প্রভাব উঠে এসেছে। মিনাবের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ধ্বংসস্তূপ, বন্দর আব্বাসের অচলাবস্থা ও তেহরানের জনসমাগম ঘুরে তিনি যুদ্ধকবলিত ইরানের সাধারণ মানুষের ভাবনা বুঝতে চেষ্টা করেছেন। বিবিসির ‘গ্লোবাল আই’-এর জন্য করা প্রতিবেদনটি দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত হয়েছে।

মিনাবের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পাঁচ মাস পরও খননযন্ত্র দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে। সেখানে এখনো এক শিশুর মরদেহ চাপা পড়ে আছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। খননযন্ত্রটি হঠাৎ থেমে গেলে শ্রমিকেরা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে একটি শিশুর খাতা বের করেন। প্রচ্ছদে লেখা ছিল মাহিয়া সালারি, যার বয়স ছিল আট বছর। মিনাবের প্রসিকিউটর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দিনে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় এখানে ১৫৬ জন নিহত হন, যার মধ্যে ১২০ জনই শিশু।

শহরজুড়ে দেয়াল, দোকানের শাটার আর রাস্তার ধারের বিলবোর্ডে টাঙানো রয়েছে মৃত মানুষের ছবি। মিনাব শহরটি যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগ ও কষ্টের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক আমাইনে নাদেমি বলেন, এটিকে আর স্কুল বলা যায় না; এখানে শুধু দেয়ালগুলো দাঁড়িয়ে আছে, যেগুলো থেকে মৃত্যু, শোক আর রক্তের গন্ধ ভেসে আসে। হামলার পর শিক্ষার্থীদের বাবা-মায়ের খালি পায়ে ভবনটির দিকে ছুটে আসার কথা স্মরণ করেন তিনি। রেড ক্রিসেন্টের উদ্ধারকর্মী রেজা বেসারাতি জানান, হামলার সেই সকালের ঘটনা এখনো তাঁর চোখে ভাসে।

মিনাবের কবরস্থানে সারিবদ্ধ ছোট ছোট কবরের মাঝখান দিয়ে শিশুরা ছোটাছুটি করছে। মাসুমেহ মেহরান শেখাবাদি নামে এক মা, যিনি তাঁর ৯ বছর বয়সী মেয়ে সেতায়েশকে ওই হামলায় হারিয়েছেন, জানান যে হামলার সময় সেখানে শুধু ধোঁয়া আর শিশুদের চুলের গন্ধ ছিল। তিনি একটি হাত ও একটি পা দেখেছিলেন, তাদের শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।

তেহরান থেকে বন্দর আব্বাসগামী ৯০০ মাইল বা ১ হাজার ৪৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ রাতের ট্রেনযাত্রায় ইরানের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের যুদ্ধের অভিজ্ঞতার গল্প উঠে আসে। শিক্ষার্থী, ফুটবলার ও ব্যবসায়ীদের এই যাত্রায় রাজনীতির প্রসঙ্গ এলে পরিস্থিতি বদলে যায়। আইনজীবী আজাদেহ জানান, ইরানিরা মানিয়ে নিতে অভ্যস্ত এবং তারা দৈনন্দিন রুটিন বজায় রাখার চেষ্টা করেন। রূপচর্চাবিশেষজ্ঞ সেপিদেহ বলেন, তিনি ইরানকে ভালোবাসেন, কিন্তু তারুণ্য ও স্বপ্ন হারিয়ে ফেলায় দেশ ছাড়া ছাড়া উপায় নেই। ফুটবলার আবদুল্লাহ জানান, শিশুভর্তি স্কুলে হামলার ঘটনায় পুরো দেশ শোকে ভেঙে পড়েছিল।

বন্দর আব্বাস, যা ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক বন্দর ও হরমুজ প্রণালির প্রবেশদ্বার, এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক নিশানায় পরিণত হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিলের মধ্যে এই শহর ও এর আশপাশে অন্তত ৯৬টি মার্কিন হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে তেহরানে পরিস্থিতি ভিন্ন। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর চার মাস পর তাঁর জানাজায় লাখো মানুষের সমাগম রাজনৈতিক ঐক্যের প্রদর্শনী হিসেবে দেখা দিয়েছে। সুরাইয়া নামে এক নারী জানান, আগে সরকারের বিরোধিতা করলেও এখন অনেকে সরকারকে সমর্থন করছেন। তবে যুদ্ধ নিয়ে ইরানজুড়ে একক কোনো ভাষ্য নেই। চলতি বছরের শুরুতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় দমন-পীড়নে হাজার হাজার মানুষ নিহত ও নিখোঁজ হয়েছেন। যুদ্ধ এখনো চলছে, আর এই সংঘাতের উত্তরাধিকার কী হবে, তা নির্ধারণের লড়াইও সমানতালে চলছে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo