অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলে এখনও বহাল তবিয়তে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠরা
- আপডেট সময় : ১০:২০:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুণগত মান নিশ্চিত ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখার লক্ষ্যে ২০১৮ সালে গঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (বিএসি)। তবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে সংস্থাটি কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। উল্টো দীর্ঘ সময় ধরে এই সংস্থায় বহাল তবিয়তে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা।
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ফ্যাসিবাদের আমলে নিয়োগ পাওয়া চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সরিয়ে দিয়ে নতুনদের দায়িত্ব দিয়েছে। তবে শীর্ষস্থানীয় এই নীতিনির্ধারণী পদে পরিবর্তন এলেও আওয়ামী লীগ আমল থেকে চলে আসা কর্মকর্তারা এখনও স্বপদে বহাল রয়েছেন। বিএসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বাইরে এই প্রতিষ্ঠানের মূল কর্মকর্তারা শিক্ষা ক্যাডার থেকে প্রেষণে পদায়ন পান। বর্তমানে কর্মরত ১৫ জন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তার অর্ধেকেরও বেশি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে এখানে কর্মরত। সাধারণত তিন বছর পর প্রেষণে কর্মরতদের বদলি করার নিয়ম থাকলেও, তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ম্যানেজ করে বছরের পর বছর একই প্রতিষ্ঠানে রয়ে গেছেন।
অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের অনেকেই সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, দীপু মনি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিএসির কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স অ্যান্ড ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশনস ফ্রেমওয়ার্ক (কিউএ অ্যান্ড এনকিউএফ) শাখার পরিচালক প্রফেসর মোহাম্মদ তাজিব উদ্দিন ২১তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা। তিনি আওয়ামী সমর্থিত প্যানেল থেকে শিক্ষা ক্যাডার সমিতির নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। এছাড়া সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর স্ত্রী ও মাউশির সাবেক মহাপরিচালক ফাহিমা খাতুনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত তাজিব উদ্দিন আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো সময় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ও বিএসিতে কর্মরত ছিলেন।
আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দীর আত্মীয় প্রফেসর গৌতম চন্দ্র রায় বর্তমানে বিএসির অর্থ, পরিকল্পনা ও আইসিটি শাখার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ১৮তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা। অন্যদিকে, বিএসির সচিব হিসেবে সাত বছর ধরে কর্মরত আছেন প্রফেসর মুনিরুল ইসলাম, যিনি ১০ শতাংশ কোটার কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আইএমইডির সাবেক সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামানের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক থাকার অভিযোগ রয়েছে। একই সাথে বিএসিতে দায়িত্ব পালনের মতো প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
উপপরিচালক স্নিগ্ধা বাউলের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার সঙ্গে একাধিক ছবি থাকা এবং সাবেক মুখ্য সচিব কামাল চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে পুরো চাকরিজীবন ঢাকায় কাটানোর অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া উপপরিচালক প্রবীর কুমার চক্রবর্ত্তী, ড. রীতা পারভীন ও মোহাম্মদ আবু জাফরের বিরুদ্ধেও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
শুধু রাজনৈতিক প্রভাবই নয়, উচ্চশিক্ষার মান তদারকির দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তাদের গবেষণার ক্ষেত্রেও চরম ঘাটতি দেখা গেছে। প্রফেসর গৌতম চন্দ্র রায়, ড. রীতা পারভীন, স্নিগ্ধা বাউল ও মোহাম্মদ আবু জাফরের কোনো প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ বা কার্যক্রমের সন্ধান পাওয়া যায়নি। প্রফেসর মোহাম্মদ তাজিব উদ্দিনের রিসার্চগেট বা গুগল স্কলারে কোনো প্রোফাইল নেই, কেবল নায়েম জার্নালে তার দুটি প্রবন্ধ রয়েছে। সচিব মুনিরুল ইসলামের তিনটি যৌথ প্রবন্ধ থাকলেও কোনো অনলাইন প্রোফাইল নেই। এছাড়া প্রবীর কুমার চক্রবর্ত্তীর মাত্র দুটি গবেষণা প্রবন্ধ রয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক মনজুর মনে করেন, সরকারি কর্মকর্তাদের দলীয় পরিচয়ের চেয়ে দক্ষতা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, সরকারি চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে বাড়তি সুবিধা নেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যোগ্যতার দিক থেকে পিছিয়ে থাকা এই সুবিধাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সরিয়ে নতুন সরকারের উচিত যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া, অন্যথায় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়বে এবং দুর্নীতি বাড়বে।
বিএসির বর্তমান চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আখতার হোসেন খান বলেন, কর্মকর্তাদের বদলি বা প্রত্যাহারের বিষয়টি সম্পূর্ণ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার, এখানে তার কিছু করার সুযোগ নেই। তবে এ ব্যাপারে জানতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল খালেকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।





























