ঢাকা ০২:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ভারত ছাড়ার ঘোষণা নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের সিজেপির দায়িত্ব অজিঙ্কা শিন্ডের কাঁধে, আটক সিপিএম নেতা ও পিনারাই বিজয়ন প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে যুব উন্নয়নের নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত, নীলক্ষেতে বিক্ষোভ প্রকৃতি রক্ষায় আমাদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা জরুরি ঢাকায় ছয় মাসের মধ্যে চালু হচ্ছে ফ্র্যাঞ্চাইজি বাস, ৯৮টি রুট কমে ৩২ আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ৩৪৬ রানে থামল বাংলাদেশ কুষ্টিয়া সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি আহত, বিজিবির পাল্টা গুলি মক্কা-মদিনার মর্যাদার প্রশ্নে আপস করবে না বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভবিষ্যতের ঝামেলা এড়াতে সন্তানকে বিষ খাইয়ে হত্যা: আদালতে সৎমা ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনে সরব শাবানা আজমি ও নাসিরউদ্দিন শাহ

আইএফআইসি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়ে ২৯ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৯:০৬:৫৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬ ১৬ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



বেসরকারি খাতের আইএফআইসি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের বোঝা প্রতিনিয়ত ভারী হচ্ছে। গত আগস্ট মাস শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৬৫.২৫ শতাংশ। এর আগে জুন শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ২৮ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা বা ৬৩.৩৮ শতাংশ। ফলে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ব্যাংকটিতে নতুন করে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১,২৯৫ কোটি টাকা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আইএফআইসি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে পুনর্গঠন করা হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা এবং বিতর্কিত ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমান এই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি মালিকানা হারালেও নতুন পর্ষদের অধীনে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ কমানোর কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি। উল্টো অন্যান্য আর্থিক সূচকেও বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, নতুন পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর বড় ধরনের কোনো নতুন ঋণ দেওয়া হয়নি। বর্তমানে যেসব ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে, সেগুলো মূলত বিগত সরকারের সময়ে দুই বছর বা তার বেশি গ্রেস পিরিয়ড দিয়ে নেওয়া হয়েছিল। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী এগুলো খেলাপির খাতায় উঠছে। এছাড়া অধিকাংশ বড় ঋণখেলাপি বর্তমানে পলাতক বা কারাগারে থাকায় ঋণ আদায়ের উদ্যোগে সফলতা মিলছে না।

আইএফআইসি ব্যাংকের আর্থিক তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুন শেষে ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল ৪৩ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ছিল ৩,৭৫৬ কোটি টাকা (৮.৭২ শতাংশ)। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪,৩৮৯ কোটি টাকায় (৯.৯২ শতাংশ)। কিন্তু ডিসেম্বর প্রান্তিকে একলাফে ১২ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা বেড়ে খেলাপি ঋণ হয় ১৭,১৮২ কোটি টাকা (৩৮.৪৯ শতাংশ)। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের মার্চে তা ২৫,৯৭১ কোটি টাকা (৫৮.৩৯ শতাংশ) এবং জুনে ২৭,০৮১ কোটি টাকায় (৬০.৬৭ শতাংশ) পৌঁছায়। সেপ্টেম্বরে সামান্য কমে ২৭,০৫৪ কোটি টাকা (৬০.৬৩ শতাংশ) এবং বছরের শেষে নীতি সহায়তার মাধ্যমে ডিসেম্বরে ২৩,৪৯১ কোটি টাকায় (৫৩.১২ শতাংশ) নামলেও চলতি বছরে তা আবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। চলতি বছরের আট মাসেই ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬,০৮১ কোটি টাকা।

বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাবশালী সালমান এফ রহমানের নিয়ন্ত্রণাধীন এই ব্যাংক থেকে বিভিন্ন বেনামি ও বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। তথ্যানুযায়ী, ভুয়া নাম ব্যবহার করে ২৮টি প্রতিষ্ঠান ব্যাংকটি থেকে ১৩,১৬৬ কোটি টাকা বেনামি ঋণ নিয়েছে, যার পুরোটাই এখন খেলাপি। এর মধ্যে নগদ বা ফান্ডেড ঋণ ১২,১৬৬ কোটি এবং এলসি ও গ্যারান্টির নন-ফান্ডেড ঋণ ১,০২০ কোটি টাকা। এসব ঋণের মূল সুবিধাভোগী ছিলেন সালমান এফ রহমান নিজেই। এছাড়া নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নাসা গ্রুপ ১,৩৩৩ কোটি টাকা এবং জয়নুল হক সিকদারের সিকদার গ্রুপ ১,০৫৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পুরোটা খেলাপি করেছে। বেক্সিমকো গ্রুপ ও সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া ঋণের অর্থও ফেরত আসছে না।

দীর্ঘদিন ধরে আইএফআইসি ব্যাংকে ব্যাপক অনিয়ম চললেও সালমান এফ রহমানের প্রভাবের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ব্যবস্থা বা বিশেষ নিরীক্ষা চালায়নি। নিয়মিত নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও তথ্য গোপন করা হতো। তবে ৫ আগস্টের পর নতুন পর্ষদ বিশেষ নিরীক্ষক নিয়োগ দিলে দীর্ঘ তদন্ত শেষে এসব জালিয়াতির চিত্র উন্মোচিত হয়।

খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে বড় ধরনের নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে ব্যাংকটি। চলতি বছরের জুন শেষে আইএফআইসির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২১,৮৯৪ কোটি টাকা, যা গত বছরের ডিসেম্বরে ছিল ১৮,০১১ কোটি টাকা। অন্যদিকে জুন শেষে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭,১৯৯ কোটি টাকায়, যা মার্চে ৬,০১১ কোটি ও গত ডিসেম্বরে ৪,৭০৪ কোটি টাকা ছিল।

আর্থিক সূচকের ভয়াবহ ধস এবং ঋণ থেকে আয় বন্ধ থাকায় ব্যাংকটি বড় অঙ্কের লোকসান গুনছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই (প্রথমার্ধে) ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান হয়েছে ১,৬৬৮ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৫ সাল জুড়ে ব্যাংকটি নিট লোকসান দিয়েছিল ২,৫৬২ কোটি টাকা। অথচ ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ৬৩ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকের প্রকৃত চিত্র উঠে আসার পর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া বর্তমান পর্ষদ ও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ছিল। তবে সূচকের ধারাবাহিক অবনতি, সুশাসনের অভাব ও অনিয়ম রোধে ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়ায় ব্যাংকটিতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অবশ্য ৫ আগস্টের পর আমানত কমে ৪৩ হাজার কোটি টাকায় নামলেও বর্তমানে তা আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ব্যাংকের অগ্রিম-আমানত অনুপাত (এডিআর) বর্তমানে ৮১ থেকে ৮২ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। কর্মকর্তারা দাবি করছেন, নতুন ঋণ বিতরণ সংকুচিত থাকায় শতকরা হিসাবে খেলাপি ঋণের হার বেশি দেখালেও আমানত ও সার্বিক ঋণ আদায়ে কিছু অগ্রগতি রয়েছে।

খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মেহমুদ হোসেন এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মনসুর মোস্তফাকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তারা কল রিসিভ করেননি।

চলতি বছরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ আবার বাড়তে শুরু করে। আগস্ট শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বা ৬৫.২৫ শতাংশ। অর্থাৎ আট মাসে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬,০৮১ কোটি টাকা। মার্চ শেষে ব্যাংকের ঋণের স্থিতি ছিল ৪৫ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৮ হাজার ১৭৪ কোটি টাকার ঋণ ছিল খেলাপির খাতায়, যা বিতরণ করা ঋণের ৬৩.৪৬ শতাংশ। খেলাপি ঋণ উদঘাটনের পর সর্বোচ্চ ছিল ২৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা বা ৬১.৪৭ শতাংশ। এরপর খেলাপি ঋণ কমার কথা থাকলেও বরং তা বেড়েছে। গত জুন শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আরো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা বা ৬৩.৩৮ শতাংশে। আর আগস্ট শেষে ছিল ২৯ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা।

৫ আগস্টের পর একপর্যায়ে ব্যাংকটির আমানত কমে ৪৩ হাজার কোটি টাকায় নেমে যায়। বর্তমানে আমানত ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ব্যাংকের অ্যাডভান্স-ডিপোজিট রেশিও (এডিআর) ৮১-৮২ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh

নিউজটি শেয়ার করুন

আইএফআইসি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়ে ২৯ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা

আপডেট সময় : ০৯:০৬:৫৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

বেসরকারি খাতের আইএফআইসি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের বোঝা প্রতিনিয়ত ভারী হচ্ছে। গত আগস্ট মাস শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৬৫.২৫ শতাংশ। এর আগে জুন শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ২৮ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা বা ৬৩.৩৮ শতাংশ। ফলে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ব্যাংকটিতে নতুন করে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১,২৯৫ কোটি টাকা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আইএফআইসি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে পুনর্গঠন করা হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা এবং বিতর্কিত ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমান এই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি মালিকানা হারালেও নতুন পর্ষদের অধীনে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ কমানোর কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি। উল্টো অন্যান্য আর্থিক সূচকেও বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, নতুন পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর বড় ধরনের কোনো নতুন ঋণ দেওয়া হয়নি। বর্তমানে যেসব ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে, সেগুলো মূলত বিগত সরকারের সময়ে দুই বছর বা তার বেশি গ্রেস পিরিয়ড দিয়ে নেওয়া হয়েছিল। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী এগুলো খেলাপির খাতায় উঠছে। এছাড়া অধিকাংশ বড় ঋণখেলাপি বর্তমানে পলাতক বা কারাগারে থাকায় ঋণ আদায়ের উদ্যোগে সফলতা মিলছে না।

আইএফআইসি ব্যাংকের আর্থিক তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুন শেষে ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল ৪৩ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ছিল ৩,৭৫৬ কোটি টাকা (৮.৭২ শতাংশ)। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪,৩৮৯ কোটি টাকায় (৯.৯২ শতাংশ)। কিন্তু ডিসেম্বর প্রান্তিকে একলাফে ১২ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা বেড়ে খেলাপি ঋণ হয় ১৭,১৮২ কোটি টাকা (৩৮.৪৯ শতাংশ)। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের মার্চে তা ২৫,৯৭১ কোটি টাকা (৫৮.৩৯ শতাংশ) এবং জুনে ২৭,০৮১ কোটি টাকায় (৬০.৬৭ শতাংশ) পৌঁছায়। সেপ্টেম্বরে সামান্য কমে ২৭,০৫৪ কোটি টাকা (৬০.৬৩ শতাংশ) এবং বছরের শেষে নীতি সহায়তার মাধ্যমে ডিসেম্বরে ২৩,৪৯১ কোটি টাকায় (৫৩.১২ শতাংশ) নামলেও চলতি বছরে তা আবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। চলতি বছরের আট মাসেই ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬,০৮১ কোটি টাকা।

বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাবশালী সালমান এফ রহমানের নিয়ন্ত্রণাধীন এই ব্যাংক থেকে বিভিন্ন বেনামি ও বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। তথ্যানুযায়ী, ভুয়া নাম ব্যবহার করে ২৮টি প্রতিষ্ঠান ব্যাংকটি থেকে ১৩,১৬৬ কোটি টাকা বেনামি ঋণ নিয়েছে, যার পুরোটাই এখন খেলাপি। এর মধ্যে নগদ বা ফান্ডেড ঋণ ১২,১৬৬ কোটি এবং এলসি ও গ্যারান্টির নন-ফান্ডেড ঋণ ১,০২০ কোটি টাকা। এসব ঋণের মূল সুবিধাভোগী ছিলেন সালমান এফ রহমান নিজেই। এছাড়া নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নাসা গ্রুপ ১,৩৩৩ কোটি টাকা এবং জয়নুল হক সিকদারের সিকদার গ্রুপ ১,০৫৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পুরোটা খেলাপি করেছে। বেক্সিমকো গ্রুপ ও সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া ঋণের অর্থও ফেরত আসছে না।

দীর্ঘদিন ধরে আইএফআইসি ব্যাংকে ব্যাপক অনিয়ম চললেও সালমান এফ রহমানের প্রভাবের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ব্যবস্থা বা বিশেষ নিরীক্ষা চালায়নি। নিয়মিত নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও তথ্য গোপন করা হতো। তবে ৫ আগস্টের পর নতুন পর্ষদ বিশেষ নিরীক্ষক নিয়োগ দিলে দীর্ঘ তদন্ত শেষে এসব জালিয়াতির চিত্র উন্মোচিত হয়।

খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে বড় ধরনের নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে ব্যাংকটি। চলতি বছরের জুন শেষে আইএফআইসির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২১,৮৯৪ কোটি টাকা, যা গত বছরের ডিসেম্বরে ছিল ১৮,০১১ কোটি টাকা। অন্যদিকে জুন শেষে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭,১৯৯ কোটি টাকায়, যা মার্চে ৬,০১১ কোটি ও গত ডিসেম্বরে ৪,৭০৪ কোটি টাকা ছিল।

আর্থিক সূচকের ভয়াবহ ধস এবং ঋণ থেকে আয় বন্ধ থাকায় ব্যাংকটি বড় অঙ্কের লোকসান গুনছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই (প্রথমার্ধে) ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান হয়েছে ১,৬৬৮ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৫ সাল জুড়ে ব্যাংকটি নিট লোকসান দিয়েছিল ২,৫৬২ কোটি টাকা। অথচ ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ৬৩ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকের প্রকৃত চিত্র উঠে আসার পর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া বর্তমান পর্ষদ ও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ছিল। তবে সূচকের ধারাবাহিক অবনতি, সুশাসনের অভাব ও অনিয়ম রোধে ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়ায় ব্যাংকটিতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অবশ্য ৫ আগস্টের পর আমানত কমে ৪৩ হাজার কোটি টাকায় নামলেও বর্তমানে তা আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ব্যাংকের অগ্রিম-আমানত অনুপাত (এডিআর) বর্তমানে ৮১ থেকে ৮২ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। কর্মকর্তারা দাবি করছেন, নতুন ঋণ বিতরণ সংকুচিত থাকায় শতকরা হিসাবে খেলাপি ঋণের হার বেশি দেখালেও আমানত ও সার্বিক ঋণ আদায়ে কিছু অগ্রগতি রয়েছে।

খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মেহমুদ হোসেন এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মনসুর মোস্তফাকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তারা কল রিসিভ করেননি।

চলতি বছরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ আবার বাড়তে শুরু করে। আগস্ট শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বা ৬৫.২৫ শতাংশ। অর্থাৎ আট মাসে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬,০৮১ কোটি টাকা। মার্চ শেষে ব্যাংকের ঋণের স্থিতি ছিল ৪৫ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৮ হাজার ১৭৪ কোটি টাকার ঋণ ছিল খেলাপির খাতায়, যা বিতরণ করা ঋণের ৬৩.৪৬ শতাংশ। খেলাপি ঋণ উদঘাটনের পর সর্বোচ্চ ছিল ২৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা বা ৬১.৪৭ শতাংশ। এরপর খেলাপি ঋণ কমার কথা থাকলেও বরং তা বেড়েছে। গত জুন শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আরো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা বা ৬৩.৩৮ শতাংশে। আর আগস্ট শেষে ছিল ২৯ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা।

৫ আগস্টের পর একপর্যায়ে ব্যাংকটির আমানত কমে ৪৩ হাজার কোটি টাকায় নেমে যায়। বর্তমানে আমানত ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ব্যাংকের অ্যাডভান্স-ডিপোজিট রেশিও (এডিআর) ৮১-৮২ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh