চাঁদাবাজি ও মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ন্ত্রণ করলে কমবে পণ্যের দাম: এফবিসিসিআই
- আপডেট সময় : ১২:৪১:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন যে, সড়কে ও বাজারে চাঁদাবাজি, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং কৃত্রিম কারসাজির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। আসন্ন রমজানে ভোগ্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে নিয়মিত ও কঠোর বাজার মনিটরিংয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা। মঙ্গলবার মতিঝিলে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) কার্যালয়ে নিত্যপণ্যের মজুত, সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা উঠে আসে। সভায় সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক।
সভায় কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ বলেন, সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য এবং সড়কে চাঁদাবাজির কারণে ৩০ টাকার সবজি ভোক্তাদের ৮০ থেকে ১০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। শ্যামবাজার কৃষিপণ্য আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি ফরিদ উদ্দিন অভিযোগ করেন, কিছু মুনাফাখোর ব্যবসায়ীর জন্য পুরো ব্যবসায়ী সমাজ অপবাদ সইছে। তিনি জানান, 'মিনিকেট' নামে কোনো ধানের জাত না থাকলেও করপোরেট ব্যবসায়ীরা ৫০ টাকার চাল প্যাকেটজাত করে ৭০ টাকায় বিক্রি করছেন। এছাড়া মধ্যস্বত্বভোগীরা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা তুলে নিচ্ছে এবং শ্যামবাজারে পুলিশও চাঁদা তোলে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
আইনশৃঙ্খলার ওপর জোর দিয়ে খিলগাঁও (তালতলা) সিটি করপোরেশন সুপার মার্কেট ওনার্স এসোসিয়েশনের মহাসচিব কাজী আনিসুজ্জামান বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে ব্যবসায়ীরা স্বস্তিতে ব্যবসা করতে পারতেন। ফকিরেরপুল বাজার সাধারণ ব্যবসায়ী সমিতির শওকত হোসেন বলেন, প্রতিটি বাজারেই একজন করে 'কন্ট্রোলার' থাকে, যারা ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন মনিটরিংয়ের অভাবকে দায়ী করে প্রশ্ন তোলেন, কীভাবে এক রাতে ৫০ টাকার পণ্য ৭০ টাকা হয়ে যায়? তিনি সরবরাহ ব্যবস্থায় হাতবদলের স্তর কমিয়ে আনার পরামর্শ দেন, যাতে ভোক্তার ওপর বাড়তি খরচের চাপ না পড়ে।
পালস অ্যান্ড ল্যান্টিল ক্রাশিং মিল মালিক সমিতির বিকাশ চন্দ্র সাহা জানান, গত ১০ দিনে ডাবলি ও ছোলার দাম কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে এবং সিটি গ্রুপ সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। রুটি-বিস্কুট প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন বলেন, অর্থমন্ত্রীর দাম বাড়ার আশঙ্কার মন্তব্যের পরদিনই বাজারে দাম বেড়ে গেছে। ময়দা, তেল ও চিনির দাম বাড়ায় গত তিন মাসে ২০টি বেকারি বন্ধ হয়ে প্রায় এক হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে রুটি-বিস্কুটের দাম আরও ২০ শতাংশ বাড়তে পারে বলে তিনি জানান। নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের পরিচালক সোহেল আক্তার জানান, নারায়ণগঞ্জের একটি বাজারে প্রতিদিন চৌকি ভাড়া বাবদ ৩ হাজার টাকা দিতে হয়, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার পকেট থেকেই যায়। মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মওলা বলেন, ব্যাংক, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে এখন বাজার হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। বন্ধ কারখানাগুলো চালু না হলে ভোজ্যতেল ও চিনির তীব্র সংকট তৈরি হতে পারে।
মেঘনা গ্রুপের জ্যেষ্ঠ উপ-মহাব্যবস্থাপনা পরিচালক তসলিম শাহরিয়ার জানান, ভারত শুল্কমুক্ত সুবিধায় চিনি আমদানি শুরু করায় ব্রাজিলে চিনির দাম বাড়লেও বাংলাদেশের মিলগেটে দাম স্থিতিশীল রয়েছে। কাওরান বাজার কাঁচামাল আড়ত ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান সুজন ফুটপাথের হকার ও অনিবন্ধিত ব্যবসায়ীদের তদারকির আওতায় আনার আহ্বান জানান। এদিকে, এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, সরকারের নতুন বেতন স্কেল ঘোষণার সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা যেন চাল, ডাল ও তেলের দাম বাড়িয়ে না দেন। ব্যবসায়ীদের সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব মনে করিয়ে দিয়ে তিনি সিন্ডিকেট ও বাড়তি মুনাফা করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
সভায় ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের বড় কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী ভোগ্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও কাঁচামাল আমদানি করে থাকে। কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুতের চলমান সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বাজারে চিনি, ভোজ্যতেল, ডাল ও আটার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা। একই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে হয়রানি বন্ধে প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নেওয়ার আহ্বান জানান ব্যবসায়ী নেতারা।



























