গ্রাহকদের লাগামহীন ব্যাংক ঋণে আসছে কড়া সীমা

- আপডেট সময় : ১০:১৬:৫২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, ঋণের ঝুঁকি কমানো এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে পুরো ব্যাংক খাত মিলিয়ে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ কত টাকা ঋণ নিতে পারবেন, তার একটি নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বড় ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বর্তমানে একজন গ্রাহক একটি একক ব্যাংক থেকে ওই ব্যাংকের মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন। তবে পুরো ব্যাংকিং খাত মিলিয়ে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ কত টাকা ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা নেই। এই সুযোগে অনেকে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অঢেল ঋণ নিচ্ছেন, যা ঋণের কেন্দ্রীভূত ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই ঝুঁকি এড়াতেই পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিবেচনায় নিয়ে ঋণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন থেকেও এ ধরনের প্রস্তাব পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সবকিছু ঠিক থাকলে শিগগিরই এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংকগুলোর বর্তমান তারল্য সংকটের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বড় ভূমিকা রয়েছে। ব্যাংকগুলো সাধারণত স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি আমানত সংগ্রহ করে তা দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বিনিয়োগ করে। এতে ব্যাংকের সম্পদ ও দায়ের (অ্যাসেট-লায়াবিলিটি) মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়ে তারল্য ঝুঁকি বাড়ে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, সারা বিশ্বেই শিল্পায়ন ও ব্যবসা সম্প্রসারণে মানি মার্কেট এবং ক্যাপিটাল মার্কেটের ভূমিকা আলাদা। সাধারণত মূলধনী যন্ত্রপাতিসহ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অর্থায়ন হয় ক্যাপিটাল বা পুঁজিবাজার থেকে। অন্যদিকে ব্যাংক ঋণ ব্যবহৃত হয় মূলত কার্যকরী মূলধনের চাহিদা মেটাতে।
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক তিন ধাপের (স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি) একটি কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে দুই বছর মেয়াদি মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় ঋণ ঝুঁকি কমাতে ব্যাংকগুলোতে ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ (ইডব্লিউএস) চালু করার কথা বলা হয়েছে, যাতে গ্রাহক খেলাপি হওয়ার আগেই সম্ভাব্য ক্ষতি এড়ানো যায়। এছাড়া আইএফআরএস-৯ বাস্তবায়ন, জামানতের স্বাধীন মূল্যায়ন ব্যবস্থা, ঋণ আদায়ে কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রণোদনা, ভালো গ্রাহকদের উৎসাহিত করা, খেলাপি ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ, লোন টু ইকুইটি কনভার্সন এবং লোন টেকওভার-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ রয়েছে এ ধাপে।
পাঁচ বছর মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় পুরো ব্যাংক খাত থেকে একক গ্রাহকের সর্বোচ্চ ঋণসীমা নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা কঠোর করা, অর্থঋণ আদালতের বিচারক প্যানেলে অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং খেলাপি গ্রাহকরা যাতে রিট আবেদনের মাধ্যমে ঋণ আদায় প্রক্রিয়া ঝুলিয়ে রাখতে না পারেন, সেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া বেসরকারি খাতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠনের আইন এবং এক হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের পরিবর্তে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের নির্দেশনা দেওয়া হবে। প্রয়োজনে ব্যাংক কোম্পানি আইনসহ সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
এসব উদ্যোগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি বন্ড মার্কেটের মাধ্যমে অর্থায়ন করতে পারে, তবে ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আরও বেশি ঋণ দিতে পারবে। এতে অর্থনীতিতে ঋণের কার্যকর বণ্টন নিশ্চিত হবে। তবে শুধু নীতিমালা করলেই হবে না, বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংকের বাইরে নিয়ে যেতে হলে আগে একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও কার্যকর বন্ড মার্কেট এবং পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে হবে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী আখ্যা দিয়ে বলেন, বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান সামান্য নিজস্ব মূলধন নিয়ে ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিচ্ছে, যা ব্যাংক খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। সেক্টরভিত্তিক ঋণসীমা নির্ধারণ এবং বড় অর্থায়নে ক্যাপিটাল ও বন্ড মার্কেটের ব্যবহার বাড়লে কোম্পানিগুলো নিজস্ব মূলধন বাড়াতে উৎসাহিত হবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই নীতি একবারে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা উচিত। কারণ ব্যাংক খাতে বর্তমানে অনেক ‘ফোর্সড লোন’ রয়েছে, যা দ্রুত সমন্বয় করা কঠিন। একই সঙ্গে বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে ব্যাংক ঋণের ওপর হঠাৎ কড়াকড়ি আরোপ করলে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৯: ৩০আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৯: ৩৩





























