‘মিনিকেট’ নামে ধানের জাতই নেই, তবুও বাজারে সয়লাব চাল

- আপডেট সময় : ০৪:৫০:৩০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

দেশের বাজারে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বেশি বিক্রি হওয়া চালের অন্যতম নাম ‘মিনিকেট’। অথচ কৃষি বিভাগ ও গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এই নামে কোনো স্বীকৃত বা নিবন্ধিত ধানের জাতই নেই। একইভাবে ব্রি-৪৯ জাতের ধান থেকে উৎপাদিত চালকে দেদারসে ‘নাজিরশাইল’ নামে চালিয়ে দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। অধিক মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে সাধারণ ক্রেতাদের এভাবে বিভ্রান্ত ও প্রতারিত করা হচ্ছে বলে সরকারি তদন্তেই উঠে এসেছে।
একই জাতের ধান থেকে উৎপাদিত চাল ভিন্ন ভিন্ন নামে ও দামে বিক্রি বন্ধ করতে এবং বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে ২০২৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি একটি পরিপত্র জারি করেছিল খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ শাখা। ‘রাইস মিল (অটোমেটিক ও হাস্কিং) থেকে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে সরবরাহকৃত চালের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন ও সরবরাহ মূল্য অবহিতকরণ সংক্রান্ত’ ওই নির্দেশনায় চালের প্রতিটি বস্তায় ধানের প্রকৃত জাত, উৎপাদনের তারিখ, মিলের নাম-ঠিকানা ও মিলগেট মূল্য উল্লেখ করা বাধ্যতামুলক করা হয়েছিল। কিন্তু চালকল মালিকদের একটি বড় অংশের আপত্তির কারণে সেই নির্দেশনা আজও আলোর মুখ দেখেনি। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের সঙ্গে চালকল মালিকদের প্রায় ১০০ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ পরিপত্রটির বাস্তবায়ন কার্যত আটকে দেওয়া হয়। অভিযুক্তরা বর্তমানে কারাগারে থাকায় এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে খাদ্য মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই অনৈতিক লেনদেনের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, অটোরাইস মিলে চাল ৫-৭ শতাংশ পর্যন্ত পলিশ করার কথা। কিন্তু অধিক মুনাফার আশায় অনেক মিলে ১৫-২০ শতাংশ পলিশ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে চালের পুষ্টিগুণ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ওজনও কমে যায়। মোটা চাল চিকন করে পরে সেটিই ‘মিনিকেট’, ‘নাজিরশাইল’, ‘কাটারি’ ও ‘জিরাশাইল’সহ বিভিন্ন নামে বাজারজাত করা হচ্ছে। কৃষিবিদদের মতে, অতিরিক্ত পলিশ করার কারণে দেশে উৎপাদিত মোট চালের প্রায় ১০ শতাংশ অপচয় হচ্ছে, যা পুষ্টিহানির পাশাপাশি বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি ডেকে আনছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশে বছরে মোট চাল উৎপাদন হয় চার কোটি sechs লাখ ২৯ হাজার টন। অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাবে এই উৎপাদনের পরিমাণ চার কোটি ১৫ লাখ ১৬ হাজার টন। দেশে সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া ধানের জাতগুলোর মধ্যে ব্রি ধান-২৮, ব্রি ধান-২৯ এবং ব্রি ধান-৪৯ অন্যতম। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ব্রি ধান-২৮ তিন মৌসুম মিলিয়ে প্রায় ৮৯ লাখ টন ধান উৎপাদিত হয়, যেখান থেকে ৪০-৪৫ লাখ টন চাল পাওয়া যায়। একইভাবে ব্রি ধান-২৯ এর উৎপাদন প্রায় ৬৭ লাখ টন ধান, যেখান থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চাল উৎপাদিত হয়। অথচ বাজারে এই চালের বড় অংশই মিনিকেট নামে বিক্রি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। কৃষিবিদদের মতে, প্রকৃত হিসেবে মিনিকেট নামে যদি কোনো চাল থেকে থাকে, তবে তার উৎপাদন সর্বোচ্চ এক লাখ টনের বেশি হওয়ার সুযোগ নেই।
‘মিনিকেট’ শব্দটির উৎপত্তি সম্পর্কে জানা যায়, ২০১৪-১৫ সালের দিকে ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে যশোর ও কুষ্টিয়া এলাকার কৃষকদের মাঝে ধানের বীজ, সার ও কীটনাশকসহ একটি ‘মিনি কিট (Mini Kit)’ বিতরণ করা হয়েছিল। সেই মিনি কিট থেকেই স্থানীয়ভাবে মিনিকেট শব্দটির প্রচলন ঘটে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা ড. মো. আব্দুল মোমিন জানান, ব্রির উদ্ভাবিত ১২৭টি জাতের (১০টি হাইব্রিড ও ১১৭টি ইনব্রিড) মধ্যে মিনিকেট নামে কোনো জাত নেই। এটি মূলত মোটা চাল অতিরিক্ত পলিশ করে তৈরি করা একটি বাণিজ্যিক নাম মাত্র। বাজারে নাজির নামে যে চাল বিক্রি হয়, তার আসল উৎপাদনও অত্যন্ত সীমিত। মূলত ব্রি-৪৯ সহ অন্য জাত পলিশ করে নাজির নামে বিক্রি করা হচ্ছে। ডিএইর সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক ওবায়দুল রহমান মণ্ডলও নিশ্চিত করেছেন যে, দেশে নিবন্ধিত ১২৮টি জাতের মধ্যে মিনিকেট নামের কোনো অস্তিত্ব নেই।
কুষ্টিয়া রাইস মিল মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বাবলু জানান, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫-৭ শতাংশ চাল পলিশের বিধান থাকলেও ক্রেতাদের নজর কাড়তে মিল মালিকরা অনিয়ম করছেন। ফলে চাল চকচকে হলেও মূল ভিটামিন চলে যাচ্ছে কুঁড়ায়। বস্তার গায়ে ধানের আসল জাত ও উৎপাদন তথ্য লেখার সরকারি নির্দেশ থাকলেও বাজারে তার প্রয়োগ নেই। তিনি আরও জানান, বাজারে সরকারি নিয়ম অমান্য করে ১৫-২০ শতাংশ পলিশ করে ব্রি-২৯, ব্রি-৪৯ বা ভারতীয় কিছু সরু ধানকে মিনিকেট নামে বিক্রি করা হচ্ছে। তবে দিনাজপুরের চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান সরকার এই প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে নকল চাল বানানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, মিনিকেট ধান নেই—এই তথ্যটি ভুল। সরকারি নথিতে না থাকলেও মাঠপর্যায়ে গৃহস্থরা সরাসরি এই চিকন ধানের আবাদ করছেন এবং মিলাররা তা কিনছেন। অন্য কোনো জাতের ধান অতিরিক্ত পলিশ করে মিনিকেটে রূপান্তর করা সম্ভব নয় বলেও তিনি দাবি করেন। একই সঙ্গে প্রজ্ঞাপন ধামাচাপা দিতে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগটিকেও তিনি ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
এদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সরকার মূলত আউশ ও বোরো মৌসুমে সিদ্ধ ও আতপ চাল সংগ্রহ করে থাকে, ধানের নির্দিষ্ট জাতভিত্তিক চাল সংগ্রহ করা হয় না। এ বিষয়ে কথা বলতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাক্ষাৎ দেননি। আর খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জসীম উদ্দিন খানের কাছে বাজারে মিনিকেট নামে চাল বিক্রির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। ২০২৪ সালের পরিপত্রের প্রসঙ্গে তোলা হলে তিনি সেটির কপি পাঠানোর অনুরোধ করে বলেন, প্রজ্ঞাপনটি তাকে পাঠালে তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি পরিপত্রটি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ভোক্তাদের প্রতারিত হওয়া এবং চালের অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে।
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৬, ১১: ২৯আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৬, ১১: ৪৬
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, দেশে বছরে মোট চাল উৎপাদন হয় চার কোটি ছয় লাখ ২৯ হাজার টন। ডিএইর হিসাবে উৎপাদন চার কোটি ১৫ লাখ ১৬ হাজার টন। ডিএইর সরেজমিন উইংয়ের হিসাবে উৎপাদনের পার্থক্য প্রায় এক লাখ টন, যা মোট উৎপাদনের ০.২৫ শতাংশ। উৎপাদনের দিক থেকে ব্রি ধান-২৮, ব্রি ধান-২৯ এবং ব্রি ধান-৪৯ সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া জাতগুলোর মধ্যে অন্যতম। অথচ বাজারে এসব জাতের চাল খুব কমই প্রকৃত নামে বিক্রি হয়।




























