ইউরোপের রঙিন স্বপ্ন, দালালের ফাঁদে নিঃস্ব বাংলাদেশিরা
- আপডেট সময় : ০৮:৪৮:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

ইউরোপে পাড়ি জমালেই জীবন বদলে যাবে—এমন রঙিন স্বপ্ন দেখিয়ে দালালচক্র তরুণ-তরুণী ও বিভিন্ন পরিবারকে প্রলুব্ধ করছে। ভালো চাকরি, মোটা বেতন, বৈধ কাগজপত্র এবং স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের ইউরোপমুখী করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে সেই স্বপ্নের পথ অনেকের জন্যই ঋণ, প্রতারণা, ভুয়া ভিসা, মানবপাচার এবং অনিশ্চিত বন্দিজীবনে পরিণত হচ্ছে। নিরাপত্তার খাতিরে ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে এমন কয়েকটি বাংলাদেশি পরিবার এই অমানবিক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে।
সিলেটের এক দম্পতি ছাত্র ভিসায় যুক্তরাজ্যে গিয়ে ভিসার মেয়াদ শেষে ফ্রান্সে পাড়ি জমান। রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন ব্যর্থ হওয়ার পর পর্তুগাল ও স্পেনে বৈধতা পাওয়ার আশায় তারা বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর শরণাপন্ন হন। তবে পাসপোর্ট ও নথিপত্রের জটিলতায় বারবার ব্যর্থ হয়ে তাদের কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। মৌলভীবাজারের আরেক দম্পতির অভিজ্ঞতাও একই; বৈধতার আশায় এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরতে গিয়ে সঞ্চয় শেষ করে তারা এখন ঋণের ভারে জর্জরিত। সুনামগঞ্জের ইদ্রিস মিয়া ও শান্তা ইসলাম নামের দম্পতি জানান, ইউরোপে বড় সংকট হলো নিয়মিত কাজের অভাব। দেশে থাকা স্বজনরা মনে করেন তারা ভালো আছেন, অথচ বাস্তবতায় বাসা ভাড়া ও খাবার খরচ জোগানোই তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশি বিভিন্ন গ্রুপে কাজ ও বাসস্থানের সন্ধানে নিয়মিত পোস্ট দেখা যায়। কাগজপত্র না থাকায় অনেকে রেস্টুরেন্ট, পরিচ্ছন্নতা বা নির্মাণকাজে নামমাত্র পারিশ্রমিকে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। বৈধ শ্রমিকদের তুলনায় তাদের পারিশ্রমিক অনেক কম এবং কাজ হারানোর ভয়ে তারা প্রতিবাদও করতে পারেন না। বাসস্থানের ক্ষেত্রেও তারা অন্যের বাসায় সাবলেট হিসেবে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। নারীরাও অপরিচিত পরিবেশে আর্থিক ও আবাসন সংকটে চরম মানসিক চাপে থাকছেন।
ইউরোপে পৌঁছানোর আগেই অনেকে ভয়াবহ বিপদের মুখোমুখি হন। লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের আটকে রেখে নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালেও লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের নির্যাতন ও মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া ভুয়া শেনজেন ভিসা দিয়ে ইতালিতে পাঠানোর নামে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত আত্মসাতের ঘটনাও ঘটেছে। ইউরোপে যাওয়ার নামে অনেকে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করছেন, অথচ বৈধ পথে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও দালালরা দ্রুত স্থায়ী হওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রলুব্ধ করছে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও চাকরি পেয়েছেন ৮৭ লাখ। কর্মসংস্থানের এই অভাবই তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে। এছাড়া ইউরোপে রাজনৈতিক আশ্রয় পেলেই বৈধতা পাওয়া যাবে—এমন ভুল ধারণাও অনেকে পোষণ করেন। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আবেদন করলেও সফল হওয়ার হার খুবই সীমিত।
ইউরোপের স্বপ্ন দেখা অপরাধ নয়, তবে এই স্বপ্নের বিনিময়ে একটি পরিবারকে জমি বিক্রি করা বা ঋণে ডুবে যাওয়া মেনে নেওয়া যায় না। সরকারের দায়িত্ব হলো অভিবাসনের ব্যয়, আইন ও বৈধ নিয়োগকারী সম্পর্কে নাগরিকদের সঠিক তথ্য দেওয়া এবং স্থানীয় উপ-এজেন্টদের নজরদারিতে আনা। ভুয়া ভিসা ও মানবপাচারকারী নেটওয়ার্কগুলোকে ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি দেশে তরুণদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।




























