ক্ষমতার দম্ভ ও দলীয় আনুগত্যই সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান অন্তরায়
- আপডেট সময় : ১২:১৩:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং নির্বাচিত সরকারের জনসমর্থন টিকিয়ে রাখতে সুশাসনের কোনো বিকল্প নেই। নির্বাচন কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার বৈধতা দেয়, কিন্তু সুশাসনই সেই ক্ষমতা পরিচালনার নৈতিক ভিত্তি ও জনগণের আস্থা ধরে রাখে। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন তাঁর বিখ্যাত ‘পলিটিক্যাল অর্ডার ইন চেঞ্জিং সোসাইটিজ’ গ্রন্থে রাজনৈতিক স্থায়িত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সুশাসনের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ও সুশাসনের অভাব থাকলে কেবল রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বা নির্বাচন একটি রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। একটি নির্বাচিত সরকার জনগণের ভোটে ক্ষমতায় এলেও শাসন পরিচালনার জন্য পুলিশ, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষ এবং শক্তিশালী না হলে রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যর্থ হতে পারে।
বিগত শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। পুলিশ, বিচার বিভাগ ও সংসদ ছিল এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে। তিনি নিজেই মন্ত্রিসভা নির্ধারণ থেকে শুরু করে সংসদে কে বিরোধীদলীয় প্রধান হবেন তাও ঠিক করতেন। বিচারপতিরা রায় দিতেন তাঁর আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে এবং নির্বাহী বিভাগ ছিল তাঁর হাতের মুঠোয়। এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর স্বজনদের মাধ্যমে দেশজুড়ে একটি চোরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। বড় বড় প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে দলীয় অনুগত সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তৈরি করাই ছিল আমলাতন্ত্রের প্রধান লক্ষ্য। এছাড়া বিরোধী দল দমনের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সব ধরনের নিষ্ঠুর পথ অবলম্বনের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। অথচ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সফলভাবে টিকে থাকার জন্য ক্ষমতার ভারসাম্য প্রয়োজন, যাতে কোনো একক ব্যক্তি বা বিভাগের হাতে ক্ষমতা পুঞ্জীভূত না হয়।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে যখন ছাত্র-জনতা সরাসরি শেখ হাসিনাকে লক্ষ্যবস্তু করে, তখন তাঁর পতন ত্বরান্বিত হয়। অনুগত সাংবাদিকদের সামনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ সম্বোধন করার পর বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা তাঁর পদত্যাগ দাবি করে। প্রায় ১৪০০ মানুষকে হত্যার পর ব্যক্তিপূজার ওপর গড়ে ওঠা তাঁর একদলীয় সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। শেখ হাসিনা ছাড়াও তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য, অধিকাংশ সংসদ সদস্য, আমলা ও জেনারেলরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান, যা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।
গণঅভ্যুত্থানের পর ধ্বংসপ্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন করাই এখন অন্তর্বর্তী ও বর্তমান সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। জাতিসংঘে দেওয়া এক ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘থ্রি আর’ (Three R) কৌশল তুলে ধরেছেন। এই কৌশলের প্রথমটি হলো ফ্যাসিবাদী শাসন ও অর্থনৈতিক শোষণ থেকে দেশের রাজনৈতিক, বিচারিক এবং আর্থিক খাতকে উদ্ধার (Recovery)। দ্বিতীয়টি হলো দেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা (Restoration)। আর তৃতীয়টি হলো নতুন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দেশ গড়ার লক্ষ্যে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো এবং সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠন (Reconstruction), যার মধ্যে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর প্রয়োজনীয় সংস্কার অন্তর্ভুক্ত।
এই থ্রি আর কৌশল বাস্তবায়ন করতে হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। আইনের শাসনের মূল কথাই হলো ‘আইনের চোখে সবাই সমান’ এবং ‘আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে’। কিন্তু প্রশাসনিক ও বিচারিক কাঠামোতে আইনের চেয়ে দলীয় আনুগত্য প্রাধান্য পেলে সুশাসনের পুরো ভিত্তিটিই ভেঙে পড়ে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী বা অনুগত আমলারা যখন জানেন যে দলীয় পরিচয়ের কারণে তারা জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকবেন, তখন দুর্নীতি, লুটপাট এবং স্বজনপ্রীতি লাগামহীন হয়ে পড়ে। পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী যখন রাষ্ট্রের পরিবর্তে কোনো নির্দিষ্ট দলের অনুগত হয়ে কাজ করে, তখন তারা জনগণের নিরাপত্তার রক্ষক না হয়ে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাময়িকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছিল এবং গুম-খুনের সঙ্গে জড়িত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পালিয়ে গিয়েছিলেন। ওই সময়ে প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপির একটি অংশ দখল ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়লে দলটির পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং প্রায় চার হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়। নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরও দলীয় প্রভাব খাটিয়ে অপরাধের খবর প্রায় প্রতিদিন গণমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। সম্প্রতি মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের জমি দখলের চেষ্টা এর একটি বড় উদাহরণ। তীব্র সমালোচনার মুখে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে স্থানীয় সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য পদত্যাগ করেন এবং একজন প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে থাকা স্থানীয় কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। সরকারের সাত মাসের মাথায় এ ধরনের পদক্ষেপ অপরাধীদের সঙ্গে স্থানীয় মন্ত্রী-এমপিদের সংযোগেরই প্রমাণ দেয়। যেকোনো কারণেই হোক, ক্ষমতাসীন দলের এক শ্রেণির নেতাকর্মীদের মধ্যে যে ক্ষমতার দম্ভ তৈরি হয়েছে, তা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সুশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় অন্তরায়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যারা থাকেন কিংবা নীতিনির্ধারণের সঙ্গে জড়িত, তাদের লর্ড অ্যাক্টনের সেই বিখ্যাত উক্তিটি মনে রাখা উচিত : Power tends to corrupt, and absolute power corrupts absolutely—‘ক্ষমতা দুর্নীতিগ্রস্ত করার প্রবণতা তৈরি করে, আর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা মানুষকে সম্পূর্ণরূপে দুর্নীতিগ্রস্ত করে।’
প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১: ৪৩আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১: ৪৮
মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন তার বিখ্যাত বই পলিটিক্যাল অর্ডার ইন চেঞ্জিং সোসাইটিসে (Political Order in Changing Societies) রাজনৈতিক স্থায়িত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সুশাসনের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলছেন, ‘সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ এবং সুশাসনের অভাব থাকলে শুধু রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বা নির্বাচন একটি রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।’




























