টেসলা ও মার্সিডিজের চেয়েও মাল্টা আমদানিতে শুল্ক বেশি বাংলাদেশে
- আপডেট সময় : ০৯:১৪:২৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ি বা বিলাসবহুল মার্সিডিজ বেঞ্জ আমদানির চেয়েও ডেঙ্গু রোগীর পথ্য হিসেবে পরিচিত ফল মাল্টা আমদানিতে অনেক বেশি শুল্ক-কর দিতে হচ্ছে। বর্তমানে দেশে মাল্টা আমদানিতে মোট শুল্ক-করের হার ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অথচ অন্তত ১৪৬টি এইচএস কোডভুক্ত গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে করের হার এই ফলের চেয়েও কম। এমন শুল্ক কাঠামোর কারণে বাজারে সাধারণ ভোক্তার জন্য ফলের দাম নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
গাড়ি আমদানির কর হারের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ইলন মাস্কের সাতটি টেসলা গাড়ি আমদানি হয়েছে, যেগুলোতে বছরভেদে ৮৯ থেকে ৯২ শতাংশ শুল্ক-কর দিতে হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ৫০ হাজার ডলার মূল্যের টেসলা আমদানি করলে সর্বোচ্চ শুল্ক-করভার দাঁড়াবে ৮০ শতাংশ। আর ২৫ হাজার ডলার মূল্যের বিওয়াইডি বা সমমানের বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে এই হার ৬৪ শতাংশ। অন্যদিকে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার কমলাপুর আইসিডি থেকে ১ হাজার ৯৯৯ সিসির ২০২৬ সালে তৈরি তিনটি মার্সিডিজ বেঞ্জ প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি খালাস করেছে র্যানকন মোটরস লিমিটেড। প্রায় ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা বাজারমূল্যের প্রতিটি গাড়িতে আমদানিকারককে শুল্ক-কর দিতে হয়েছে ৯৬ দশমিক ১০ শতাংশ হারে। অর্থাৎ বিলাসবহুল এসব গাড়ির তুলনায় মাল্টা আমদানির করহার অনেক বেশি।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ফল আমদানির এই শুল্ক হারকে অস্বাভাবিক বলে উল্লেখ করেছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক তৌহিদুল আলম জানান, পৃথিবীর কোথাও ফল আমদানিতে এত উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের নজির নেই। অতিসম্প্রতি বাজারে সরবরাহ বাড়ায় মাল্টার দাম প্রতি কেজি ৪০০ টাকায় নেমে এলেও, কিছুদিন আগে তা খুচরা বাজারে ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকায় উঠেছিল। অথচ আমদানি পর্যায়ে প্রতি কেজি মাল্টার দাম ছিল মাত্র ৮৭ টাকা, যার বিপরীতে শুল্ক-করই দিতে হয়েছে প্রায় ১০৭ টাকা।
বিগত দুই দশকে ধাপে ধাপে মাল্টার ওপর করের বোঝা বাড়ানো হয়েছে। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে মাল্টা আমদানিতে মোট করভার ছিল ৫৯ দশমিক ২৫ শতাংশ, তখন প্রতি কেজিতে শুল্ক-কর পড়ত প্রায় ১২ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৯ দশমিক ৩২ শতাংশে এবং কেজিতে করের পরিমাণ হয় প্রায় ৩৮ টাকা। বড় পরিবর্তন আসে ২০২২ সালের মে মাসে, যখন ডলার-সংকট মোকাবিলায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আমদানিতে লাগাম টানতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করে। এতে করভার বেড়ে দাঁড়ায় ১১৪ শতাংশে। এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তা আরও বাড়িয়ে ১৩৬ শতাংশ করা হয়। ফল আমদানিকারকদের প্রতিবাদের মুখে ২০২৫ সালের মার্চে এই বাড়তি কর কিছুটা কমিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়, যা এখনো বহাল আছে।
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মাল্টা উৎপাদনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ শুল্কহার প্রতি কেজিতে মাত্র ১ দশমিক ৯ সেন্ট। এমনকি ১৬টি দেশ থেকে সেখানে শুল্কমুক্ত সুবিধায় মাল্টা আমদানি করা যায়। মার্কিন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে শুল্কযুক্ত চালানের গড় কার্যকর শুল্কহার ছিল ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। সেই হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বাংলাদেশে মাল্টার করভার প্রায় ২৩ গুণ বেশি। প্রতিবেশী ভারতেও মাল্টা আমদানিতে ৩০ শতাংশ মৌলিক শুল্কসহ মোট করভার প্রায় ৩৩ শতাংশ। চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির প্রচার সম্পাদক জুনায়েদুল হক জানান, আগে এক কনটেইনার মাল্টা আমদানিতে শুল্ক-কর দিতে হতো সাড়ে সাত লাখ টাকা, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ থেকে ২৯ লাখ টাকায়। এর চূড়ান্ত দায় গিয়ে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
আমদানি কমলেও উচ্চ কর হারের কারণে সরকারের রাজস্ব আদায় অবশ্য বেড়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে মাল্টা আমদানি থেকে সরকারের রাজস্ব ছিল ১ হাজার ১৩০ কোটি টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকায়। তবে তাজা ফলের ওপর এমন উচ্চ শুল্ক কমানোর জন্য আগে থেকেই সুপারিশ করে আসছিল বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) পাঠানো এক চিঠিতে কমিশন জানায়, খাদ্যপণ্য হিসেবে তাজা ফল একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য এবং নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক কেবল জরুরি প্রয়োজনেই সাময়িকভাবে আরোপ করা উচিত।
গবেষণা সংস্থা নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ বিষয়ে বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন ঠেকাতে মূলত ফল আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো হয়েছিল, দেশীয় বাজার সুরক্ষা বা রাজস্ব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নয়। বর্তমানে রিজার্ভ পরিস্থিতি আগের চেয়ে কিছুটা উন্নত হওয়ায় স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনা করে মাল্টার শুল্ক-কর যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা উচিত। তিনি আরও উল্লেখ করেন, রোগীর পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত মাল্টায় অতি উচ্চ শুল্ক এবং বিলাসবহুল গাড়িতে তুলনামূলক কম শুল্ক থাকাটা বর্তমান শুল্ক কাঠামোর এক বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা প্রকাশ করে।
অবশ্য বাজারে সরবরাহ বাড়ার পর মাল্টার দাম কেজিপ্রতি ৪০০ টাকায় নেমে এসেছে।.দুই দশক আগে ২০০৬–০৭ অর্থবছরে মাল্টা আমদানিতে মোট করভার ছিল ৫৯ দশমিক ২৫ শতাংশ।
২০২১–২২ অর্থবছর পর্যন্ত তা ছিল ৮৯ দশমিক ৩২ শতাংশ।



























