ঢাকা ১২:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় আর আস্থা নেই ইরানের: প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান মুনাফা ছাড়ার অঙ্গীকার দিয়ে টাকা পাচ্ছেন আমানতকারীরা রাড্ডা ক্লিনিকে হামলার ঘটনায় শাহ আলী থানার ওসি প্রত্যাহার ডিসেম্বরেই ফিরছেন শেখ হাসিনা? গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সম্ভাব্য সব রুট শেয়ারবাজারে লেনদেনের শুরুতে মিশ্র প্রবণতা, ডিএসইতে সূচক বৃদ্ধি রাবিতে ঘুমন্ত শিক্ষার্থীর পায়ে বিষধর কালাচ সাপের দংশন শুধু জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় শিক্ষার উদ্দেশ্য সীমাবদ্ধ নয় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা: জমি নিয়ে বিরোধে আটক ৩ টেনেসিতে ২০০ বছর পর নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রস্তুতি খুলনায় ২৭ বছর পর গ্রেফতার এরশাদ শিকদারের সহযোগী জয়নাল

ভূরাজনীতি ও আঞ্চলিক সংযোগের নতুন কেন্দ্রে বাংলাদেশ

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৩:০৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি বহুল আলোচিত উক্তি হলো—‘ভূগোল রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণ করে না, কিন্তু রাষ্ট্রের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার কাঠামো নির্ধারণ করে’। এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হচ্ছে, কোনো দেশের ভৌগোলিক অবস্থান নিজে থেকেই তাকে শক্তিশালী করে তোলে না; বরং সেই ভূগোলকে রাষ্ট্র কতটা দক্ষতার সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পদে রূপান্তর করতে পারে, তার ওপরই তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। যেসব দেশ নিজেদের অবস্থানের কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছে, তারা সীমিত সম্পদ নিয়েও বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে, যারা এই তাৎপর্য বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে, তারা প্রায়ই বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার বলয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারেনি। আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় ভূগোল এখন আর শুধু মানচিত্রের অবস্থান নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মৌলিক ভিত্তি।

বাংলাদেশ আজ এমন এক ভূরাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তার ভৌগোলিক অবস্থান একদিকে আশীর্বাদ, অন্যদিকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের কারণ। বিশ্বের বৃহত্তম উপসাগর বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত বাংলাদেশ একই সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল। পশ্চিমে ভারত, পূর্বে মিয়ানমার এবং দক্ষিণে ভারত মহাসাগরীয় জলপথের এই অবস্থান বাংলাদেশকে একটি স্বাভাবিক আঞ্চলিক সেতুবন্ধে পরিণত করেছে। উত্তরদিকের হিমালয়-সংলগ্ন অঞ্চল এবং ব্রহ্মপুত্র-গঙ্গা-মেঘনা অববাহিকার ভূপ্রকৃতি এর গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশকে শুধু একটি রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একটি ভূরাজনৈতিক করিডোর, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখা হয়। সঠিক পরিকল্পনা ও দূরদর্শী নীতিমালার মাধ্যমে এই অবস্থানকে কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক যোগাযোগ ও উৎপাদন নেটওয়ার্কের একটি অপরিহার্য কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

একবিংশ শতাব্দীতে কোনো ভূখণ্ডের গুরুত্ব শুধু সামরিক নিয়ন্ত্রণের কারণে নয়, বরং সংযোগ, বাণিজ্য, সমুদ্রপথ, জ্বালানি প্রবাহ, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার জন্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণেই বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে ভূগোলের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ব্রিটিশ ভূরাজনীতিবিদ হলফোর্ড ম্যাকিন্ডার (১৮৬১-১৯৪৭) তাঁর বিখ্যাত ‘হার্টল্যান্ড তত্ত্ব’ উপস্থাপন করেছিলেন, যেখানে ইউরেশিয়ার কেন্দ্রভাগ নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিকে বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে। পরবর্তীতে মার্কিন ভূরাজনীতিবিদ নিকোলাস স্পাইকম্যান (১৮৯৩-১৯৪৩) যুক্তি দেন যে, বিশ্বের নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি হার্টল্যান্ডে নয়, বরং উপকূলীয় ‘রিমল্যান্ড’ অঞ্চলে নিহিত। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় স্পাইকম্যানের বিশ্লেষণ অনেকাংশে সত্যি প্রমাণিত হয়েছে, যেখানে সমুদ্রসংলগ্ন অঞ্চলগুলোই এখন বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু।

বাংলাদেশ এই রিমল্যান্ড অঞ্চলের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে আজ চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলোর আগ্রহ ক্রমাগত বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে চলাচলকারী সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের নীল অর্থনীতি, সমুদ্রসম্পদ, উপকূলীয় বন্দর এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্ভাবনাও এ অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। গবেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগর বর্তমানে বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য করিডোর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে ঘিরে যে আন্তর্জাতিক আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তা পরিবর্তিত বৈশ্বিক রাজনীতি ও ভূ-অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পুনর্বিন্যাসের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি।

বাংলাদেশের গুরুত্ব বোঝার জন্য শুধু বঙ্গোপসাগরের দিকে তাকালেই হবে না; উত্তর ও পূর্ব দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল (সেভেন সিস্টারস), মিয়ানমারের রাখাইন ও সাগাইং অঞ্চল, নেপাল এবং চীনের ইউনান প্রদেশের মধ্যে একটি স্বাভাবিক স্থলসংযোগ তৈরি করতে পারে। এই অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উৎপাদন ও বাণিজ্য নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার বড় সুযোগ সৃষ্টি করে। এ কারণেই অনেক বিশ্লেষক বাংলাদেশকে ‘সংযোগ রাষ্ট্র’ (কনেকটিভিটি স্টেট) হিসেবে অভিহিত করেন। সড়ক, রেল, নৌ ও বন্দরভিত্তিক অবকাঠামো সমন্বিতভাবে গড়ে তোলার পাশাপাশি শুল্কব্যবস্থা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিকস সেবাকে আধুনিক করা গেলে বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট ও লজিস্টিকস কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

বিশ্বরাজনীতির আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ আলফ্রেড থেয়ার মাহান (১৮৪০-১৯১৪) তাঁর বিখ্যাত ‘দ্য ইনফ্লুয়েন্স অব সি পাওয়ার আপন হিস্টোরি’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, যে রাষ্ট্র সমুদ্রপথ, বন্দর এবং নৌবাণিজ্যের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই দীর্ঘ মেয়াদে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। বঙ্গোপসাগর এবং বৃহত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বাংলাদেশের সামুদ্রিক অবস্থানও নতুন মাত্রা পেয়েছে। সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর দেশের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড) সম্প্রসারিত হয়েছে, যা নীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমির নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। মৎস্যসম্পদ, অফশোর জ্বালানি, সামুদ্রিক খনিজ, নবায়নযোগ্য শক্তি, জাহাজ নির্মাণ ও সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনের মতো খাতগুলো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় ভিত্তি হতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশের গুরুত্ব আরও বেড়েছে এশিয়া-প্যাসিফিক সহযোগিতার ধারণার উত্থানের কারণে। একসময় বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্র আটলান্টিক মহাসাগরে থাকলেও আজ তা এশিয়া-প্যাসিফিকে স্থানান্তরিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া-প্যাসিফিক কৌশল, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি এবং জাপানের ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণা—এসব কৌশলগত উদ্যোগের মধ্যেই বঙ্গোপসাগর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উপস্থিত। এসব উদ্যোগের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ভিন্ন হলেও তারা বাংলাদেশ ও বঙ্গোপসাগরের ভৌগোলিক গুরুত্বকে সমানভাবে স্বীকৃতি দেয়।

তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এই ভূরাজনৈতিক অবস্থানের গুরুত্বকে কীভাবে জাতীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের শক্তিতে রূপান্তর করা যায়। উন্নত বন্দর, দক্ষ কাস্টমস ব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য সড়ক ও রেল যোগাযোগ, কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ছাড়া ভৌগোলিক সুবিধা অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয় না। সিঙ্গাপুরের মতো ছোট রাষ্ট্র সীমিত ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়েও ভূগোলকে কৌশলগত সম্পদে পরিণত করে বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্যও প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো, সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় কৌশলের মাধ্যমে ভূগোলকে টেকসই উন্নয়ন ও আঞ্চলিক নেতৃত্বের শক্তিশালী ভিত্তিতে রূপান্তর করা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় সংযোগ-কৌশল, যেখানে সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌপথ, জ্বালানি অবকাঠামো ও ডিজিটাল নেটওয়ার্ককে একই উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করা হবে।

একই সঙ্গে প্রয়োজন একটি সুসংহত ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, যা কোনো একটি পরাশক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি না করে সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে। বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক গবেষকরা একে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি) বলে অভিহিত করেন। এর অর্থ কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করা নয়; বরং নিজস্ব স্বার্থ ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে স্বাধীন কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। বর্তমান বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় এ ধরনের কৌশলই তুলনামূলকভাবে ছোট ও মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে কার্যকর। চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ-চীন সংযোগ সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব (বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর) বাংলাদেশের সামনে এক ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা ও জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগোতে পারলে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র থেকে আঞ্চলিক সংযোগ ও বিনিয়োগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবসম্ভব লক্ষ্য।

নিবন্ধটি লিখেছেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটনের ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি।

প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯: ১৩আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯: ২২

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh

নিউজটি শেয়ার করুন

ভূরাজনীতি ও আঞ্চলিক সংযোগের নতুন কেন্দ্রে বাংলাদেশ

আপডেট সময় : ০৯:৫৩:০৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি বহুল আলোচিত উক্তি হলো—‘ভূগোল রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণ করে না, কিন্তু রাষ্ট্রের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার কাঠামো নির্ধারণ করে’। এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হচ্ছে, কোনো দেশের ভৌগোলিক অবস্থান নিজে থেকেই তাকে শক্তিশালী করে তোলে না; বরং সেই ভূগোলকে রাষ্ট্র কতটা দক্ষতার সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পদে রূপান্তর করতে পারে, তার ওপরই তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। যেসব দেশ নিজেদের অবস্থানের কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছে, তারা সীমিত সম্পদ নিয়েও বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে, যারা এই তাৎপর্য বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে, তারা প্রায়ই বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার বলয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারেনি। আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় ভূগোল এখন আর শুধু মানচিত্রের অবস্থান নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মৌলিক ভিত্তি।

বাংলাদেশ আজ এমন এক ভূরাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তার ভৌগোলিক অবস্থান একদিকে আশীর্বাদ, অন্যদিকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের কারণ। বিশ্বের বৃহত্তম উপসাগর বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত বাংলাদেশ একই সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল। পশ্চিমে ভারত, পূর্বে মিয়ানমার এবং দক্ষিণে ভারত মহাসাগরীয় জলপথের এই অবস্থান বাংলাদেশকে একটি স্বাভাবিক আঞ্চলিক সেতুবন্ধে পরিণত করেছে। উত্তরদিকের হিমালয়-সংলগ্ন অঞ্চল এবং ব্রহ্মপুত্র-গঙ্গা-মেঘনা অববাহিকার ভূপ্রকৃতি এর গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশকে শুধু একটি রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একটি ভূরাজনৈতিক করিডোর, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখা হয়। সঠিক পরিকল্পনা ও দূরদর্শী নীতিমালার মাধ্যমে এই অবস্থানকে কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক যোগাযোগ ও উৎপাদন নেটওয়ার্কের একটি অপরিহার্য কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

একবিংশ শতাব্দীতে কোনো ভূখণ্ডের গুরুত্ব শুধু সামরিক নিয়ন্ত্রণের কারণে নয়, বরং সংযোগ, বাণিজ্য, সমুদ্রপথ, জ্বালানি প্রবাহ, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার জন্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণেই বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে ভূগোলের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ব্রিটিশ ভূরাজনীতিবিদ হলফোর্ড ম্যাকিন্ডার (১৮৬১-১৯৪৭) তাঁর বিখ্যাত ‘হার্টল্যান্ড তত্ত্ব’ উপস্থাপন করেছিলেন, যেখানে ইউরেশিয়ার কেন্দ্রভাগ নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিকে বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে। পরবর্তীতে মার্কিন ভূরাজনীতিবিদ নিকোলাস স্পাইকম্যান (১৮৯৩-১৯৪৩) যুক্তি দেন যে, বিশ্বের নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি হার্টল্যান্ডে নয়, বরং উপকূলীয় ‘রিমল্যান্ড’ অঞ্চলে নিহিত। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় স্পাইকম্যানের বিশ্লেষণ অনেকাংশে সত্যি প্রমাণিত হয়েছে, যেখানে সমুদ্রসংলগ্ন অঞ্চলগুলোই এখন বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু।

বাংলাদেশ এই রিমল্যান্ড অঞ্চলের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে আজ চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলোর আগ্রহ ক্রমাগত বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে চলাচলকারী সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের নীল অর্থনীতি, সমুদ্রসম্পদ, উপকূলীয় বন্দর এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্ভাবনাও এ অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। গবেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগর বর্তমানে বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য করিডোর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে ঘিরে যে আন্তর্জাতিক আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তা পরিবর্তিত বৈশ্বিক রাজনীতি ও ভূ-অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পুনর্বিন্যাসের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি।

বাংলাদেশের গুরুত্ব বোঝার জন্য শুধু বঙ্গোপসাগরের দিকে তাকালেই হবে না; উত্তর ও পূর্ব দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল (সেভেন সিস্টারস), মিয়ানমারের রাখাইন ও সাগাইং অঞ্চল, নেপাল এবং চীনের ইউনান প্রদেশের মধ্যে একটি স্বাভাবিক স্থলসংযোগ তৈরি করতে পারে। এই অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উৎপাদন ও বাণিজ্য নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার বড় সুযোগ সৃষ্টি করে। এ কারণেই অনেক বিশ্লেষক বাংলাদেশকে ‘সংযোগ রাষ্ট্র’ (কনেকটিভিটি স্টেট) হিসেবে অভিহিত করেন। সড়ক, রেল, নৌ ও বন্দরভিত্তিক অবকাঠামো সমন্বিতভাবে গড়ে তোলার পাশাপাশি শুল্কব্যবস্থা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিকস সেবাকে আধুনিক করা গেলে বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট ও লজিস্টিকস কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

বিশ্বরাজনীতির আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ আলফ্রেড থেয়ার মাহান (১৮৪০-১৯১৪) তাঁর বিখ্যাত ‘দ্য ইনফ্লুয়েন্স অব সি পাওয়ার আপন হিস্টোরি’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, যে রাষ্ট্র সমুদ্রপথ, বন্দর এবং নৌবাণিজ্যের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই দীর্ঘ মেয়াদে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। বঙ্গোপসাগর এবং বৃহত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বাংলাদেশের সামুদ্রিক অবস্থানও নতুন মাত্রা পেয়েছে। সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর দেশের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড) সম্প্রসারিত হয়েছে, যা নীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমির নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। মৎস্যসম্পদ, অফশোর জ্বালানি, সামুদ্রিক খনিজ, নবায়নযোগ্য শক্তি, জাহাজ নির্মাণ ও সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনের মতো খাতগুলো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় ভিত্তি হতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশের গুরুত্ব আরও বেড়েছে এশিয়া-প্যাসিফিক সহযোগিতার ধারণার উত্থানের কারণে। একসময় বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্র আটলান্টিক মহাসাগরে থাকলেও আজ তা এশিয়া-প্যাসিফিকে স্থানান্তরিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া-প্যাসিফিক কৌশল, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি এবং জাপানের ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণা—এসব কৌশলগত উদ্যোগের মধ্যেই বঙ্গোপসাগর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উপস্থিত। এসব উদ্যোগের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ভিন্ন হলেও তারা বাংলাদেশ ও বঙ্গোপসাগরের ভৌগোলিক গুরুত্বকে সমানভাবে স্বীকৃতি দেয়।

তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এই ভূরাজনৈতিক অবস্থানের গুরুত্বকে কীভাবে জাতীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের শক্তিতে রূপান্তর করা যায়। উন্নত বন্দর, দক্ষ কাস্টমস ব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য সড়ক ও রেল যোগাযোগ, কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ছাড়া ভৌগোলিক সুবিধা অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয় না। সিঙ্গাপুরের মতো ছোট রাষ্ট্র সীমিত ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়েও ভূগোলকে কৌশলগত সম্পদে পরিণত করে বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্যও প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো, সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় কৌশলের মাধ্যমে ভূগোলকে টেকসই উন্নয়ন ও আঞ্চলিক নেতৃত্বের শক্তিশালী ভিত্তিতে রূপান্তর করা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় সংযোগ-কৌশল, যেখানে সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌপথ, জ্বালানি অবকাঠামো ও ডিজিটাল নেটওয়ার্ককে একই উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করা হবে।

একই সঙ্গে প্রয়োজন একটি সুসংহত ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, যা কোনো একটি পরাশক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি না করে সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে। বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক গবেষকরা একে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি) বলে অভিহিত করেন। এর অর্থ কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করা নয়; বরং নিজস্ব স্বার্থ ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে স্বাধীন কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। বর্তমান বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় এ ধরনের কৌশলই তুলনামূলকভাবে ছোট ও মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে কার্যকর। চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ-চীন সংযোগ সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব (বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর) বাংলাদেশের সামনে এক ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা ও জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগোতে পারলে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র থেকে আঞ্চলিক সংযোগ ও বিনিয়োগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবসম্ভব লক্ষ্য।

নিবন্ধটি লিখেছেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটনের ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি।

প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯: ১৩আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯: ২২

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh