মুনাফা ছাড়ার অঙ্গীকার দিয়ে টাকা পাচ্ছেন আমানতকারীরা
- আপডেট সময় : ১২:১৪:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে নিজেদের জমা করা আমানত তুলতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহকেরা। এককালীন মূল টাকা ফেরত পাওয়ার শর্ত হিসেবে তাঁদের কাছ থেকে বিশেষ অঙ্গীকারনামা আদায় করা হচ্ছে। এই অঙ্গীকারনামার শর্ত অনুযায়ী, গ্রাহকদের মুনাফা, সুদ বা অন্যান্য আর্থিক সুবিধা ত্যাগ করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এই নিয়ে ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট কারও বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না বলেও শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে আমানতকারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
আর্থিক অনিয়মের কারণে সংকটে পড়া শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংককে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে একীভূত করে সরকারি মালিকানাধীন ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়। চলতি মাসের ৭ সেপ্টেম্বর থেকে এই ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, কোনো গ্রাহক এককালীন পুরো মূল টাকা তুলতে চাইলে তাঁকে দুই পৃষ্ঠার একটি ‘আবেদনপূর্বক অঙ্গীকারনামা’য় স্বাক্ষর করতে হচ্ছে। এই অঙ্গীকারনামার শর্ত অনুযায়ী, মূলধন বুঝে নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট আমানত হিসাবের ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি’ হয়ে যাবে। ফলে আমানতকারী বা তাঁর উত্তরাধিকারী, নমিনি ও আইনগত প্রতিনিধিরা ভবিষ্যতে ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো দাবি, অভিযোগ, আপিল বা মামলা করতে পারবেন না। এই অঙ্গীকারনামায় আমানতকারীর স্বাক্ষরের পাশাপাশি দুজন সাক্ষীর স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়েছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ২১ সেপ্টেম্বরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৮২ জন গ্রাহক ব্যাংকটি থেকে মোট ৬ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা তোলার জন্য আবেদন করেছেন। এর মধ্যে ৯০ হাজার ৯০৮ জন গ্রাহক ইতিমধ্যে ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। একই সময়ে ব্যাংকে নতুন আমানত এসেছে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং খোলা হয়েছে ৩২,০৭৪টি নতুন হিসাব, যেখান থেকে আরও ৩৭৮ কোটি টাকা আমানত যোগ হয়েছে।
আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঘোষিত একটি স্কিমের আওতায়। এর আগে চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসকদের চিঠি দিয়ে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের স্থিতির ওপর মুনাফা না দেওয়ার (হেয়ারকাট) সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল। তবে গত ২৫ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায় যে আমানতকারীদের ওপর কোনো হেয়ারকাট থাকবে না এবং ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তি আমানতকারীরা মূল অর্থ তুলতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে মূল টাকা একবারে তুলতে গেলে গ্রাহকদের মুনাফা ও আইনি অধিকার ছাড়ার অঙ্গীকার করতে হচ্ছে, যার কারণে অনেকে আবেদন করেও টাকা নিতে আসছেন না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, যেসব গ্রাহকদের এই ব্যাংকগুলো ঋণ দিয়েছিল, তারা মুনাফাসহ আসল টাকা ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই অর্থ ফেরত না পাওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে যাঁরা টাকা চাচ্ছেন, সাময়িকভাবে তাঁদের মুনাফা কেটে রাখা হচ্ছে। সংকট কেটে গেলে বাকিরা মুনাফাসহ টাকা তুলতে পারবেন বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
এদিকে ব্যাংকের এই নীতিতে আমানতকারীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। মোহাম্মদ মোতাসিম বিল্লাহ নামের এক গ্রাহক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যে অঙ্গীকারনামা নেওয়া হচ্ছে, তা অবৈধ এবং আমানতকারীদের জন্য আর্থিক ক্ষতির কারণ। আমরা এর প্রতিকার ও ন্যায্যতা চাই।’
আবদুর রহমান নামের আরেক গ্রাহক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেন, ইউনিয়ন ব্যাংকের রাজশাহী শাখায় ৬ সেপ্টেম্বর আবেদন করার পর ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঘোরানো হলেও তাঁর আবেদন অনুমোদন করা হয়নি, অথচ এমডি বলেছিলেন জরুরি আবেদন তিন দিনে নিষ্পত্তি হবে। আকিকুল বাশার চৌধুরী নামের আরেক গ্রাহক জানান, ১০ সেপ্টেম্বর হেয়ারকাট বাতিলের প্রজ্ঞাপন হলেও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ময়মনসিংহ সদর শাখা ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তা পায়নি। জরুরি প্রয়োজনে ডিপিএস ও এফডিআর ভেঙে আংশিক টাকা তোলার আবেদন করেও ২০ দিনে তিনি কোনো অনুমোদন পাননি।
সম্প্রতি গত সোমবার সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক সব বিভাগীয় প্রধান ও শাখা ব্যবস্থাপকদের ব্যক্তিগত মেয়াদি এবং স্কিমভিত্তিক আমানতের মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণ ও স্থিতি পুনর্হিসাবের বিষয়ে চিঠি দিয়েছে, যদিও মুনাফার হার এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি। একই চিঠিতে মৃত আমানতকারীদের উত্তরাধিকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া এবং ব্লক থাকা হিসাবগুলো প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে আনব্লক করে টাকা উত্তোলনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।





























