জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কোনো শর্টকাট সমাধান নেই: সরকার
- আপডেট সময় : ১০:০৩:২৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সৃষ্ট নাভিশ্বাস অবস্থা থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করার জন্য সরকারের হাতে কোনো শর্টকাট বা তাৎক্ষণিক সমাধান নেই। হঠাৎ করে জ্বালানি সংকট, ভাসমান টার্মিনাল মেরামতে বিলম্ব এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এলএনজি কার্গো না আসার মতো বিষয়গুলোতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
চলমান এই ভয়াবহ পরিস্থিতি উত্তরণের উপায় খুঁজতে গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রধানরা অংশ নেন। বৈঠকে সমস্যাগুলোর কারণ উদঘাটন এবং স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা থেকে মুক্তির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, এটি দেখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের। অন্যদিকে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, প্রধানমন্ত্রী পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত আছেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, শীঘ্রই দেশবাসী এর সুফল পাবে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের মতে, গত ১৮ বছরে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় জ্বালানি খাত পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। বর্তমানে দেশে চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও জ্বালানি সংকটের কারণে তীব্র লোডশেডিং হচ্ছে। জ্বালানি বিভাগ প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছে যে, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে স্থায়ী সমাধানে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩,৮০০ এমএমসিএফডি হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে তা ৫,০০০ এমএমসিএফডির বেশি। অথচ বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২,১৯৫ এমএমসিএফডি, যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১,৬২৫ এমএমসিএফডি এবং এলএনজি থেকে ৫৭০ এমএমসিএফডি সরবরাহ করা হয়েছে। গতকাল গ্যাসের ঘাটতি ছিল ১,৬০৫ এমএমসিএফডি। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক রান্নাবান্নায়। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় ৭,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত আওয়ামী লীগ সরকারের ভুলনীতি এবং গ্যাস অনুসন্ধান না করার আত্মঘাতী সিদ্ধান্তই আজকের সংকটের মূল কারণ। জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত ছিল ২৯.৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২.১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট উত্তোলন করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৭.৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিয়ে বর্তমান হারে সরবরাহ চালিয়ে গেলে বড়জোর ১২ বছর চলতে পারে। এছাড়া, চলতি বছর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে এলএনজি আমদানি ব্যয় ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে সরকার কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, বিগত ১৭ বছরে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় পুরো খাত বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দেশের মাটিতে নতুন গ্যাসের সন্ধান ও অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের মাধ্যমে এই কাজ এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য হলো দেশের গ্যাসক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের মানুষের হাতেই রাখা।
সূত্র আরো জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া প্রতি ঘনমিটারের গড় মূল্য পড়েছে তিন টাকা ৩৯ পয়সা। একই পরিমাণ গ্যাস আমদানিতে খরচ পড়েছে ৬৮ টাকা ৭১ পয়সা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া ৭২.২১ শতাংশ গ্যাসের দাম পড়েছে ৬৬২৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। একই সময়ে আমদানিকৃত ২৬.৮৯ শতাংশ গ্যাসের দাম পড়েছে ৪৩ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে চলতি বছর এলএনজি আমদানি ব্যয় ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলেও জানান সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।


























