মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছে রণতরী জর্জ ওয়াশিংটন, ফিরছে রেকর্ড গড়া ‘আব্রাহাম লিংকন’
- আপডেট সময় : ১১:০৯:৩৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন। দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রে অবস্থান করা লিংকনের নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ এবং খাদ্য, স্বাস্থ্যসামগ্রী ও ডাক সরবরাহে ঘাটতির খবরের মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে নতুন এই রণতরীটি পাঠানো হচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন গত সপ্তাহে ভিয়েতনামের দা নাং বন্দর ত্যাগ করেছে। এরপর একটি ক্রুজার ও একটি ডেস্ট্রয়ারসহ রণতরীটিকে সিঙ্গাপুর প্রণালি অতিক্রম করতে দেখা যায়। বর্তমানে এটি মালাক্কা প্রণালিতে অবস্থান করছে এবং ভারত মহাসাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। জর্জ ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছালে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অনির্দিষ্টকালের জন্য কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরী থাকবে না।
রেকর্ড সৃষ্টিকারী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন গত বছরের ২১ নভেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো থেকে রওনা হয়ে চলতি বছরের জানুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছায়। এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরু হলে রণতরীটি সেখানে মূল ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে এটি টানা ২৬০ দিনের বেশি সময় ধরে সমুদ্রে রয়েছে, যা মার্কিন নৌবাহিনীর ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘতম মোতায়েনের রেকর্ড।
দীর্ঘদিনের এই মোতায়েন নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ কেন্দ্রগুলো ব্যাহত হওয়ায় লিংকনে খাবার, স্বাস্থ্যসামগ্রী ও ডাক পৌঁছাতে সমস্যা হয়েছিল বলে স্বীকার করেছে নৌবাহিনী। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রথমে খাবার, তারপর স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রী এবং সবশেষে ডাককে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমানে জাহাজে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যকর খাবার রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
লিংকনের পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত ও বিস্তারিত তথ্য চেয়েছেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা। কানেকটিকাটের সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল নৌবাহিনীর নেতৃত্বকে চিঠি দিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর চেয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির কারণে লিংকনের এই মোতায়েন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে অ্যারিজোনার সিনেটর ও সাবেক মেরিন রুবেন গ্যালেগো দুই দলের আইনপ্রণেতাদের নিয়ে লিংকন পরিদর্শনের উদ্যোগ নিচ্ছেন। নাবিকদের সঙ্গে যে আচরণ করা হচ্ছে, তাকে তিনি বিপজ্জনক বলে মন্তব্য করেছেন।
তবে পেন্টাগন এসব অভিযোগের অনেকগুলোই অস্বীকার করেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, লিংকনের পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদন সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। দীর্ঘ মোতায়েনের জন্য নাবিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব ক্রু পরিবর্তন করে তাদের দেশে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। জাহাজে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ার তথ্যও নাকচ করেছে নৌবাহিনী। তবে আগস্টের শুরুতে এক নাবিক সমুদ্রে পড়ে যাওয়ার পর তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। সেটি আত্মহত্যার চেষ্টা ছিল কি না, তা নিশ্চিত করা হয়নি।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড লিংকনের নাবিক ও মেরিনদের সক্ষমতার প্রশংসা করে জানিয়েছে, ২৬০ দিনের বেশি সমুদ্রে থাকা অবস্থায় লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ১০ হাজারের বেশি বিমান উড্ডয়ন পরিচালনা করেছে এবং প্রায় ১৫ লাখ পাউন্ড গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে।
এর আগে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড প্রায় ১১ মাসের মোতায়েন শেষে গত মে মাসে দেশে ফেরে, যা ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর অন্যতম দীর্ঘতম মোতায়েন। ওই সময় ফোর্ড ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানের পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার অভিযানেও সহায়তা করেছিল। দীর্ঘ মোতায়েনের সময় ফোর্ডের লন্ড্রি এলাকায় আগুন লাগার পর মেরামতের জন্য সেটিকে ভূমধ্যসাগরে ফিরে যেতে হয়েছিল, যা নাবিকদের আবাসন সমস্যায় ফেলেছিল।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমলেও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমার কোনো লক্ষণ নেই। গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌবাহিনী নতুন করে অবরোধ আরোপ করেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ জানিয়েছেন, এই অবরোধ অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। ফলে জর্জ ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য যাত্রা কেবল একটি রণতরী বদল নয়, বরং ইরানকে ঘিরে মার্কিন নৌবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারই অংশ।




























