অনুমতি ছাড়া ছবি তোলা ও ছড়ানো কি আইনত অপরাধ?
- আপডেট সময় : ০১:৩৮:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬ ১৯ বার পড়া হয়েছে

স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের ফলে ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ধারণ, সংরক্ষণ এবং মুহূর্তের মধ্যে অন্যের কাছে পাঠানো অত্যন্ত সহজ হয়ে গেছে। প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগ। সম্প্রতি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর বিরুদ্ধে তার সহপাঠী ও রুমমেটদের ব্যক্তিগত ও গোপনীয় ছবি অনুমতি ছাড়া তার প্রেমিকের কাছে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। বিবিসি বাংলার তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় হল প্রশাসন অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে এবং ঘটনাটি তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। প্রায়ই কারও সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও ধারণ, সংরক্ষণ বা অন্যের কাছে পাঠানোর অভিযোগ সামনে আসে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও এমন একাধিক ঘটনা আলোচনায় এসেছে, যেখানে অভিনেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের ছবি, জনসমক্ষে ধারণ করা ভিডিও কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও ভুক্তভোগী হচ্ছেন। তবে এর বিপরীত চিত্রও আছে, যেখানে গোপনে ধারণ করা ছবি বা ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অনিয়ম প্রকাশ্যে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের সীমারেখা নিয়ে আইনি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের মতে, অনুমতি ছাড়া কারও ছবি বা ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়া অনেক ক্ষেত্রেই আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। বিশেষ করে কারও ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি, ভিডিও কিংবা এমন পোশাক পরা ছবি যেখানে শরীরের অংশ প্রকাশ পাচ্ছে, তা অনুমতি ছাড়া অন্যের কাছে পাঠানো বা ছড়িয়ে দিলে একাধিক আইনের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অভিযোগের ধরন অনুযায়ী পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৬, ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি, এমনকি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ভুক্তভোগীরা আইনি সুরক্ষা ও প্রতিকার পেতে পারেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান জানান, ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়ালে পর্নোগ্রাফি আইনে ১০ বছরের সাজার বিধান রয়েছে। এছাড়া সাইবার নিরাপত্তা আইনে ১০ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডের বিধানও আছে। তিনি বলেন, যদি কেউ কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে বা মানহানিকর বক্তব্যসহ ছবি প্রচার করে, তবে তা আইনের আওতায় চলে আসে। অনেক সময় কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা ভিডিও করতে গিয়ে অন্যদের ছবি প্রচার করে দেন, যা মানহানিকর হতে পারে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, পার্কে ছোট ছেলে-মেয়েদের ভিডিও করে ‘আপত্তিকর অবস্থায়’ ধরা হয়েছে বলে প্রচার করা সাইবার অপরাধ। প্রয়োজনে তাদের বাবা-মাকে জানানো যেতে পারে, কিন্তু ভিডিও ধারণ করে প্রচার করা মানহানিকর।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ একই ধরনের মত দিয়ে বলেন, কোনো ভিডিও ধারণ ও প্রকাশের কারণে যদি কারও প্রাইভেসি নষ্ট হয় বা মানহানি ঘটে, তবে সেটি অপরাধ। তিনি বলেন, কোনো নারী তার প্রেমিকের সাথে গল্প করছেন বা চা খাচ্ছেন—এমন দৃশ্য ধারণ করে ছেড়ে দেওয়া ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন। ক্ষতি না হলেও ব্যক্তিগত মানসম্মান ক্ষুণ্ণ হওয়াটাও আইনে অপরাধ। এছাড়া এআই বা আসল ছবি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৬ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য।
তবে আইনজীবীরা বলছেন, প্রতিটি ছবি বা ভিডিও একইভাবে দেখা হয় না। দুর্নীতি, ঘুষ বা ধর্ষণের মতো অপরাধের প্রমাণ হিসেবে ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করা হলে আদালত সেটির উদ্দেশ্য ও জনস্বার্থ বিবেচনায় নেয়। মনজিল মোরসেদ বলেন, সাংবাদিকরা ঘুষ নেওয়ার ছবি প্রকাশ করলে সাধারণত মামলা হয় না, কারণ অপরাধী নিজেই চাপে থাকে। তবে যদি মামলা হয়, তবে জনস্বার্থে করা হয়েছে বলে আদালত অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ইশরাত হাসান জানান, কোথাও অপরাধ হলে সেই ছবি আদালতে দেওয়া যাবে। তবে ছবি প্রচার না হলেও শুধু তোলা বা আদান-প্রদান হওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের আইনে এখনও স্পষ্ট নয়।
পাবলিক প্লেসের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য। ইশরাত হাসান বলেন, পাবলিক প্লেসে (যেমন বাস স্টেশন, ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস) ছবি তুললেই কোনো সমস্যা নেই—এই ধারণা সঠিক নয়। পাবলিক প্লেসেও কারও ব্যক্তিগত মুহূর্ত থাকতে পারে। কেউ তার প্রেমিক বা এমন কারও সাথে কথা বলতে পারে যা সে প্রকাশ করতে চায় না। এমন ছবি প্রকাশের ফলে কেউ আপত্তি তুললে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সিভিল কোর্টে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের আইনে অনুমতি ছাড়া ছবি তোলা সব ক্ষেত্রে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত না হলেও, ভুক্তভোগী সংক্ষুব্ধ হলে বিষয়টি আইনি প্রশ্নের জন্ম দেয়।





























