চাঁদ জয়ের নতুন লড়াই: মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন

- আপডেট সময় : ১১:৪৫:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

এক সময়ের ভূখণ্ড বা সমুদ্রপথ দখলের লড়াই এখন স্থানান্তরিত হয়েছে মহাকাশে। পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ চাঁদকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে এক নতুন প্রতিযোগিতা, যার মূল কেন্দ্রবিন্দু চাঁদের দক্ষিণ মেরু। এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণার লক্ষ্যে বিশ্বের দুই পরাশক্তি—যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এখন মুখোমুখি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই লড়াইয়ের পেছনে রয়েছে ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মহাকাশে স্থায়ী আধিপত্য বিস্তারের এক বিরাট পরিকল্পনা।
প্রায় ষাট বছর আগে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে চন্দ্রবিজয় প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল, ১৯৬৯ সালে অ্যাপোলো-১১ অভিযানের মাধ্যমে তার সমাপ্তি ঘটে। সে সময় লক্ষ্য ছিল কেবল চাঁদে পৌঁছানো এবং নিরাপদে ফিরে আসা। কিন্তু বর্তমানের লড়াই সম্পূর্ণ ভিন্ন। এবারের লক্ষ্য চাঁদে স্থায়ী মানব বসতি এবং সেখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করা।
বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, চাঁদের দক্ষিণ মেরুর গহ্বরগুলোতে বিপুল পরিমাণ বরফ জমা রয়েছে। এই বরফ গলিয়ে একদিকে যেমন পানের উপযোগী পানি পাওয়া যাবে, অন্যদিকে তা থেকে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন আলাদা করে রকেটের জ্বালানি তৈরি করা সম্ভব হবে। ফলে চাঁদ থেকেই পরবর্তী মহাকাশ অভিযানের জ্বালানি সংগ্রহ করা যাবে, যা মঙ্গল গ্রহ বা দূরবর্তী মহাকাশ ভ্রমণকে অনেক সহজ করে তুলবে। তবে এই বরফ সব জায়গায় সমভাবে না থাকায় নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের দখল নিয়ে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে।
এই দৌড়ে নাসা তাদের 'আর্টেমিস' কর্মসূচির মাধ্যমে বেশ এগিয়ে রয়েছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পুনরায় চাঁদে মানুষ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের মূল লক্ষ্য হলো দক্ষিণ মেরুতে একটি স্থায়ী মানবঘাঁটি স্থাপন করা, যেখানে বিজ্ঞানীরা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বা অ্যান্টার্কটিকার মতো পালাক্রমে অবস্থান করে গবেষণা চালাবেন।
পিছিয়ে নেই চীনও। নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন পরিচালনা এবং চাঁদের দূরবর্তী অংশ থেকে মাটির নমুনা সংগ্রহের পর এবার তারা রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে 'ইন্টারন্যাশনাল লুনার রিসার্চ স্টেশন' নামের একটি চন্দ্রঘাঁটি গড়ার পরিকল্পনা করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানো এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে দক্ষিণ মেরুতে গবেষণা কেন্দ্র চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বেইজিং।
তবে চাঁদের পরিবেশ অত্যন্ত বৈরী। দক্ষিণ মেরুর যেসব গহ্বরে বরফ রয়েছে, সেখানে সূর্যালোক না পৌঁছানোয় তাপমাত্রা মাইনাস ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায়। এই তীব্র ঠাণ্ডায় মানুষ ও যন্ত্রপাতি সচল রাখতে পারমাণবিক শক্তির মতো বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কথা ভাবছেন বিজ্ঞানীরা। এছাড়া ক্ষতিকর মহাজাগতিক বিকিরণ ও উল্কাপিণ্ডের আঘাত থেকে বাঁচতে ঘাঁটির একটি অংশ মাটির নিচে তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ যানবাহনের মাধ্যমে ভারী স্পেসস্যুট ছাড়াই দীর্ঘ সময় গবেষণার প্রযুক্তির ওপরও কাজ চলছে।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও চাঁদের গুরুত্ব অপরিসীম। চাঁদের দূরবর্তী অংশ পৃথিবীর রেডিও তরঙ্গমুক্ত হওয়ায় সেখানে শক্তিশালী টেলিস্কোপ বসিয়ে মহাবিশ্বের প্রাচীনতম সংকেতগুলো শনাক্ত করা সম্ভব। এছাড়া চাঁদের কম মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পৃথিবী থেকে সরাসরি যাত্রা করার পরিবর্তে চাঁদকে একটি মহাকাশ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা গেলে সময় ও জ্বালানি খরচ অনেক কমে আসবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী দুই দশকে চাঁদই হবে মহাকাশ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তবে এই প্রতিযোগিতা যাতে কোনো সংঘাতে রূপ না নেয়, সে বিষয়েও সতর্ক করেছেন তারা। চাঁদকে সমগ্র মানবজাতির যৌথ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সব কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

























