শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে যেভাবে মানসিক প্রশান্তি লাভ করা যায়

- আপডেট সময় : ০১:০৬:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

দৈনন্দিন জীবনে কোনো কিছুর অভাববোধ থেকে অনেক সময় আমরা মানসিক কষ্টে ভুগি। তবে এই কষ্ট বা হীনম্মন্যতা থেকে মুক্তি পেতে নিজের অবস্থার চেয়ে নিম্ন অবস্থায় থাকা মানুষদের দিকে তাকানো একটি কার্যকর মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। কবির একটি প্রচলিত গল্পের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট হয়, যেখানে জুতা না থাকার অভাববোধ এক মুহূর্তেই দূর হয়ে গিয়েছিল যখন তিনি এমন একজনকে দেখলেন যাঁর পা-ই নেই। অন্যের কষ্টের তীব্রতা দেখলে নিজের না-পাওয়ার বেদনা আর স্থায়ী হয় না। মানসিকভাবে ভালো থাকার জন্য এবং হীনম্মন্যতা থেকে বাঁচতে এই আত্মিক তুলনা অত্যন্ত জরুরি।
ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতেও এই মানসিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। মানসিক প্রশান্তি ফিরে পেতে মহানবী (সা.)-এর জীবন থেকে ৫ শিক্ষা আমাদের পথ দেখাতে পারে। সহিহ মুসলিমের ৭২১৪ নম্বর হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, 'তোমরা ওই ব্যক্তির দিকে দৃষ্টিপাত করো, যে তোমাদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত নিম্ন অবস্থায় আছে। তার প্রতি তাকিয়ো না যে তোমাদের চেয়ে উন্নত অবস্থায় আছে। তা না হলে তোমাদের প্রতি আল্লাহর দেওয়া অনুগ্রহগুলো তোমরা তুচ্ছ ভেবে বসবে।' নিজেকে সবসময় জাগতিকভাবে সুখী মানুষের সঙ্গে তুলনা না করে সামাজিকভাবে যারা বেশি বিপদগ্রস্ত, তাদের সঙ্গে তুলনা করা মানসিক প্রশান্তি ও আত্মিক উন্নতির জন্য জরুরি।
পবিত্র কোরআনেও আল্লাহ তায়ালা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, 'যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের নেয়ামত আরও বাড়িয়ে দেব' (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৭)। মানসিক শক্তি বৃদ্ধি পাবে যে ১০ আয়াত পাঠে, তার মধ্যে এটি অন্যতম। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অর্থ হলো আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা, যা মনের শান্তি ও জীবনে বরকত বাড়িয়ে দেয়। বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের কৃত্রিম সুখের ছবি দেখে অনেকেই নিজের জীবনের সংগ্রামের সঙ্গে ক্ষতিকর তুলনা করেন। অথচ পর্দার ওপারের মানুষটির জীবনের ধূসর বাস্তবতা বা কষ্টগুলো আমাদের অগোচরেই থেকে যায়।
আগের যুগের নেককার মানুষেরাও এই দৃষ্টিভঙ্গি মেনে চলতেন। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বিপদ এলে আল্লাহর তিনটি নেয়ামত খুঁজে বের করতেন—বিপদটি ইমানের ওপর আসেনি, এটি আরও বড় হতে পারত কিন্তু আল্লাহ তা হতে দেননি এবং এর বিনিময়ে আখেরাতে পুরস্কার পাওয়া যাবে (বাইহাকি, শুআবুল ইমান, হাদিস: ৯৬৫১)। ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.)-এর মতে, আল্লাহ প্রতিদিন আমাদের অজান্তে কত বড় বড় বিপদ দূর করে দিচ্ছেন তা যদি বান্দা জানত, তবে কৃতজ্ঞতায় তার হৃদয় গলে যেত। তাই পরিস্থিতি যেমনই হোক, 'আলহামদুলিল্লাহ' বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে মানসিক চাপ ও হতাশা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.) কৃতজ্ঞতার স্তর নিয়ে বলেছেন, ‘বান্দা যদি জানত আল্লাহ তার অজান্তে তার জীবনের কত বড় বড় ক্ষতি ও বিপদ প্রতিদিন দূর করে দিচ্ছেন, তবে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসায় ও কৃতজ্ঞতায় বান্দার হৃদয় গলে যেত।’ (ইবনুল কাইয়িম আল-জাওজিয়াহ, মাদারিজুস সালিকিন বাইনা মানাজিলি ইয়্যাকা নাবুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাইন, ২/২১৫, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯৬)তাই জাগতিকভাবে সুখী কারও সঙ্গে তুলনা না করে ভালো-মন্দ যেকোনো পরিস্থিতিতেই মনের ভেতর অনাবিল প্রশান্তি এনে দিতে পারে শুকরিয়ার ওই একটিমাত্র শব্দ—‘আলহামদুলিল্লাহ’।



























