ঢাকা ০৬:০৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মেধা তালিকায় দ্বিতীয় হয়েও নিয়োগবঞ্চিত ভোলার ফয়জুল আলম নেত্রকোণায় গোরস্থানের গাছে মিলল নিখোঁজ সাবেক সেনাসদস্যের লাশ সিডনিতে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে শাবনূর, পাশে বসে গান শোনালেন রবি চৌধুরী মাদ্রাসাসহ পুরো শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবি বিএমজিটিএ-এর ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন আইনজ্ঞ নাভি পিল্লাই মোহনগঞ্জে নিখোঁজ অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যের লাশ উদ্ধার, মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ মেট্রোরেলের পিলারে আঁকা হবে খালেদা জিয়া ও জুলাই শহীদদের ছবি জমিসংক্রান্ত বিরোধকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার অপচেষ্টা, লালমনিরহাট বিএনপির নিন্দা আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচারে ট্রানজিট রুট এখন বাংলাদেশ বাংলাদেশে সক্রিয় আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচার সিন্ডিকেট

বাংলাদেশে সক্রিয় আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচার সিন্ডিকেট

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৫:১৫:০০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তজুড়ে একটি সুসংগঠিত বন্যপ্রাণী পাচার সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রটি স্থানীয় প্রজাতির পাশাপাশি আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও দূরপ্রাচ্যের বিপন্ন প্রাণীদের পাচারের জন্য বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। অভিযানে ধরা পড়লেও আইনি ফাঁকফোকরের কারণে অপরাধীরা দ্রুত জামিনে মুক্তি পেয়ে পুনরায় একই কাজে লিপ্ত হচ্ছে, যার ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচারের অন্যতম করিডোরে পরিণত হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে দক্ষিণ আফ্রিকা, মাদাগাস্কার, আমাজন অববাহিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনভূমি থেকে বিরল প্রজাতির প্রাণী আকাশ ও সমুদ্রপথে বাংলাদেশে আনা হচ্ছে। পরবর্তীতে অত্যন্ত চতুরতার সাথে বেনাপোল, যশোর, সিলেট, হিলি ও ময়নমসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাচার করা হচ্ছে। ভারতে সাইটিস (CITES) ও নন-সাইটিস প্রাণীর বাণিজ্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হওয়ায় পাচারকারীরা বাংলাদেশকে রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে।

এই সিন্ডিকেটটি তিন থেকে চার স্তরের কাঠামোতে পরিচালিত হয়। প্রথম স্তরে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা প্রাণী সংগ্রহ করে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে বাংলাদেশে পাঠায়। দ্বিতীয় স্তরে ঢাকার মিরপুর ও উত্তরার বিভিন্ন ছদ্মবেশী ক্যাটেল হাউজ বা পেটেরিয়ান ফার্মের আড়ালে দেশীয় চক্র কাজ করে। অনেক সময় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের বাণিজ্যিক আমদানির অনুমতির অপব্যবহার করা হয়। সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ হলো সীমান্ত এলাকার লাইনম্যান ও ক্যাডার বাহিনী, যারা প্রাণীর ওজন ও ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে পাচার ফি নির্ধারণ করে সীমান্ত পারাপার নিশ্চিত করে।

পাচারকারীদের কারণে বাংলাদেশ থেকে ডাবল-হর্ন গন্ডার, গোলাপী মাথা হাঁস, নীলগাই, রাজশকুন ও স্বাদুপানির কুমির ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সুন্দরবন থেকে বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচারের ফলে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যাও কমছে। এছাড়া লজ্জাবতী বানর, এশীয় হাতি, চশমা পরা হনুমান, তক্ষক ও বনরুই চরম হুমকির মুখে।

সাম্প্রতিক অভিযানে পাচারকারীদের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। ২০২৪ সালের মে মাসে মিরপুরের একটি বাসা থেকে ১,৫০০টি প্রাণী উদ্ধার করা হয়। জুনে কক্সবাজারে ১২টি ডাঙ্গার কচ্ছপ, আগস্টে হালুয়াঘাটে দুটি লজ্জাবতী বানর এবং নভেম্বর মাসে বিমানবন্দরে ৮টি মেকাও ও ৪টি বিষধর সাপসহ একজন বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বেনাপোল সীমান্তে বিপুল পাখিসহ মূল লাইনম্যানকে আটক করে র‌্যাব। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ২৩০টি অভিযানে ৩,১৪৫টি এবং ২০২৫ সালে রেকর্ড ৪১৫টি অভিযানে মোট ৮,২৮১টি বন্যপ্রাণী জব্দ করা হয়—যার মধ্যে স্তন্যপায়ী ২৫৪টি, পাখি ৪,৭৩৫টি, সরীসৃপ ৩,২৯০টি এবং বিরল মাছ ২টি; তবে মূল হোতারা আইনি জটিলতায় অধরা থেকে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা এই পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক পরিবেশগত অপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক মিজানুর রহমান জানান, চিহ্নিত অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা চলছে এবং বিমানবন্দরগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও আইনের শিথিলতা দূর না করলে এবং সীমান্তবর্তী লাইনম্যান চক্র ভেঙে না দিলে এই ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করা সম্ভব নয়।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Bangladesh

নিউজটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশে সক্রিয় আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচার সিন্ডিকেট

আপডেট সময় : ০৫:১৫:০০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬

দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তজুড়ে একটি সুসংগঠিত বন্যপ্রাণী পাচার সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রটি স্থানীয় প্রজাতির পাশাপাশি আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও দূরপ্রাচ্যের বিপন্ন প্রাণীদের পাচারের জন্য বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। অভিযানে ধরা পড়লেও আইনি ফাঁকফোকরের কারণে অপরাধীরা দ্রুত জামিনে মুক্তি পেয়ে পুনরায় একই কাজে লিপ্ত হচ্ছে, যার ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচারের অন্যতম করিডোরে পরিণত হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে দক্ষিণ আফ্রিকা, মাদাগাস্কার, আমাজন অববাহিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনভূমি থেকে বিরল প্রজাতির প্রাণী আকাশ ও সমুদ্রপথে বাংলাদেশে আনা হচ্ছে। পরবর্তীতে অত্যন্ত চতুরতার সাথে বেনাপোল, যশোর, সিলেট, হিলি ও ময়নমসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাচার করা হচ্ছে। ভারতে সাইটিস (CITES) ও নন-সাইটিস প্রাণীর বাণিজ্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হওয়ায় পাচারকারীরা বাংলাদেশকে রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে।

এই সিন্ডিকেটটি তিন থেকে চার স্তরের কাঠামোতে পরিচালিত হয়। প্রথম স্তরে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা প্রাণী সংগ্রহ করে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে বাংলাদেশে পাঠায়। দ্বিতীয় স্তরে ঢাকার মিরপুর ও উত্তরার বিভিন্ন ছদ্মবেশী ক্যাটেল হাউজ বা পেটেরিয়ান ফার্মের আড়ালে দেশীয় চক্র কাজ করে। অনেক সময় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের বাণিজ্যিক আমদানির অনুমতির অপব্যবহার করা হয়। সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ হলো সীমান্ত এলাকার লাইনম্যান ও ক্যাডার বাহিনী, যারা প্রাণীর ওজন ও ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে পাচার ফি নির্ধারণ করে সীমান্ত পারাপার নিশ্চিত করে।

পাচারকারীদের কারণে বাংলাদেশ থেকে ডাবল-হর্ন গন্ডার, গোলাপী মাথা হাঁস, নীলগাই, রাজশকুন ও স্বাদুপানির কুমির ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সুন্দরবন থেকে বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচারের ফলে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যাও কমছে। এছাড়া লজ্জাবতী বানর, এশীয় হাতি, চশমা পরা হনুমান, তক্ষক ও বনরুই চরম হুমকির মুখে।

সাম্প্রতিক অভিযানে পাচারকারীদের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। ২০২৪ সালের মে মাসে মিরপুরের একটি বাসা থেকে ১,৫০০টি প্রাণী উদ্ধার করা হয়। জুনে কক্সবাজারে ১২টি ডাঙ্গার কচ্ছপ, আগস্টে হালুয়াঘাটে দুটি লজ্জাবতী বানর এবং নভেম্বর মাসে বিমানবন্দরে ৮টি মেকাও ও ৪টি বিষধর সাপসহ একজন বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বেনাপোল সীমান্তে বিপুল পাখিসহ মূল লাইনম্যানকে আটক করে র‌্যাব। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ২৩০টি অভিযানে ৩,১৪৫টি এবং ২০২৫ সালে রেকর্ড ৪১৫টি অভিযানে মোট ৮,২৮১টি বন্যপ্রাণী জব্দ করা হয়—যার মধ্যে স্তন্যপায়ী ২৫৪টি, পাখি ৪,৭৩৫টি, সরীসৃপ ৩,২৯০টি এবং বিরল মাছ ২টি; তবে মূল হোতারা আইনি জটিলতায় অধরা থেকে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা এই পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক পরিবেশগত অপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক মিজানুর রহমান জানান, চিহ্নিত অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা চলছে এবং বিমানবন্দরগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও আইনের শিথিলতা দূর না করলে এবং সীমান্তবর্তী লাইনম্যান চক্র ভেঙে না দিলে এই ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করা সম্ভব নয়।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Bangladesh