সোনালী ব্যাংকে দুই মাসেই খেলাপি ঋণ বাড়ল আড়াই হাজার কোটি টাকা
- আপডেট সময় : ০৮:৪৪:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান সোনালী ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমানোর ক্ষেত্রে যে সাফল্য দেখিয়েছিল, তা ধরে রাখতে পারেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন ছাড় সুবিধা ব্যবহার করে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা হলেও সম্প্রতি তা আবারও ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে। সর্বশেষ জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসেই ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২,৪৬০ কোটি টাকা। বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮,১৭০ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ১৮.৭২ শতাংশ। এই সময়ে ব্যাংকটির মোট ঋণ স্থিতি ছিল ৯৭,০৭২ কোটি টাকা। দেশের বৃহত্তম এই রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির এই প্রবণতা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র উদঘাটন এবং বকেয়া আদায়ের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। প্রকৃত তথ্য সামনে আসার পর ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার আগের ১৫ শতাংশ থেকে একলাফে ২৩ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তার সুযোগ নিয়ে ব্যাংকটি খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়। তবে সম্প্রতি নতুন করে কিছু বড় প্রতিষ্ঠানের ঋণ নতুন করে খেলাপি হয়ে পড়ায় এই স্থিতি আবারও বাড়তে শুরু করেছে।
ব্যাংকের বিগত কয়েক বছরের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ১৩,১৫০ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১৩.৫৭ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুনে তা সামান্য বেড়ে হয় ১৩,৪৯৫ কোটি টাকা বা ১৪.৮১ শতাংশ। তবে জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী তিন মাসে খেলাপি ঋণ প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা বেড়ে সেপ্টেম্বর শেষে দাঁড়ায় ১৬,৫৬৫ কোটি টাকা বা ১৮.২৯ শতাংশে। ওই বছরের ডিসেম্বরে তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে ১৬,৯০৫ কোটি টাকা বা ১৮.৬১ শতাংশে পৌঁছায়।
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) খেলাপি ঋণ ২,১৮৬ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯,০৯১ কোটি টাকা বা ২১.১১ শতাংশে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে ১৯,৮১৭ কোটি টাকা হয়। তৃতীয় প্রান্তিক অর্থাৎ সেপ্টেম্বর শেষে এই স্থিতি দাঁড়ায় ২০,৫৯৯ কোটি টাকা বা ২২.৯৯ শতাংশে। তবে ওই বছরের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। এ সময় ৩,৯৮৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ কমিয়ে স্থিতি ১৬,৬১৪ কোটি টাকা বা ১৫.৮৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।
হ্রাস পাওয়ার এই ধারা চলতি বছরের প্রথম দুই প্রান্তিকেও বজায় ছিল। বছরের প্রথম প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমে দাঁড়ায় ১৬,২৪২ কোটি টাকা বা ১৭.৮৫ শতাংশে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা আরও কমে ১৫,৭১০ কোটি টাকা বা ১৮.২৭ শতাংশে নেমে আসে। তবে এই ধারাবাহিকতা ভেঙে আগস্ট শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আবার বেড়ে ১৮,১৭০ কোটি টাকা বা ১৮.৭২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
সোনালী ব্যাংকের একজন নীতি-নির্ধারক পর্যায়ের কর্মকর্তা জানান, খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের যে বিশেষ নীতি সহায়তা দিয়েছিল, তার সুবাদে অনেক ঋণ নিয়মিত করা সম্ভব হয়েছিল। এর ফলেই খেলাপি ঋণ কমেছিল। তবে বর্তমানে কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক মন্দার কারণে নতুন কিছু ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক স্থিতিতে। নীতি সহায়তা পাওয়া ঋণগুলো পুনরায় খেলাপি হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, নীতি সহায়তাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড পাওয়ায় তাদের কিস্তি দেওয়ার সময় এখনও শুরু হয়নি। ফলে সেগুলো এখনই খেলাপি হওয়ার সুযোগ নেই। ব্যাংকটি চলতি বছর শেষে খেলাপি ঋণের হার ১২ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, গত বছর সোনালী ব্যাংক ছয়টি বড় প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২,০০০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনর্গঠন করেছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটি ছিল বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি (বেক্সিমকো) লিমিটেডের, যার পুনর্গঠিত ঋণের পরিমাণ ১,৪২৪ কোটি টাকা। এছাড়া মডার্ন স্টিল মিলস লিমিটেডের ৫৫ কোটি টাকার প্রকল্প ঋণ ও ২৮৯ কোটি টাকার ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ঋণ পুনর্গঠন করা হয়। এই তালিকায় আরও রয়েছে জাহানারা কটন টেক্স লিমিটেডের ৮৭ কোটি টাকা, ভার্টেক্স পেপারের ৬৬ কোটি টাকা এবং জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের ৮৬ কোটি টাকার ঋণ।





























