মিম্বরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা কি শুধুই রাজনীতি?
- আপডেট সময় : ১১:১২:০৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০: ৫০
সমাজে অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি কিংবা মানুষের অধিকার নিয়ে কোনো আলেম কথা বললেই কখনো কখনো ‘হুজুর, রাজনৈতিক আলোচনা করবেন না’ বলে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য কথা বলা কি আসলেই রাজনীতি? ইসলাম কেবল নামাজ, রোজা ও ব্যক্তিগত ইবাদতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; তবে মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনকে ন্যায়বিচার, আমানতদারি ও মানবিকতার ভিত্তিতে গড়ে তোলার নির্দেশ দেয়। পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নাহলের ৯০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ এবং অশ্লীলতা ও সীমালঙ্ঘন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন, যা ব্যক্তিজীবন ছাড়িয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য।
কোরআনের সুরা আলে ইমরানের ১০৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, এমন একটি দল থাকা উচিত যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে এবং সৎকাজের নির্দেশ দিয়ে অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। এই দায়িত্বই হলো ‘আরব বিল মারুফ’ ও ‘নাহি আনিল মুনকার’। সমাজে প্রকাশ্য অন্যায় দেখেও একজন মানুষ সম্পূর্ণ নীরব থাকতে পারে না; বরং মানুষকে সত্যের পথে আহ্বান করাই তার প্রধান দায়িত্ব। মাদক, ঘুস, দুর্নীতি, জুলুম, প্রতারণা, সন্ত্রাস ও নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে সতর্ক করাকে যদি কেবল ‘রাজনীতি’ বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়, তবে ইসলামের সামাজিক নৈতিকতার শিক্ষা বাস্তবায়ন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। আলেমদের এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার উদ্দেশ্য দলীয় রাজনীতি নয়, বরং সমাজকে কলুষমুক্ত করা।
অন্যায় প্রতিহতের গুরুত্ব তুলে ধরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ কোনো অন্যায় দেখলে সে যেন হাত দিয়ে তা প্রতিহত করে; তা সম্ভব না হলে মুখ দিয়ে; তাও সম্ভব না হলে অন্তর দিয়ে যেন ঘৃণা করে (সহিহ মুসলিম)। অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ঈমানের অন্যতম দাবি হলেও এই দায়িত্ব পালনে প্রজ্ঞা, সামর্থ্য, পরিস্থিতি ও শরিয়তের নীতিমালা বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি। তবে মিম্বরের স্বাধীনতার অর্থ এই নয় যে সেখানে মিথ্যা, অপবাদ, গুজব, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা দলীয় উসকানি দেওয়া যাবে। আলেমের বক্তব্য হতে হবে সত্যনিষ্ঠ, শালীন, প্রমাণনির্ভর এবং কোরআন-সুন্নাহসম্মত। কোনো দলকে অন্ধ সমর্থন করা যেমন ইসলামের শিক্ষা নয়, তেমনি কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সত্যকে আড়াল করাও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নিসার ১৩৫ নম্বর আয়াতে ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকার এবং নিজের বা পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে হলেও আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সুরা আল-মায়িদার ৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন মানুষকে ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে। দুর্নীতির কারণে সর্বস্ব হারানো বাবার দীর্ঘশ্বাস কিংবা মাদকাসক্ত সন্তানের জন্য মায়ের কান্না কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়। তাই কোরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট নির্দেশের ভিত্তিতে কোনো আলেম সত্য কথা বললে সেটিকে ‘রাজনীতি’ তকমা দিয়ে থামিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
কোরআন-সুন্নাহর প্রমাণিত নির্দেশকে জেনেবুঝে প্রত্যাখ্যান করা বা তার বিরোধিতা করা অত্যন্ত ভয়াবহ। সুরা আন-নুরের ৬৩ নম্বর আয়াতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, যারা রাসুলের আদেশের বিরোধিতা করে, তাদের ওপর বিপর্যয় বা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আপতিত হতে পারে। মিম্বর কোনো political দলের প্রচারণার মঞ্চ নয়, আবার সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো স্থানও নয়। এটি হলো সত্য, ন্যায়, তাকওয়া ও কল্যাণের আহ্বানের জায়গা, যেখানে ক্ষমতাবান ও সাধারণ সবার জন্য একই ন্যায়ের বার্তা উচ্চারিত হওয়া উচিত। মিম্বরের কণ্ঠ সাময়িকভাবে থামানো গেলেও সত্যের কণ্ঠ থামানো অসম্ভব। সত্যের মিম্বরে কোনো দলের পতাকা থাকে না, সেখানে থাকে আল্লাহর ভয় ও মানুষের কল্যাণের বার্তা।
যশোর ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক এই নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, কোরআন-সুন্নাহর সত্য কথা বলা কোনো বক্তাকে থামানো কেবল একটি কণ্ঠকে স্তব্ধ করা নয়, বরং তা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশিত সত্যের সরাসরি বিরোধিতার শামিল, যার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ।



























