যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় লাফ, ইউরোপে বড় পতন
- আপডেট সময় : ০৩:৪৩:২৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ের প্রধান দুই বাজারে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই একক দেশ হিসেবে দেশের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি ও উল্লম্ফন ঘটলেও, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২৭ দেশের জোটে বড় ধরনের পতন হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সাম্প্রতিক তথ্য পর্যালোচনায় এই বৈপরীত্য লক্ষ্য করা গেছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১১.৪২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৬১ কোটি ২৯ লাখ ডলারে (১.৬১ বিলিয়ন) পৌঁছেছে। এর মধ্যে কেবল আগস্ট মাসেই রপ্তানি বেড়েছে ২৫.৬৫ শতাংশ, যা একক মাস হিসেবে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। এই আগস্টে দেশটিতে ৮১৭ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই মাসে ছিল ৬৫০.৩৪ মিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানির মাসিক গড় দাঁড়িয়েছে ৮০৬.৪৬ মিলিয়ন ডলার, যেখানে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মাসিক গড় ছিল ৬৪৫.৩৮ মিলিয়ন ডলার।
গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৯.০৪ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে তৈরি পোশাক থেকে এসেছে ৭.৭৪ বিলিয়ন ডলার এবং বাকি ১.৩০ বিলিয়ন ডলার এসেছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক ও মেলামাইন পণ্য, টেক্সটাইল ও সুতা, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল পণ্য ও জুতার মতো অন্যান্য পণ্য থেকে। পোশাক রপ্তানির এই ইতিবাচক ধারা সম্পর্কে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক জানান, শীতকালীন পোশাকের ক্রয়াদেশের শেষ সময় হওয়ায় আগস্টে রপ্তানি বেড়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও উদ্যোক্তাদের অন্তর্নিহিত সক্ষমতার কারণে এটি সম্ভব হয়েছে।
বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি ও ফতুল্লা অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামীম এহসান বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে তৈরি হওয়া সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন দেশের উদ্যোক্তারা। তবে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সরকারের নীতি-ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গেলে এই সুযোগ আরও ভালোভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে। বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মহিউদ্দিন রুবেল আশা প্রকাশ করেন, এই গতি অব্যাহত থাকলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের পোশাকের বৃহত্তম বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রথম সাত মাসে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১৩.৬৫ শতাংশ কমে ১ হাজার ৩৭ কোটি ২৮ লাখ ইউরোতে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ২০১ কোটি ২১ লাখ ইউরো। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ইইউতে পোশাক রপ্তানি কমার এই হার অন্য সব প্রতিযোগী দেশের চেয়ে বেশি। এই সময়ে তুরস্কের রপ্তানি ১৩.৩২ শতাংশ, ভারতের ১২.২৪ শতাংশ, পাকিস্তানের ১১.৮১ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ৬.৬৯ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে ভিয়েতনামের ৩.৯২ শতাংশ (২৫৫ কোটি ১৮ লাখ ইউরো) এবং চীনের ১.৮৯ শতাংশ রপ্তানি বেড়েছে।
সামগ্রিকভাবে ইইউর ক্রেতারা বিভিন্ন দেশ থেকে পোশাক আমদানি ৫.১০ শতাংশ কমিয়ে ৫ হাজার ১৬১ কোটি ৩৭ লাখ ইউরোতে নামিয়ে এনেছে। তবে বাংলাদেশ থেকে তাদের কেনাকাটা কমার হার গড় হ্রাসের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের অভাব, উচ্চ উৎপাদন খরচ এবং বৈশ্বিক মন্দার কারণে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। এছাড়া ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর বাজার অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় ইউরোপে বাংলাদেশের অবস্থান কিছুটা দুর্বল হয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে।
প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে চীন, বাংলাদেশ, তুরস্ক, ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ৫ হাজার ১৬১ কোটি ৩৭ লাখ ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে ইইউয়ের বিভিন্ন ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। এই আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ১০ শতাংশ কম।বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক; মোট রপ্তানির আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে।


























