সংখ্যায় সচল হলেও মৌলিক সংস্কারে থমকে আছে ত্রয়োদশ সংসদ
- আপডেট সময় : ১১:০৬:০২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন গত ২৭ আগস্ট শুরু হয়ে ১০ সেপ্টেম্বর সমাপ্ত হয়েছে। সংক্ষিপ্ত এই অধিবেশনে মোট ছয়টি বিল উত্থাপন ও পাস করা হয়। আইনপ্রণয়ন, প্রশ্নোত্তর, সংসদীয় কমিটি গঠন, জরুরি জনস্বার্থের নোটিস ও রাজনৈতিক বিতর্কের মতো বিষয়গুলোতে সংসদকে সংখ্যার হিসাবে বেশ সক্রিয় দেখা গেছে। তবে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫, গণভোটে দেওয়া জনগণের রায় এবং ক্ষমতাসীন দল বিএনপির বহুল আলোচিত ৩১ দফার আলোকে মূল্যায়ন করলে রাষ্ট্রসংস্কারের মৌলিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এখনো দৃশ্যমান রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
অধিবেশন শেষে প্রকাশিত সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর উত্তরদানের জন্য ১৪৪টি এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য ২ হাজার ৬৭৬টি প্রশ্ন জমা পড়েছিল। এই ২ হাজার ৮২০টি প্রশ্নের মধ্যে সরাসরি উত্তর দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৬৯৩টির এবং বাকিগুলোর উত্তর টেবিলে উত্থাপন করা হয়। সরাসরি উত্তর পাওয়া প্রশ্নের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী জবাব দিয়েছেন ১৫টির এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা উত্তর দিয়েছেন ১ হাজার ৬৭৮টির। যদিও এই পরিসংখ্যান সংসদীয় জবাবদিহির ক্ষেত্রে ইতিবাচক সূচনা নির্দেশ করে, তবে প্রধানমন্ত্রীর জন্য জমা পড়া ১৪৪টি প্রশ্নের বিপরীতে সরাসরি মাত্র ১৫টি উত্তর আসায় সরকারপ্রধানের প্রত্যক্ষ জবাবদিহির পরিধি আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সংসদীয় নোটিসের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা গেছে। কার্যপ্রণালি-বিধির ৬৮ বিধিতে পাওয়া সাতটি নোটিসের মধ্যে দুটি গ্রহণ করে আলোচনা করা হয়। ৭১ বিধিতে ১৫টি নোটিস গ্রহণ করে ১৪টির ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ৭১(ক) বিধিতে দুই মিনিটের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের জন্য ১২৪টি নোটিস পাওয়া যায়। ১৪৭ বিধিতে পাওয়া দুটি নোটিসের মধ্যে একটির ওপর আলোচনা হয় এবং ৩০২ বিধিতে একটি নোটিস উত্থাপিত হয়। তবে জনস্বার্থের গুরুতর সমস্যাগুলোকে দুই মিনিটের বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রবণতা এবং গুরুত্বপূর্ণ নোটিসগুলো আলোচনার জন্য কম গ্রহণ করার বিষয়টি সংসদের গভীর ও ফলপ্রসূ আলোচনার সুযোগকে সংকুচিত করে তোলে।
অধিবেশনে দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, সৌরবিদ্যুৎ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিদেশের কারাগারে বন্দি বাংলাদেশিদের অবস্থা, বিডিআর বিদ্রোহ-সংশ্লিষ্ট বন্দি, শ্রমশক্তি, সার সরবরাহ, ডেঙ্গু পরিস্থিতি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের অডিট আপত্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উঠে এসেছে। পাশাপাশি সম্পত্তি হস্তান্তর, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং র্যাবের পরিবর্তে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন গঠনসংশ্লিষ্ট আইনগুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তবে মানবাধিকার ও গুমের বিরুদ্ধে আইনপ্রণয়ন ইতিবাচক হলেও, কমান্ড কাঠামো, বলপ্রয়োগের সীমা ও নাগরিক নজরদারি নিশ্চিত না করে কেবল কোনো বাহিনীর নাম পরিবর্তনকে প্রকৃত সংস্কার বলা যায় না।
আইনপ্রণয়নের পাশাপাশি এই অধিবেশনে ৩৫টি সংসদীয় কমিটি এবং একটি বিশেষ কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে কমিটিগুলোই নির্বাহী বিভাগের ব্যয় ও নীতি পরীক্ষা করার প্রধান ক্ষেত্র। কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদের অন্যতম মূল চেতনা ছিল সংসদকে নির্বাহী বিভাগের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান থেকে কার্যকর তদারকি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। এই সনদ অনুযায়ী সরকারি হিসাব, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও অনুমিত হিসাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ তদারকি কমিটির সভাপতিত্ব বিরোধী দলের সদস্যদের দেওয়ার অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু গঠিত কমিটিগুলোর চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিরোধী দলকে আনুপাতিক সদস্যপদ ও অর্থবহ সভাপতির পদ দেওয়ার সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেনি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া নিয়ে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দেন। এই গণরায় কার্যকর করার দায়িত্ব বর্তমান সংসদের ওপর বর্তালেও সরকারের পক্ষ থেকে এক ধরনের নীরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি 'সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন' করে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার কথা ছিল। কিন্তু সংসদে গঠন করা হয়েছে 'সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি'। এই নাম পরিবর্তনের ফলে গণরায়ের পরিধি সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনীতিরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হয়।
এখানেই সরকারি দল বিএনপির নিজস্ব ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের সাথে বর্তমান সরকারের আচরণের বড় অমিল প্রকাশ পায়। বিরোধী দলে থাকাকালে বিএনপি সংবিধান সংস্কার কমিশন, ক্ষমতার ভারসাম্য, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা, ন্যায়পাল, বিচার বিভাগীয় কমিশন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষ পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর একটি যথাযথ সংবিধান সংস্কার পরিষদের পরিবর্তে সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে সীমাবদ্ধ থাকা সেই অঙ্গীকার পূরণের প্রমাণ দেয় না। ন্যায়পাল নিয়োগ বা গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের আগে সংসদীয় শুনানির মতো প্রতিশ্রুত সংস্কারগুলোর অগ্রগতিও এখনো সীমিত।
অধিবেশনে বিরোধী দলের ভূমিকা দেখা গেলেও তা এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। সংবিধান সংস্কার পরিষদের পরিবর্তে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রতিবাদে প্রথম দিনই বিরোধী দলের ওয়াকআউট একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা ছিল। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা, জনজীবনের সংকট এবং ভারতের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়ে কথা বলেছেন। তবে শুধু বক্তব্য ও ওয়াকআউটেই সীমাবদ্ধ না থেকে বিরোধী দলের উচিত প্রতিটি অঙ্গীকারের অগ্রগতি নিয়ে ছায়া প্রতিবেদন, বিকল্প সাংবিধানিক খসড়া এবং বেসরকারি সদস্য বিল উত্থাপন করা। নতুন সংসদের প্রকৃত পরীক্ষা কেবল বিল পাস বা কমিটি গঠনে নয়, বরং ক্ষমতাসীন দল নিজের ক্ষমতা সীমিত করতে এবং বিরোধী দলকে কার্যকর তদারকির সুযোগ দিতে কতটা প্রস্তুত, তার ওপরই নির্ভর করছে।



























