শাহজালাল বিমানবন্দর ব্যবহার করে তিন দেশের মাফিয়াদের সোনা চোরাচালান চক্র
- আপডেট সময় : ০১:৫৮:২১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক সোনা চোরাচালানের একটি শক্তিশালী ও ভয়ঙ্কর নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আকাশপথে আসা সোনার চালান ঢাকার মাটিতে নামার পর অত্যন্ত সুকৌশলে সড়কপথে সীমান্ত পেরিয়ে চলে যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অনুসন্ধানে এই আন্তর্জাতিক চক্রের চাঞ্চল্যকর ছক ও নেপথ্যের গডফাদারদের নাম উন্মোচিত হয়েছে। জানা গেছে, দুবাই, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবে অবস্থানকারী প্রায় অর্ধশত প্রভাবশালী মাফিয়া ডন এই পুরো সিন্ডিকেটের কলকাঠি নাড়ছে।
তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, এই চক্রের কার্যক্রম কোনো করপোরেট চেইনের মতোই সুসংগঠিত। চোরাচালানের মূল অর্থায়ন, পরিকল্পনা ও সোনার জোগান আসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, মালয়েশিয়া এবং সৌদি আরব থেকে। এই তিন দেশে অবস্থানরত শীর্ষ মাফিয়ারা এবং তাদের শতাধিক দেশীয় এজেন্টই মূলত এই চোরাচালানের প্রধান হোতা। ভারতে চোরাই সোনার বাজার অত্যন্ত লাভজনক হওয়ায় সেই চাহিদাকে পুঁজি করে এই তিন দেশের প্রায় ৫০ জন গডফাদার একজোট হয়ে শাহজালাল বিমানবন্দরকে তাদের প্রধান ‘ট্রানজিট হাব’ হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা সেখানে বিভিন্ন জুয়েলারি ব্যবসার আড়ালে এই অবৈধ কারবারের অর্থ জোগান দেয়।
সম্প্রতি বিমানবন্দর থানা ও এপিবিএনের বিশেষ অভিযানে এই সিন্ডিকেটের অত্যন্ত সক্রিয় তিন সদস্য নাসির মোল্লা (৪০), সোহাগ শেখ (২৪) এবং হাছান মিয়া (২৩) বিপুল পরিমাণ সোনাসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছে যে, তারা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক এই মাফিয়া চক্রের দেশীয় ক্যারিয়ার ও রিসিভার হিসেবে কাজ করে আসছিল। গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, বিমানবন্দরের ভেতরের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া এই বিশাল নেটওয়ার্ক সচল রাখা অসম্ভব। সিভিল এভিয়েশন, কাস্টমস, বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং স্টাফ এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের একটি অসাধু অংশ এই চক্রের বেতনভুক্ত এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। কড়া নজরদারির মধ্যেও কোন দিক দিয়ে সোনা পার করতে হবে এবং সিসিটিভি ক্যামেরার চোখ কীভাবে ফাঁকি দিতে হবে, তা এই ভেতরের লোকেরাই ঠিক করে দেয়। ফলে বাহকরা অনায়াসেই সোনার চালান বিমান থেকে নামিয়ে বাইরে নিয়ে আসতে পারে।
পুলিশের তালিকায় থাকা বিদেশে অবস্থানকারী মাফিয়াদের মধ্যে অন্যতম হলেন মালয়েশিয়ায় অবস্থানকারী নরসিংদীর আনোয়ার, শরীয়তপুরের হান্নান শিকদার ও মুন্সিগঞ্জের জুমন এবং সৌদি আরবে অবস্থানকারী কুমিল্লার সাইফুল। এছাড়া দুবাইয়ে অবস্থানকারী শওকত, মোস্তফা, নোমান ও নজরুলের নামও রয়েছে তালিকায়। বিদেশে অবস্থানকারী এই অর্ধশত মাফিয়া নিজ নিজ এলাকায় আলাদা চক্র গড়ে তুলে সোনা চোরাচালান করছেন। তারা এই সোনা বিভিন্ন জুয়েলারির দোকানে বিক্রি করার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশে পাচার করছেন।
শাহজালাল বিমানবন্দর থানায় গত পাঁচ বছরে সোনা চোরাচালানের অপরাধে ৫৫০টি মামলা হয়েছে, যেখানে মোট ৪৯০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ২০২১ সালে করোনা মহামারির স্থবিরতা কেটে বিমান চলাচল শুরু হতেই রেকর্ড ১১৪টি মামলা হয়। ২০২২ সালে চোরাকারবারিদের তৎপরতা ছিল সবচেয়ে বেশি, যার ফলে সর্বোচ্চ ১৩৫টি মামলা দায়ের হয়। ২০২৩ সালে নজরদারি কিছুটা বাড়লেও চক্রের দৌরাত্ম্য থামেনি, মামলা হয় ১১২টি। ২০২৪ সালে কড়াকড়ির কারণে মামলার সংখ্যা কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৮৪টিতে। তবে ২০২৫-২৬ সালে সিন্ডিকেটের নতুন কৌশলের কারণে অপরাধের গ্রাফ আবারো ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে এবং ইতিমধ্যে এই চলতি মেয়াদে ৯২টি মামলা হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৫ বছরে মামলা হয়েছে ৫৫০টি, কিন্তু আসামি মাত্র ৪৯০ জন। সাধারণ নিয়মে মামলার চেয়ে আসামির সংখ্যা বেশি হওয়ার কথা থাকলেও এখানে চিত্রটি উল্টো।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাস্টমস বা এপিবিএন যখন বিমানের টয়লেট, সিটের নিচ বা পরিত্যক্ত ব্যাগ থেকে সোনা উদ্ধার করে, তখন সুনির্দিষ্ট কোনো অপরাধীকে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা যায় না। ফলে মামলায় কোনো ব্যক্তির নাম না দিয়ে অজ্ঞাতনামা আসামি বা শুধু মালামাল জব্দের খতিয়ান দেখানো হয়। এর ফলে মূল অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। এছাড়া দুবাই, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবের এই সিন্ডিকেটগুলো নতুন বাহক নিয়োগের চেয়ে পুরনো ও বিশ্বস্ত ‘ক্যারিয়ার’দের বারবার ব্যবহার করে। একজন বাহক কয়েকবার সফল হওয়ার পর ধরা পড়লে কেবল তারই নাম মামলায় ওঠে। এর ফলে মামলার সংখ্যা বাড়লেও নতুন নতুন আসামির সংখ্যা বাড়ে না। তদন্ত সংস্থাগুলো এই বাহকদের গ্রেপ্তারেই সন্তুষ্ট থাকায় তিন দেশে বসা মূল মাফিয়ারা সব সময়ই পর্দার আড়ালে থেকে যায়।
কাস্টমসের সূত্র অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে শতাধিক অভিযানে প্রায় ২ হাজার কেজি সোনা জব্দ করা হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬৯৭ কেজি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৫৪ কেজি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪১৭ কেজি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬৮ কেজি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭৮ কেজির কিছু বেশি সোনা জব্দ হয়েছে। একই সময়ে বৈধভাবে আমদানি করা সোনার বার ও অলংকার থেকে ২ হাজার ৩৮ কোটি টাকা শুল্ক-কর আদায় হয়েছে। অর্থাৎ বৈধ পথে সোনা আমদানির বিপরীতে বিপুল রাজস্ব আদায় হলেও অবৈধ পথে আসা সোনার প্রবাহ থামানো যাচ্ছে না。
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে আসার পর বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে জব্দ করা সোনা নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা হয়। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে প্রায় ২ হাজার ৯৩০ কেজি সোনা জমে আছে। এর মধ্যে মামলার আলামত হিসেবে থাকা সোনার বারের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ১১১ কেজি এবং স্বর্ণালংকার রয়েছে প্রায় ৮১৯ কেজি। বিপুল পরিমাণ সোনা বছরের পর বছর আইনি প্রক্রিয়ায় আটকে থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে কার্যত এগুলো জমা হয়ে পড়ে আছে।



























