পথঘাট পরিচ্ছন্ন রাখা ঈমানের দাবি ও সদকার সওয়াব
- আপডেট সময় : ০৯:২৭:১৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

পৃথিবীতে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম অপরিহার্য একটি বিষয় হলো রাস্তা বা পথ। ঘর থেকে বের হওয়া, যাতায়াত এবং বিভিন্ন পার্থিব প্রয়োজনে মানুষকে প্রতিনিয়ত রাস্তা ব্যবহার করতে হয়। মানুষের চলাচলের এই পথকে নিরাপদ, নির্বিঘ্ন ও নিষ্কণ্টক রাখার জন্য ইসলামে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। মূলত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মানুষের একটি স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য, যা সুস্থ মনন ও উন্নত রুচিবোধের পরিচয় বহন করে। পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে দেহ ও মন যেমন সুস্থ থাকে, তেমনি মহান আল্লাহও বান্দার ওপর সন্তুষ্ট হন। এজন্য ইসলামে ঘরবাড়ি ও আঙিনা পরিষ্কার রাখার ওপর বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে, যাতে নিজের ঘরের ময়লা-আবর্জনার কারণে কোনো প্রতিবেশী বা পথচারী কষ্টের শিকার না হন।
তবে বাস্তব চিত্র অত্যন্ত দুঃখজনক। আমাদের সমাজের একটা বড় অংশ রাস্তাঘাট পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারে চরম উদাসীনতা দেখায়। মানুষ যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলতে দ্বিধাবোধ করে না। রাস্তায় কলা বা আমের খোসা ফেলা, গাছের গুঁড়ি রাখা, টায়ার জ্বালানো, অহেতুক রাস্তা বন্ধ করা বা কেটে রাখা এখন নিত্যদিনের চিত্র। এছাড়া দোকান, হোটেল বা গ্যারেজ পরিষ্কারের ময়লা পানি ও রিজার্ভ ট্যাঙ্কের নোংরা পানি রাস্তায় ঢেলে দেওয়া, রড, ইট, বালু, সুরকি ও পাথরের মতো নির্মাণসামগ্রী রাস্তার ওপর স্তূপ করে রাখা, ঘরের ধুলাবালি ও উচ্ছিষ্ট খাবার ফেলা, সিগারেটের প্যাকেট ও পানের পিক ফেলা এবং ছাদ থেকে পানি নিষ্কাশনের পাইপ সরাসরি রাস্তায় নামিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষিত করা হচ্ছে। এর ফলে রোগ-জীবাণু ছড়ানোর পাশাপাশি তীব্র দুর্গন্ধের সৃষ্টি হচ্ছে।
শহর ও গ্রামীণ রাস্তার পাশে ডাস্টবিন থাকলেও অনেক সময় তা যথাসময়ে পরিষ্কার করা হয় না। এর ওপর আবার অনেক নগরবাসীকে রাস্তার পাশে বা ফুটপাতে মলমূত্র ত্যাগ করতে দেখা যায়। ড্রেন বেয়ে এই নোংরা পানি রাস্তায় চলে আসে, যা পথচারীদের দুর্ভোগ চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। সামান্য বৃষ্টি হলেই সড়কদ্বীপের নালায় জমে থাকা প্রস্রাবের উৎকট দুর্গন্ধে সাধারণ মানুষের হাঁটাচলা অসম্ভব হয়ে পড়ে। পথের ধারে বা ফুটপাতে এভাবে মলমূত্র ত্যাগ করা যেমন লজ্জাহীনতা ও অসভ্যতার বহিঃপ্রকাশ, তেমনি ধর্মীয় দৃষ্টিতেও এটি কবিরা গোনাহ বা বড় পাপ।
ইসলামের দৃষ্টিতে পরিচ্ছন্নতা কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং এটি ঈমানের অন্যতম শাখা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঈমানের সত্তরোর্ধ্ব কিংবা ষাটোর্ধ্ব শাখা রয়েছে। এর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম শাখা হচ্ছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা আর সবচেয়ে সাধারণ শাখা হচ্ছে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া।’ (বোখারি: ৯, মুসলিম: ৩৫)। অর্থাৎ ঈমানের ন্যূনতম দাবি হলো চলার পথকে নিরাপদ রাখা। ইমাম নববি (রহ.)-এর মতে, কষ্টদায়ক বস্তু বলতে পাথর, মাটির টুকরো, কাঁটাসহ মানুষের যাতায়াতে বাধা সৃষ্টি করে এমন সবকিছুকেই বোঝায়। চলার পথে পড়ে থাকা পলিথিন, ফলের খোসা কিংবা ভাঙা কাঁচের টুকরোয় পা পিছলে বা কেটে যে কেউ বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে। তাই সাধ্যানুযায়ী এসব ক্ষতিকর জিনিস পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব।
পথের কষ্ট দূর করাকে ইসলামে সদকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যের উপকার করার মাধ্যমে যেভাবে সদকার সওয়াব মেলে, ঠিক তেমনি পথচারীদের জন্য নিরাপদ পথচলা নিশ্চিত করাও এক ধরনের কল্যাণমূলক কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) আবু জর গিফারি (রা.)-কে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘রাস্তা থেকে পাথর, কাঁটা ও হাড্ডি সরানোও তোমার জন্য একটি সদকা।’ (তিরমিজি: ১৯৫৬)।
সামান্য এই আমলটি মানুষের পরকালীন মুক্তির কারণও হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে চলার সময় কাঁটাদার গাছের একটি ডাল দেখতে পেয়ে সেটি অপসারণ করল। আল্লাহ তার এই কাজকে কবুল করে নিলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন।’ (বোখারি: ৬৫২, মুসলিম: ৫০৪৯)। এই হাদিসগুলো প্রমাণ করে যে, রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখা কেবল সরকারের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজ নয়। একজন সচেতন মুসলমান হিসেবে এটি আমাদের ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব। ঈমানের এই ন্যূনতম দাবিটি মেনে চললে আমাদের চারপাশের পরিবেশ যেমন সুন্দর থাকবে, তেমনি পরকালেও মিলবে পরম মুক্তি।
তাই রাসুল (সা.) বলেন, 'পথের কষ্টদায়ক জিনিস সরিয়ে দেয়া সদকা।' (মুসলিম : ১০০৯)। অন্য এক হাদিসে নবীজি (সা.) পথের কষ্টদায়ক কিছু বস্তুর নাম ধরে ধরেও বলেছেন, পথ থেকে এগুলো সরিয়ে দেয়া সদকা। যেমন— রাসুল (সা.) আবু জর গিফারি (রা.)-কে বেশকিছু উপদেশ দেন। সেগুলোর মধ্যে একটি ছিল, 'রাস্তা থেকে পাথর, কাঁটা, হাড্ডি সরানোও তোমার জন্য একটি সদকা।' (তিরমিজি : ১৯৫৬)।


























