অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো ইবাদত: ইসলামের শিক্ষা ও করণীয়
- আপডেট সময় : ০৭:১২:০৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদে মানবেতর জীবন যাপনকারী হাজারো মানুষ নানা দুর্যোগ ও বিপর্যয়ে আক্রান্ত। হতদরিদ্র মানুষগুলো দুঃখে-শোকে, বেদনায়-যন্ত্রনায়, হতাশায়-অস্থিরতায় ব্যথিত মনে দিনযাপন করছে। অসহায় মা নিজের কথা ভুলে জীর্ণ-শীর্ণ কঙ্কালসার ক্ষুধার্ত শিশুর কান্নায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। বার্ধক্যের জরাজীর্ণতায়, ক্ষুধার যন্ত্রণায়, রোগের তীব্রতায় এবং আর্থিক অসচ্ছলতায় ভারাক্রান্ত হৃদয়ে অসংখ্য মানুষ জীবনের চরাই-উতরাই পাড়ি দিচ্ছে। তাদের বিক্ষত মনের বুকফাটা আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। আক্ষেপের বিষয় হলো, মানবিকতার বাণী প্রচারকারী তথাকথিত সুশীল সমাজ তাদের পাশে নেই। দানে-বিসর্জনে এগিয়ে এসে তাদের মলিন চেহারায় হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে না কেউ। অথচ আমাদের আবির্ভাবই হয়েছে মানবতার কল্যাণ সাধনের জন্য। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি। মানবতার কল্যাণে তোমাদের অস্তিত্ব দান করা হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।’ (সুরা আলে ইমরান : ১১০)।
মানবতার চিরকল্যাণকামী বন্ধু প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.) জীবনের পরতে পরতে আমাদের শিখিয়েছেন মানবসেবার আলোকোজ্জল আদর্শ। বঞ্চিত-আক্রান্ত-পীড়িতদের জন্য তার হৃদয়ে প্রোথিত ছিল গভীর মমতা ও পরম সহানুভূতি। বিপদাপদে তিনি মানুষের পাশে দাঁড়াতেন হৃদয়ের ডানা বিছিয়ে। রাসুল (সা.) অহির প্রথম সাক্ষাতে যখন শঙ্কিত হয়ে পড়েন, তখন তার সহধর্মিণী খাদিজাতুল কোবরা (রা.) তাকে সান্ত্বনা দিয়ে সাহস যোগালেন এই বলে যে, ‘আল্লাহতায়ালা আপনাকে কখনও অপমানিত করবেন না। কারণ, আপনি তো আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্প্রীতি বজায় রাখেন, অসহায়দের ভার বহন করেন, অসহায়কে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন, অতিথিকে আপ্যায়ন করেন এবং সত্যের পথে বিপদগ্রস্তদের সহযোগিতা করেন।’ (বোখারি : ৩)।
পার্থিব জীবনে সুখ সব সময় স্থায়ী হয় না। নির্মল হৃদয়াকাশে বিষণ্ণতার কালো মেঘ নেমে আসে, ধনীদের দুয়ার বন্ধ হয়ে যায় এবং স্বার্থপরতার বিষবাষ্পে রক্তের আত্মীয়রাও দূরে সরে যায়। উপকারী বন্ধুর দুর্দিনে অনেকে পাশে দাঁড়ায় না, খবরও নেয় না। অথচ রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ঈমানদারের একটি পার্থিব কষ্ট লাঘব করবে, আল্লাহতায়ালা তার কেয়ামত দিবসের একটি কষ্ট লাঘব করবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবী মানুষকে ছাড় দেবে, আল্লাহতায়ালা ইহ-আল্লাহতায়ালা ইহ-পরকালে তাকে ছাড় দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহতায়ালা দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। আল্লাহ বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।’ (মুসলিম : ২৬৯৯)। তিনি আরও বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা দয়ালুদের ওপর দয়া করেন। যারা জমিনে বসবাস করছে, তাদের প্রতি তোমরা দয়া কর; তাহলে যিনি আকাশে আছেন, তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (তিরমিজি : ১৯২৪)।
মোমিনের প্রতিটি কাজ হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে। ইখলাসশূন্য বা লোক দেখানো আমলের কোনো মূল্য নেই, বরং তা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হতে পারে। বিশুদ্ধ নিয়তের মাধ্যমেই মোমিনের প্রতিটি কাজ ইবাদতে পরিণত হয়। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের বৈশিষ্ট্য হলো, তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে নিঃস্বার্থভাবে মানুষকে সাহায্য করেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা আল্লাহর ভালোবাসায় মিসকিন, এতিম ও বন্দিদের খাবার দান করে। (আর তাদের বলে,) আমরা তো তোমাদের খাওয়াই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। আমরা তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না এবং কৃতজ্ঞতাও নই।’ (সুরা দাহর : ৮-৯)।
মানবসেবার চর্চায় আমরা প্রত্যেকেই ব্যক্তিগত বা ঘরোয়াভাবে একটি সদকা বাক্স রাখতে পারি। এতে প্রতিদিন সাধ্যমতো খুচরা বা নোট রাখা হবে। পরিবারের সব সদস্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে এতে অংশ নিতে পারবে, যা শিশুদের ছোটবেলা থেকেই দানের প্রতি উৎসাহিত করবে এবং মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন পরোপকারী হিসেবে গড়ে তুলবে। মাস শেষে এই টাকা গরিব-দুঃখীদের মাঝে বিতরণ করলে তাদের মনের গভীর দুঃখবোধের প্লাবন বন্ধ হতে পারে। দাতার জন্য আনন্দের আতিশয্যে হৃদয়ের গভীর থেকে নির্গত দোয়া সরাসরি আরশে আজিমে কড়া নাড়বে। বস্তুত আমাদের কাছে যা জমা থাকবে, তা এক সময় নিঃশেষ হয়ে যাবে; আর আল্লাহর কাছে যা পাঠিয়ে দেব, তা পরকালীন সঞ্চয় হিসেবে জমা থাকবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমাদের কাছে যা কিছু আছে, তা নিঃশেষ হয়ে যাবে; আর আল্লাহর কাছে যা আছে, তা স্থায়ী।’ (সুরা নাহল : ৯৬)। তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা যে কোনো সৎকর্ম নিজেদের কল্যাণার্থে সামনে (আখেরাতে) প্রেরণ করবে, আল্লাহর কাছে তা পাবে। নিশ্চয় তোমরা যে কোনো কাজ কর, আল্লাহ তা দেখছেন।’ (সুরা বাকারা : ১১০)।
মানবসেবায় নিয়ত বিশুদ্ধ হতে হবে : মোমিনের প্রতিটি কাজ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে হতে হবে। একনিষ্ঠভাবে তাঁর রেজামন্দি লাভের জন্যই হওয়া জরুরি। ইখলাসশূন্য আমলের কোনো মূল্য নেই তাঁর কাছে। লৌকিকতাপূর্ণ আমল ভঙ্গুর এ পৃথিবীতে অনেক জমকালো দেখা গেলেও পরকালে এর কানাকড়িও দাম নেই। বিশুদ্ধ নিয়তের মাধ্যমেই মোমিনের প্রতিটি কাজ ইবাদতে পরিণত হয়। তাই দান হতে হবে ইখলাসের ভূষণে ভূষিত, বিশুদ্ধ নিয়তের শোভায় শোভিত। অন্যথায় তা হবে অন্তঃসারশূন্য। এমনকি মানুষের বাহ বাহ অর্জন ও লোক দেখানো মনোভাবে কৃত আমল জাহান্নামে যাওয়ার কারণও বটে। (মুসলিম : ৪৮১৭)।





























