৬ মাস ধরে জনসমক্ষে নেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি, বাড়ছে সংশয়
- আপডেট সময় : ০৬:০২:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

যুদ্ধ শুরুর পর ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা সাইয়েদ মুজতবা খামেনির কোনো ছবি, ভিডিও বা সরাসরি অডিও বার্তা প্রকাশ্যে আসেনি। গুরুতর আহত অবস্থায় ক্ষমতা গ্রহণ করা এই নেতার দীর্ঘ অনুপস্থিতি নিয়ে এখন নানা মহলে প্রশ্ন উঠছে। তিনি কি আসলেই সক্রিয়ভাবে দেশ পরিচালনা করছেন, নাকি ইরানের শাসনভার কার্যত অন্যদের হাতে চলে গেছে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
অবশ্য ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, নিরাপত্তার স্বার্থেই মুজতবা খামেনি জনসমক্ষে আসছেন না, তবে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত তিনিই নিচ্ছেন। তাঁর শারীরিক অবস্থারও ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। তবে সরকারের ঘনিষ্ঠ মহলেও তাঁর এই অনুপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ও সন্দেহ দিন দিন বাড়ছে।
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই তাঁর ছেলে মুজতবা খামেনিকে দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। ওই একই হামলায় মুজতবাও গুরুতর আহত হয়েছিলেন। ইরানের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার দাবি, ওই হামলায় তাঁর মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে গেছে।
এরপর থেকে মুজতবাকে আর কখনো জনসমক্ষে দেখা যায়নি। এমনকি গত মাসে তাঁর বাবার জন্য আয়োজিত রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যের বড় অনুষ্ঠানগুলোতেও তিনি উপস্থিত ছিলেন না। তাঁর পক্ষ থেকে জনগণের উদ্দেশ্যে দেওয়া বার্তাগুলো কেবল লিখিত বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, যা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সংবাদ পাঠকেরা পড়ে শুনিয়েছেন。
কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মুজতবার জীবনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই তাঁর বর্তমান অবস্থান কঠোরভাবে গোপন রাখা হচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, তাঁর অবস্থান প্রকাশ পেলে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল পুনরায় তাঁকে নিশানা করে হামলা চালাতে পারে। একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, অত্যন্ত সীমিত সংখ্যক কর্মকর্তা সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারছেন। তবে তিনি নিয়মিত শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনগুলো দেখছেন এবং বড় বড় সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত অনুমোদন দিচ্ছেন।
গত ১০ আগস্ট ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দাবি করেছিলেন, তিনি মুজতবা খামেনির সঙ্গে টানা সাত ঘণ্টা ধরে একটি বৈঠক করেছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রও নিশ্চিত করেছে যে, সর্বোচ্চ নেতার শারীরিক অবস্থার লক্ষণীয় উন্নতি হয়েছে এবং তিনি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সজাগ থেকে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সচল রেখেছেন। অপর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, চলমান যুদ্ধ ও তীব্র চাপের মধ্যেও রাষ্ট্রীয় পরিষেবাগুলো সচল রয়েছে, পররাষ্ট্রনীতিতে ঐক্য বজায় আছে এবং সরকারি সিদ্ধান্তগুলো সুসংগত। এসব বিষয়ই প্রমাণ করে যে শাসনব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ nativity এখনো সর্বোচ্চ নেতার হাতেই রয়েছে।
তবে সরকারি এই আশ্বাসের পরও ইরানের অভ্যন্তরে সন্দেহ ও অবিশ্বাস ক্রমেই দানা বাঁধছে। এমনকি কট্টরপন্থী সমর্থকদের মধ্য থেকেও মুজতবার দৃশ্যমান উপস্থিতির দাবি উঠছে। ধর্মীয় নগরী কোমের বাসিজ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশের নেতৃত্বে মুজতবা খামেনি সশরীরে আছেন—এমন বিশ্বাস সাধারণ মানুষের মধ্যে দৃঢ় করতে অন্তত তাঁর কণ্ঠস্বর শোনা বা কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ প্রয়োজন। তাঁর কোনো ছবিও সামনে না আসায় জনগণের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা ইরানের জাতীয় স্বার্থের জন্য ভালো নয়।
সংস্কারপন্থীদের মধ্যে এই সংশয় আরও বেশি গভীর। তেহরানের ব্যবসায়ী শাহরোখ প্রশ্ন তুলে বলেন, মুজতবা খামেনি যে নিহত হননি, তা আমরা কীভাবে নিশ্চিত হব? তাঁর মতে, সর্বোচ্চ নেতা জীবিত আছেন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত আছেন—এমন কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ না থাকাটা অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও রহস্যজনক।
এদিকে বিগত ছয় মাসের যুদ্ধে ইরান সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হলেও দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো Preschool এখনো ভেঙে পড়েনি। আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ ও যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর হামলা চালানোর মতো সামরিক সক্ষমতা এখনো বজায় রেখেছে তেহরান। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির প্রভাব রাষ্ট্রযন্ত্রে আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মূলত এই বাহিনীই কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে মূল ভূমিকা পালন করছে।
বর্তমানে দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। এই কাঠামোর শীর্ষে রয়েছেন আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডাররা, সাথে আছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের মতো রাজনৈতিক নেতারা। রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা দাবি করেছেন, মুজতবা খামেনি এই শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাঁর কাছ থেকেই আসছে।
এরই মধ্যে অর্থনৈতিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করলে দেশটিতে নতুন করে গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বড় ধরনের বিক্ষোভ দমন করেছিল সরকার, যেখানে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার দাবি রয়েছে। এ অবস্থায় ইরানি শাসকগোষ্ঠীর মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকিয়ে রাখা, সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় যেন নতুন কোনো political অস্থিতিশীলতার জন্ম না দেয় তা নিশ্চিত করা।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক অ্যালেক্স ভাতানকা মনে করেন, মুজতবার এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি কেবল তাঁর বেঁচে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে না, বরং ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব আদৌ কার্যকরভাবে কাজ করছে কি না, সেই বড় প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে আসে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো বড় ধরনের সমঝোতা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সর্বোচ্চ নেতার স্পষ্ট অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতি এমন এক বিপজ্জনক শূন্যতা তৈরি করেছে, যেখানে বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্র নিজেদের মতো করে দাবি করতে পারে যে সর্বোচ্চ নেতা আসলে কী চান।
wars আগে থেকেই মুজতবা খামেনি অনেকটা আড়ালে থেকে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। বাবার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি প্রকাশ্য রাজনীতির চেয়ে নেপথ্যের ভূমিকাকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন। কিন্তু এখন তিনি এমন এক পদে অধিষ্ঠিত, যেখানে সর্বোচ্চ নেতার কণ্ঠ ও উপস্থিতি ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অস্তিত্ব ও আস্থার জন্য অত্যন্ত জরুরি। ফলে যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, মুজতবার এই নীরবতা ইরানের নেতৃত্ব, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে ততই নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গত ১০ আগস্ট দাবি করেন, তিনি মুজতবার সঙ্গে টানা ৭ ঘণ্টা বৈঠক করেছেন।





























