ভোট না দেওয়ার শাস্তি: কলকাতার কলোনিতে এক মাস ধরে পানি বন্ধ
- আপডেট সময় : ০৫:৪৮:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে

ভোট না দেওয়ার ‘শাস্তি’ হিসেবে কলকাতার কাশীপুরের জ্যোতিনগর কলোনির প্রায় সাড়ে তিন হাজার বাসিন্দার পানীয় জলের সংযোগ এক মাস ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে। খাস কলকাতার বুকে এই অমানবিক পরিস্থিতির জন্য স্থানীয় বিজেপি বিধায়কের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার এই মানুষগুলো এখন বাধ্য হয়ে দূষিত গঙ্গার জল ব্যবহার করছেন অথবা গাঁটের কড়ি খরচ করে পুরসভার জলের ট্যাঙ্ক কিনছেন।
কলকাতা পুরনিগমের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত এই কলোনিতে গত ২৭ থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত কেএমসি পাইপলাইন মেরামতির কাজ করেছিল। ২৯ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার পর থেকে হঠাৎই কলোনির পাঁচটি রাস্তার কলের জল পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সময়ে সাময়িকভাবে রাস্তার আলোও নিভিয়ে ফেলা হয়েছিল। যদিও বাতি ফিরলেও শুক্রবার পর্যন্ত কলের জল আর ফেরেনি। স্থানীয় বাসিন্দা আলমগীর বিশ্বাসের অভিযোগ, দিনের পর দিন পুরনিগমে যোগাযোগ করেও কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। বাসিন্দাদের আক্ষেপ, একই রাস্তার ধারে থাকা হিন্দু-প্রধান কলোনিগুলোতে নিয়মিত জল এলেও তাঁরা বঞ্চিতই থেকে গেছেন।
জলের অভাবে এলাকার মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা জাহানারা বিবি জানান, ছোট ছোট বাচ্চারা মুখ ধুতে গিয়ে ঘাটে পিছলে গঙ্গায় পড়ে যাচ্ছে এবং অনেকেই অল্পের জন্য ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। সাঁতার না জানা মানুষগুলোও বাধ্য হয়ে নদীতে নামছেন। সেখ মইনউদ্দিনের মতে, নদীর দূষিত জল ব্যবহারের ফলে শিশুদের জ্বর, মাথাব্যথা ও ত্বকের নানা রোগ দেখা দিচ্ছে। এছাড়া ইসমা খাতুন নামে এক স্কুলছাত্রীর পড়াশোনা ও স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে, যা তার পরীক্ষার মুখে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। বস্তির স্কুলেও জলের কোনো সংযোগ নেই। এমনকি এলাকার মসজিদে জলের অভাবে মানুষজন নমাজের আগে ওজু পর্যন্ত করতে পারছেন না।
প্রায় ছয় দশক ধরে এই কলোনিতে ৫০০টি পরিবার বসবাস করছে। নির্মাণকর্মী বা বোতল গলানোর কারখানায় কাজ করা এই মানুষগুলোর অধিকাংশই মুসলিম, তবে বেশ কিছু হিন্দু পরিবারও আছেন। স্থানীয়ভাবে এটি ‘মোল্লা পাড়া’ বা ‘মুসলিম কলোনি’ নামে পরিচিত। প্রায় ৬০ বছর ধরে এখানে বসবাসকারী সরস্বতী বিশ্বাস বলেন, হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের গরিব মানুষ নানা প্রতিকূলতার মধ্যে একসঙ্গে থাকলেও এমন অসুবিধার মুখে আগে কখনো পড়েননি।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই সংকটের মূলে রয়েছে স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারির মুসলিম বিদ্বেষী মন্তব্য। ভোটে জেতার পর এক জনসভায় তিনি প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, মুসলমানরা তাঁকে ভোট দেননি, তাই আগামী পাঁচ বছর তিনি তাঁদের জন্য কোনো কাজ করবেন না। পাশাপাশি, নির্বাচনের ফল বেরোনোর পর থেকেই এই ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর সুমন সিং এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন বলে দাবি বাসিন্দাদের। শুধুই জলকষ্ট নয়, স্থানীয় বিজেপি কর্মীদের উচ্ছেদের হুমকিতেও দিন কাটছে বস্তিবাসীদের।
বর্তমানে বাধ্য হয়ে ৭০০ টাকা দিয়ে কেএমসি-র গাড়ির পানি কিনছেন গরিব মানুষগুলো। ‘পশ্চিমবঙ্গ বস্তি উন্নয়ন সমিতি’র নেতা অজিত শাসমল বলেন, তিন-চার দিনের ব্যবধানে মাত্র এক ট্যাঙ্ক জল এত মানুষের জন্য যথেষ্ট নয়। তিনি আরও জানান, সরকারি রেজিস্টার্ড কলোনিতে এভাবে জল বন্ধ রাখা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং গণতন্ত্রের লজ্জা। ইতিমধ্যেই প্রশাসনের নানা স্তরে ডেপুটেশন জমা দেওয়া হয়েছে এবং মানবাধিকার কমিশনকেও সমস্যার কথা জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বস্তি উচ্ছেদ রুখতে আইনজীবী শামীম আহমেদের মাধ্যমে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে সমিতি এবং আদালত উচ্ছেদের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ দিয়েছে। ছাদটুকু বাঁচাতে আর তৃষ্ণার জলটুকু ফিরে পেতে এখন কেবল আইনি লড়াই আর প্রশাসনের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন জ্যোতিনগরের অসহায় বাসিন্দারা।





























