মদ পানের পারমিট পেতে এক বছরে হাজারেরও বেশি তরুণীর আবেদন
- আপডেট সময় : ০৬:৫৭:০৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬ ৩৮ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে মাদক গ্রহণের প্রবণতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা পশ্চিমা অপসংস্কৃতির প্রভাব হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় বসবাসকারী নারীদের একটি বড় অংশ গাঁজা, ইয়াবা ও ইলেকট্রিক সিগারেটের মতো মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছেন। এমনকি কিছু বিপথগামী তরুণী নিয়মিত বিভিন্ন বারে গিয়ে মদ্যপান করছেন। চলতি বছরে মদ পানের পারমিট বা লাইসেন্স পাওয়ার জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে (নারকোটিক্স) এক হাজারেরও বেশি তরুণী আবেদন জমা দিয়েছেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত গত ৬ বছরে শুধু সরকারি নিরাময় কেন্দ্রগুলোতেই ৩ হাজার ১০৬ জন নারী মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে সরকারি কেন্দ্রগুলোতে মূলত ছিন্নমূল ও অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের নারীরাই বেশি ভর্তি হন। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের আসক্ত নারীদের বড় অংশই বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন।
বেসরকারি সংস্থা ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন রাজধানীর শ্যামলীতে নারীদের জন্য ৪০ শয্যাবিশিষ্ট একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র পরিচালনা করছে। বর্তমানে সেখানে ৩১ জন নারী চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যাদের মধ্যে ২০ জনই ইয়াবায় আসক্ত। এই চিকিৎসাধীন নারীদের মধ্যে ১২ জন বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ১ জন এমবিবিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসক, ৪ জন গৃহিণী, ২ জন ব্যবসায়ী, ১ জন বেসরকারি চাকরিজীবী এবং ১১ জন বেকার রয়েছেন।
এই নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ২৮ বছর বয়সী এক তরুণী তার মাদকের জগতে জড়িয়ে পড়ার করুণ ইতিহাস তুলে ধরে জানান, একটি ধনাঢ্য পরিবারে জন্ম হলেও বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের পর মাত্র ১৩ বছর বয়সে তার বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। ১৪ বছর বয়সে তিনি সন্তানের মা হন। কিন্তু নিজের চেয়ে তিন গুণ বেশি বয়সী স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় জীবনের প্রতি চরম হতাশা থেকে তিনি মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তিনি আরও জানান, বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল ছেড়ে নতুন বাজার এলাকার সান ফ্লাওয়ার স্কুলে ভর্তির পর সেখানে অনেক স্কুলগামী শিক্ষার্থীকে ইয়াবা সেবন করতে দেখেছেন। তার মতে, পাড়া-মহল্লায় এখন অবাধে মাদক বিক্রি হচ্ছে।
আহ্ছানিয়া মিশনের নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন এমবিবিএস ডিগ্রিধারী ওই নারী চিকিৎসক জানান, কয়েক বছর আগে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন আইসিইউতে থাকার সময় তাকে নিয়মিত ব্যথানাশক ইনজেকশন দেওয়া হতো। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পরও তিনি ওই ব্যথানাশকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে তা মাদকাসক্তিতে রূপ নেয়। তিনি উল্লেখ করেন, অনেক সময় প্রচণ্ড পেশাগত চাপ, পদোন্নতি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার ভয় বা হতাশা থেকে চিকিৎসকদের কেউ কেউ সাময়িকভাবে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়লেও পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হন।
সম্প্রতি তরুণীদের মধ্যে বারে গিয়ে মদ পানের প্রবণতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পারমিট নেওয়ার হারও বেড়েছে। চলতি বছর ৩০ জুন পর্যন্ত প্রায় ৭ শতাধিক তরুণীকে মদ পানের পারমিট দেওয়া হয়েছে এবং আরও কয়েকশ আবেদন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গুলশান, উত্তরা ও তেজগাঁও এলাকায় মদ পানকারী নারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। চলতি বছর গুলশানে ২৮৮ জন, উত্তরায় ২০৭ জন এবং তেজগাঁওয়ে ৬২ জন নারী মদের পারমিট নিয়েছেন। এছাড়া ধানমন্ডি, রমনা, মতিঝিল ও খিলগাঁও এলাকা থেকেও অনেক নারী আবেদন করেছেন। তবে পারমিট নেওয়া নারীদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন বারে পেশাদার 'বার গার্ল' হিসেবে কর্মরত আছেন।
দেশের প্রচলিত আইন অনুসারে মুসলিমদের জন্য মদ পানের লাইসেন্স পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে চিকিৎসকরা যদি কোনো বিশেষ রোগ নিরাময়ের জন্য সীমিত অ্যালকোহল পানের সুপারিশ করেন, তবেই কেবল পারমিট দেওয়া যায়। আইনের এই ফাঁকফোকর এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশে ভুয়া বা নামসর্বস্ব চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ব্যবহার করে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পারমিট ইস্যু করা হচ্ছে।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের নারী মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের পরামর্শক আঞ্জুমান আরা জানান, বর্তমানে শিক্ষিত তরুণীদের মধ্যে, বিশেষ করে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মদ ও ইয়াবা সেবনের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। তাদের কেন্দ্রে ১৭ বছর থেকে শুরু করে ৪৮ বছর বয়সী নারীরাও চিকিৎসার জন্য ভর্তি হচ্ছেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, নারীদের এই মাদকাসক্তি সমাজের জন্য চরম উদ্বেগের। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীরা অসৎ সঙ্গ, ছেলে বন্ধু বা স্বামীর প্ররোচনায় মাদকে আসক্ত হন। এছাড়া পরিবারের বাবা বা বড় ভাই যদি ধূমপান বা মদ্যপান করেন, তবে পরিবারের অন্য সদস্যরাও এতে সহজেই আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।



























