স্বাবলম্বিতায় আসে সুখ ও সফলতা: ইসলাম ও বাস্তবতার আলোকে

- আপডেট সময় : ০৭:২৩:০২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

‘স্ব-অবলম্বন’ থেকে ‘স্বাবলম্বন’ শব্দটি এসেছে। মানুষ যে মাটিতে আছাড় খায়, সেই মাটি আঁকড়ে ধরেই আবার উঠে দাঁড়ায়—এটাই স্বাবলম্বনের সহজ প্রকাশ। একজন স্বাবলম্বী ব্যক্তি অলৌকিক সাহায্যের অলীক কল্পনা না করে নিজের মেধা, যোগ্যতা এবং মহামূল্যবান মস্তিষ্কের ওপর আস্থা রাখেন। তিনি নিজের দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি আশপাশের দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেন। স্বাবলম্বী মানুষ শূন্য থেকে শুরু করলেও ধাপে ধাপে তার কাজ পূর্ণতা পায়। ইসলামে এই আত্মনির্ভরশীলতাকে অত্যন্ত মর্যাদা ও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা কেবল জাগতিক প্রয়োজন নয়, বরং ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ।
জীবনযুদ্ধে সফল হতে হলে স্বাবলম্বিতার কোনো বিকল্প নেই। যারা নিজের বিছানা গোছানো, সময়মতো ঘুম থেকে ওঠা বা নিজের জুতা ঠিক জায়গায় রাখার মতো সাধারণ কাজগুলো অন্যের ওপর ছেড়ে দেয়, তারা আসলে জীবনযুদ্ধে পিছিয়ে থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন স্বাবলম্বিতার সর্বোত্তম আদর্শ। শৈশবে বাবা-মাকে হারিয়ে এতিম হয়েও তিনি মরুভূমিতে মেষ চরানোর মতো পরিশ্রমসাধ্য কাজ বেছে নিয়েছিলেন। তরুণ বয়সে মরুভূমির দীর্ঘপথ, পানির তৃষ্ণা ও যাত্রার কষ্ট সহ্য করেও তিনি বাণিজ্যে সফল হয়েছেন। এমনকি ইসলামের প্রথম মসজিদ নির্মাণের সময়ও তিনি সবার সঙ্গে মাটি কাটার কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন। তার এই নিজের দায়িত্ব নিজে নেওয়ার আগ্রহই তাকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সফল করেছে।
ইসলামে দুনিয়া ও পরকাল—উভয় কল্যাণের দিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সুরা বাকারার ২০১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বান্দাকে দুনিয়া ও পরকালের কল্যাণের দোয়া শিখিয়েছেন। দুনিয়াবি কল্যাণের জন্য সম্পদে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার তাগিদ রয়েছে। সম্পদ খরচের ক্ষেত্রে কৃপণতা যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি প্রাচুর্যের সময় অপচয় করাও নিষেধ। সুরা আরাফের ৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পানাহার কর, কিন্তু অপচয় করো না। আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মহান আল্লাহ মুত্তাকি, আত্মনির্ভরশীল ও লোকালয় থেকে নির্জনে বাসকারী বান্দাকে ভালোবাসেন (মুসলিম: ৭৩২২)।
সন্তানের জন্য কিছু সম্পদ রেখে মৃত্যুবরণ করা উত্তম। সাদ ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, বিদায় হজের বছর তিনি ভয়ানক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে দেখতে যান। তখন সাদ (রা.) তার সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ সদকা করতে চাইলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে এক-তৃতীয়াংশ দান করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘তুমি তোমার সন্তানকে সম্পদশালী রেখে যাওয়া উত্তম এমন অবস্থার চেয়ে যে, তুমি তাদের নিঃস্ব রেখে গেলে। ফলে তারা অন্যের কাছে ভিক্ষা করে’ (বোখারি: ৩৯৩৬)।
সম্পদে স্বাবলম্বী হলে অন্যের হক আদায়, পরিবারের ব্যয়ভার বহন এবং জাকাত, হজ ও মসজিদ নির্মাণের মতো আর্থিক ইবাদত পালন করা সহজ হয়। যে ব্যক্তি পরমুখাপেক্ষিতা থেকে বাঁচতে প্রাণপণ চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকে স্বাবলম্বী করে দেন। হাকিম ইবনে হিজাম (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ওপরের হাত (দাতার হাত) নিচের হাত (গ্রহীতার হাত) থেকে উত্তম। যে ব্যক্তি পবিত্র থাকতে চায়, আল্লাহ তাকে পবিত্র রাখেন এবং যে পরমুখাপেক্ষিতা থেকে বেঁচে থাকতে চায়, আল্লাহ তাকে স্বাবলম্বী করে দেন’ (বোখারি: ১৪২৭)।
কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্বাবলম্বনের ভিত্তি হলো কৃষি। দেশের তিন-চতুর্থাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর, তাই কৃষিকে উপেক্ষা করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অসম্ভব। ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব দূর করতে চাকরির মোহ ত্যাগ করে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে মনোনিবেশ করা জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নকে কাজে লাগিয়ে অনেক শিক্ষিত বেকার আজ স্বাবলম্বী ও প্রতিষ্ঠিত। গ্রামীণ শিক্ষিত যুবকেরা এখন কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের দিকে ঝুঁকছে। তাদের এই অবাধ যোগদান দেশকে ভবিষ্যতে উন্নত দেশের মর্যাদা দিতে পারে।






















