ঢাকা ০৮:১৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সোনারগাঁওয়ে দুই হাসপাতালের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান মির্জাগঞ্জে জামায়াতের গণমিছিল: জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি দক্ষিণখানে চিকিৎসক পিনু হত্যা: জুতার ছাপের সূত্র ধরে স্বামী গ্রেপ্তার সাগর পথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা ও সাইবার প্রতারণায় বাড়ছে মানব পাচার মার্কিন বিনিয়োগ এলে ৮-১০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য নিয়ে চিন্তা থাকবে না সাভার ও কক্সবাজারে নিষিদ্ধ আ.লীগের ১৬ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার কোম্পানীগঞ্জে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে আহত ১০, কার্যালয় ভাঙচুর স্বাবলম্বিতায় আসে সুখ ও সফলতা: ইসলাম ও বাস্তবতার আলোকে আয়নাঘর পরিদর্শনে ট্রাইব্যুনাল: উন্মোচিত হলো রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের ভয়াবহ সব প্রমাণ শুটিংয়ের নাচের মহড়ায় গুরুতর আহত অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানা

আয়নাঘর পরিদর্শনে ট্রাইব্যুনাল: উন্মোচিত হলো রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের ভয়াবহ সব প্রমাণ

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:২২:০৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
print news

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিদের ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের এক ভয়ঙ্কর সাক্ষ্য বেরিয়ে এসেছে। শনিবার ট্রাইব্যুনালের তিন বিচারপতি, প্রসিকিউশন টিম, তদন্ত সংস্থার সদস্য, আসামিপক্ষের আইনজীবী, ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতিনিধি, মানবাধিকারকর্মী এবং গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে এই বিচারিক পরিদর্শন অনুষ্ঠিত হয়। চিফ প্রসিকিউটর জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিধিমালা ও রোম স্ট্যাটিউটের আলোকে পরিচালিত এই পরিদর্শনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ব জুড়ে আলোচিত ‘আয়নাঘর’-এর বাস্তব চিত্র বিচারিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা।

তদন্তের শুরুতে আয়নাঘর উদ্‌ঘাটনে যাওয়া তদন্তকারীরা বিভ্রান্তির মুখে পড়লেও পরে সন্দেহের ভিত্তিতে নতুন করে নির্মিত কয়েকটি দেয়াল ভাঙতেই বেরিয়ে আসে একের পর এক গোপন সেল। যেন ইট-সিমেন্টের দেয়ালের আড়ালে নির্যাতনের ইতিহাস লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। প্রসিকিউশন জানায়, ভবনটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ২৯টি সেল রয়েছে। অনেক কক্ষ এতটাই ছোট যে, সেখানে একজন মানুষ সোজা হয়ে শুয়েও থাকতে পারতেন না।

সরজমিন দেখা যায়, দুই তলার এই আয়নাঘরে দ্বিতীয় তলার সিঁড়ির মুখে ছিল ৭টি অতিসংকীর্ণ সেল। এটি আয়নাঘরে প্রবেশ মুখের ডানপাশের গোপন কক্ষ, যার গড় আয়তন মাত্র ২ ফুট বাই ৪ ফুট। এতটুকু স্থানের মধ্যেই টয়লেট সংযুক্ত ছিল। এই কক্ষগুলো ‘ডেথ সেল’ বা ‘যম সেল’ নামে পরিচিত ছিল। এটি মূল আয়নাঘর থেকে বিচ্ছিন্ন একটি স্থান, যেখানে কেবলমাত্র তাদেরই রাখা হতো যাদের গুম করে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হতো। এ ছাড়া, নিচতলায় ছিল ১০টি ছোট সেল, দ্বিতীয় তলায় আরও ১০টি এবং বন্দির সংখ্যা বেড়ে গেলে করিডোরে কাপড়ের পার্টিশন দিয়ে অস্থায়ী সেল তৈরি করা হতো। এখানে দু’টি তথাকথিত ‘ভিআইপি সেল’-ও ছিল।

স্থাপনাটিতে ৩টি সাউন্ডপ্রুফ জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ ছিল। তদন্তে উঠে এসেছে, সেখানে ঘূর্ণায়মান স্টিলের চেয়ার, বৈদ্যুতিক শক দেয়ার যন্ত্র, ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখার ব্যবস্থা এবং বিশেষ লোহার বেড রাখা ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, বন্দিদের এসব যন্ত্রে বেঁধে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। দেয়ালে টাঙানো থাকতো কাটা হাত, উপড়ে ফেলা চোখ এবং নির্যাতনের বিভৎস সব ছবি। র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার অধীনে পরিচালিত এই টিএফআই সেলের কোডনেম ছিল ‘হাসপাতাল’। বাইরে থেকে এটি সাধারণ সরকারি স্থাপনা মনে হলেও, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এটি বলপূর্বক গুমের অন্যতম প্রধান বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এখান থেকে অনেক ভুক্তভোগীকে দেশের অন্য গোপন বন্দিশালায়ও স্থানান্তর করা হতো।

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক তদন্তে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং ব্যারিস্টার আরমানকে এই সেলে আটকে রাখার তথ্য পাওয়া গেছে। এখন পর্যন্ত বলপূর্বক গুম হওয়া ২৫০ জনেরও বেশি ব্যক্তির কোনো সন্ধান মেলেনি। তিনি বলেন, কাউকে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এখানে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে মানবতাবিরোধী অপরাধ। আমিনুল ইসলাম আরও জানান, শুধু মাঠপর্যায়ের নয়, ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’র আওতায় থাকা ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদেরও বিচারের আওতায় আনা হবে। শনিবার সেনানিবাসের ভেতরে ডিজিএফআইয়ের জিআইসি পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রসিকিউশনের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর বলপূর্বক গুমসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করার জন্য ভবনটির দেয়াল, দরজা, জানালা এবং বিভিন্ন কাঠামো পরিবর্তন বা ধ্বংস করা হয়েছে।

অন্যদিকে, টিএফআই সেল পরিদর্শন শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, ‘আয়নাঘর’ কোনো নির্দিষ্ট স্থান নয়, বরং এটি একটি ধারণা। আইনজীবী মো. তবারক হোসেন ভূঁইয়া বলেন, তারা ‘আয়নাঘর’ নয়, তথাকথিত টিএফআই সেল দেখতে গেছেন এবং টিএফআই একটি কনসেপ্ট, নির্দিষ্ট কোনো কক্ষ নয়। তিনি আরও বলেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের অপরাধী বলা যায় না। অপর আইনজীবী এ বি এম হামিদুর মেজবা বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করতে ব্যর্থ হলেও তা বড়জোর বিভাগীয় অপরাধ হতে পারে, মানবতাবিরোধী অপরাধ নয়। তিনি দাবি করেন, প্রসিকিউশন এখনো আসামিদের সঙ্গে ওই কক্ষগুলোর কোনো সরাসরি যোগসূত্র দেখাতে পারেনি।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin

নিউজটি শেয়ার করুন

আয়নাঘর পরিদর্শনে ট্রাইব্যুনাল: উন্মোচিত হলো রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের ভয়াবহ সব প্রমাণ

আপডেট সময় : ০৭:২২:০৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬
print news

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিদের ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের এক ভয়ঙ্কর সাক্ষ্য বেরিয়ে এসেছে। শনিবার ট্রাইব্যুনালের তিন বিচারপতি, প্রসিকিউশন টিম, তদন্ত সংস্থার সদস্য, আসামিপক্ষের আইনজীবী, ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতিনিধি, মানবাধিকারকর্মী এবং গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে এই বিচারিক পরিদর্শন অনুষ্ঠিত হয়। চিফ প্রসিকিউটর জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিধিমালা ও রোম স্ট্যাটিউটের আলোকে পরিচালিত এই পরিদর্শনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ব জুড়ে আলোচিত ‘আয়নাঘর’-এর বাস্তব চিত্র বিচারিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা।

তদন্তের শুরুতে আয়নাঘর উদ্‌ঘাটনে যাওয়া তদন্তকারীরা বিভ্রান্তির মুখে পড়লেও পরে সন্দেহের ভিত্তিতে নতুন করে নির্মিত কয়েকটি দেয়াল ভাঙতেই বেরিয়ে আসে একের পর এক গোপন সেল। যেন ইট-সিমেন্টের দেয়ালের আড়ালে নির্যাতনের ইতিহাস লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। প্রসিকিউশন জানায়, ভবনটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ২৯টি সেল রয়েছে। অনেক কক্ষ এতটাই ছোট যে, সেখানে একজন মানুষ সোজা হয়ে শুয়েও থাকতে পারতেন না।

সরজমিন দেখা যায়, দুই তলার এই আয়নাঘরে দ্বিতীয় তলার সিঁড়ির মুখে ছিল ৭টি অতিসংকীর্ণ সেল। এটি আয়নাঘরে প্রবেশ মুখের ডানপাশের গোপন কক্ষ, যার গড় আয়তন মাত্র ২ ফুট বাই ৪ ফুট। এতটুকু স্থানের মধ্যেই টয়লেট সংযুক্ত ছিল। এই কক্ষগুলো ‘ডেথ সেল’ বা ‘যম সেল’ নামে পরিচিত ছিল। এটি মূল আয়নাঘর থেকে বিচ্ছিন্ন একটি স্থান, যেখানে কেবলমাত্র তাদেরই রাখা হতো যাদের গুম করে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হতো। এ ছাড়া, নিচতলায় ছিল ১০টি ছোট সেল, দ্বিতীয় তলায় আরও ১০টি এবং বন্দির সংখ্যা বেড়ে গেলে করিডোরে কাপড়ের পার্টিশন দিয়ে অস্থায়ী সেল তৈরি করা হতো। এখানে দু’টি তথাকথিত ‘ভিআইপি সেল’-ও ছিল।

স্থাপনাটিতে ৩টি সাউন্ডপ্রুফ জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ ছিল। তদন্তে উঠে এসেছে, সেখানে ঘূর্ণায়মান স্টিলের চেয়ার, বৈদ্যুতিক শক দেয়ার যন্ত্র, ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখার ব্যবস্থা এবং বিশেষ লোহার বেড রাখা ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, বন্দিদের এসব যন্ত্রে বেঁধে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। দেয়ালে টাঙানো থাকতো কাটা হাত, উপড়ে ফেলা চোখ এবং নির্যাতনের বিভৎস সব ছবি। র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার অধীনে পরিচালিত এই টিএফআই সেলের কোডনেম ছিল ‘হাসপাতাল’। বাইরে থেকে এটি সাধারণ সরকারি স্থাপনা মনে হলেও, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এটি বলপূর্বক গুমের অন্যতম প্রধান বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এখান থেকে অনেক ভুক্তভোগীকে দেশের অন্য গোপন বন্দিশালায়ও স্থানান্তর করা হতো।

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক তদন্তে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং ব্যারিস্টার আরমানকে এই সেলে আটকে রাখার তথ্য পাওয়া গেছে। এখন পর্যন্ত বলপূর্বক গুম হওয়া ২৫০ জনেরও বেশি ব্যক্তির কোনো সন্ধান মেলেনি। তিনি বলেন, কাউকে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এখানে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে মানবতাবিরোধী অপরাধ। আমিনুল ইসলাম আরও জানান, শুধু মাঠপর্যায়ের নয়, ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’র আওতায় থাকা ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদেরও বিচারের আওতায় আনা হবে। শনিবার সেনানিবাসের ভেতরে ডিজিএফআইয়ের জিআইসি পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রসিকিউশনের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর বলপূর্বক গুমসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করার জন্য ভবনটির দেয়াল, দরজা, জানালা এবং বিভিন্ন কাঠামো পরিবর্তন বা ধ্বংস করা হয়েছে।

অন্যদিকে, টিএফআই সেল পরিদর্শন শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, ‘আয়নাঘর’ কোনো নির্দিষ্ট স্থান নয়, বরং এটি একটি ধারণা। আইনজীবী মো. তবারক হোসেন ভূঁইয়া বলেন, তারা ‘আয়নাঘর’ নয়, তথাকথিত টিএফআই সেল দেখতে গেছেন এবং টিএফআই একটি কনসেপ্ট, নির্দিষ্ট কোনো কক্ষ নয়। তিনি আরও বলেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের অপরাধী বলা যায় না। অপর আইনজীবী এ বি এম হামিদুর মেজবা বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করতে ব্যর্থ হলেও তা বড়জোর বিভাগীয় অপরাধ হতে পারে, মানবতাবিরোধী অপরাধ নয়। তিনি দাবি করেন, প্রসিকিউশন এখনো আসামিদের সঙ্গে ওই কক্ষগুলোর কোনো সরাসরি যোগসূত্র দেখাতে পারেনি।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin