ব্যক্তিস্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের খবরদারি: নাগরিক অধিকারের সংকট
- আপডেট সময় : ০৩:০৭:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ও চলাফেরার স্বাধীনতার ওপর রাষ্ট্রের খবরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করছে। গত ৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে কেবল অবিবাহিত হওয়ার কারণে নেপালে যেতে বাধা দেয় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ২৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে এই বাধার বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেছেন এবং ভবিষ্যতে আইনি কারণ ছাড়া রিট আবেদনকারী নারী ত্রয়ীদের বাধা না দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।
একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটেছে ২৭ সেপ্টেম্বর ফার্মগেট মেট্রোস্টেশনে। সেখানে একজন অ্যাথলেটিকস কোচকে শর্টস পরার কারণে একজন পুলিশ কর্মকর্তা প্রায় ৪০ মিনিট আটকে রাখেন। ওই কোচকে পোশাকটি ‘অশালীন’ দাবি করে ট্রাউজার্স বা ফুলপ্যান্ট পরে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়। এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং এগুলো ব্যক্তিগত জীবন নিয়ন্ত্রণের অপচেষ্টা হিসেবেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
বাংলাদেশের সংবিধানে পোশাক-আশাক নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ নেই। বরং সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১ অনুযায়ী, আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না যাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে। এছাড়া বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার ১৯৭৩ অনুযায়ী কেবল নির্দিষ্ট আইনি কারণে পাসপোর্ট প্রত্যাখ্যান বা সীমিত করার বিধান রয়েছে। ফলে অবিবাহিত হওয়ার কারণে বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়া বা পোশাকের জন্য হেনস্তা করাকে ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবেই দেখা যায়।
এর আগেও সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ‘মোরাল পুলিশিং’-এর নামে বিভিন্ন স্থানে নারীদের হেনস্তা করার ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর ওড়না পরা নিয়ে হেনস্তা ও হেনস্তাকারীকে জামিন দেওয়ার ঘটনা, লঞ্চে দুই নারীকে পেটানো এবং জোর করে জনসমক্ষে চুল কেটে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পোশাক নিয়ে নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল, যা পরে সমালোচনার মুখে প্রত্যাহার করা হয়।
এসব ঘটনার মূল উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা। একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শিক গোষ্ঠী ধারাবাহিকভাবে তাদের আকাঙ্ক্ষিত আচার-ব্যবহার সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। যখন কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে অভিভাবকের অনুমতি বা বৈবাহিক অবস্থার অজুহাতে বিদেশ যেতে বাধা দেওয়া হয়, তখন তাকে পরোক্ষভাবে স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে অস্বীকার করা হয়। এটি জেন্ডার সমতার বৈশ্বিক ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং হতাশাজনক। রাষ্ট্র যখন কোনো ব্যক্তির পোশাক বা বিদেশভ্রমণকে ‘শালীনতা’ বা ‘পারিবারিক সম্মান’-এর মতো মানদণ্ড দিয়ে বিচার করে, তখন নাগরিক অধিকারের মৌলিক ভিত্তিই হুমকির মুখে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ ধরনের অযাচিত ও বৈষম্যমূলক আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।





























