ঢাকা ০৩:৪৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সাংবাদিকদের নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক: প্রেস কাউন্সিল ঢাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে একদিনে গ্রেপ্তার ৪৬৫, মামলা ৭৩ কয়রার যোগাযোগ সংকট কাটাতে ৬০ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের উদ্যোগ দেশে ২ কোটি শিশুকে হাম-রুবেলা টিকা, লক্ষ্য আরও ৩৫ লাখ সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি ভাঙ্গুড়ায় নৈশ প্রহরী পদে চাকরি দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগ সিসিটিভিতে ধরা পড়ল প্রিজন ভ্যান থেকে পিচ্চি রাজার পালানোর দৃশ্য বাংলাদেশ সফরে আসছেন জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার ফরিদা শহীদ মনোযোগের রাশ কার হাতে, আপনার নাকি ফোনের স্ক্রিনের? যুক্তরাষ্ট্রে ফায়ারিং স্কোয়াডে কার্যকর হবে সাবেক মেজরের মৃত্যুদণ্ড

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিষিদ্ধ করার দাবি ও আইনের শাসনের সংকট

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৬:৪০:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



যুগে যুগে এই বাংলায় শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন বই নিষিদ্ধ করেছে। কখনো ক্ষমতা হারানোর ভয়ে, কখনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপে—সব মিলিয়ে এই অঞ্চলে বই নিষিদ্ধ হওয়ার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ব্রিটিশ শাসনামলে যেমন কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিষের বাঁশী’ ও ‘ভাঙার গান’ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তেমনি পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রসংগীত ও রবীন্দ্রনাথকে বাদ দেওয়া হয়নি। স্বাধীনতার পরও বিভিন্ন সময়ে আমাদের লেখক-কবিদের বই বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, এমনকি প্রকাশনীও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে এ কে খন্দকারের লেখা ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ বইটি নিষিদ্ধ করার দাবি তোলা হয়েছিল, যা নিয়ে সেই সময় তুলকালাম হয়।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগার থেকে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু কিংবা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে লেখা বই সরিয়ে নেওয়া হয়। কোথাও পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। বরগুনা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের গ্রন্থাগারে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’সহ চার শতাধিক বই পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল কলেজটির ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে (১৮ আগস্ট ২০২৫)।

এ কথা অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই যে, আওয়ামী লীগ শাসনামলে একুশের বইমেলায় একদল মানুষ শেখ মুজিবকে নিয়ে অদ্ভুত সব বই প্রকাশ করত। শেখ হাসিনার প্রশংসায় ভাসিয়ে বইও লেখা হতো। এসব বইয়ের প্রতি পাঠকদের তেমন আগ্রহ ছিল না। তবে সুবিধাবাদী পক্ষ এসব বই দেখিয়ে নানা সুবিধা আদায়ে পিছপা হতো না। কখনো কখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এসব ‘অসাড়’ বই কেনার তাগিদ দেওয়া হতো, যা নিয়ে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। সব বইয়ের গুরুত্ব যে সমান নয়, তা পাঠকেরাও ভালো করেই বোঝেন। কিন্তু সম্প্রতি এমন একটি ঘটনা ঘটেছে, যা জানার পর প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশ কি সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে? বাংলাদেশে কি শেখ মুজিবুর রহমানের মতো মানুষের পদচারণ ছিল?

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ শুধু বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছেই নয়, ইতিহাস ও সমাজ নিয়ে গবেষণা করেন সারা বিশ্বের এমন গবেষকদের কাছেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর এই আত্মজীবনীতে মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি কেমন ছিল, তার একটি নিখুঁত প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে। যে বই ইতিহাসের পাল্লায় অমূল্য রতন, সেই বইয়ের প্রকাশনা বন্ধ করার তাগিদ দিয়েছেন কিছু যুবক (২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।

গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে প্রকাশনা সংস্থা দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) বলেছে, ২৮ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে কয়েকজন ব্যক্তি বাংলাবাজারের শোরুমে গিয়ে আক্রমণাত্মক আচরণ করেন। তাঁরা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’কে নিষিদ্ধ বই দাবি করে এর বিপণন বন্ধ করার কথা বলেন। একপর্যায়ে শোরুমের শাটার বন্ধ করে ইউপিএলের দুই বিক্রয়কর্মীকে হয়রানি করা হয়। পরে তাঁদের ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আটকে রাখা হয় এবং পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।

এটিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কয়েকজন মানুষ একটি প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনীর কাছে গিয়ে বলবে, ওমুক বই ‘নিষিদ্ধ’ আর পুলিশ কোনো বিচার-বিবেচনা ছাড়াই বিক্রয়কর্মীদের ধরে রাখবে, সেটা কীভাবে সম্ভব? কারা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’কে বন্ধ করতে চায়? ওই ব্যক্তিরা আদৌ কি সেই বইয়ের কয়েকটা পাতা পড়েছে? ঠিক কোন শব্দ বা বাক্যচয়নের জন্য বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তাঁদের বিষোদগার? উল্টো যাঁরা একটি বৈধ ব্যবসায় বাধা দিলেন, তাঁদের পরিচয় কেন জানা গেল না? আইনের রক্ষকেরা যখন আইনবহির্ভূত চাপের কাছে নতি স্বীকার করেন, তখন সাধারণ নাগরিক কার কাছে আশ্রয় চাইবেন?

শেখ মুজিবুর রহমান কোনো লেখক, কবি বা সাহিত্যিক নন, তিনি একজন রাজনীতিবিদ। আর রাজনীতিবিদেরা ইতিহাসের সুরকি। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী এই দেশের ইতিহাসের সুরকি বটে। একজন মানুষ সাড়ে ৪ হাজার দিন জেল জীবন পার করেছেন, জেলের ভিতর থেকে তিনি একটি রাষ্ট্রের জন্মের স্বপ্ন বুনন করেছেন, এর চেয়ে পবিত্র সত্য আর কী হতে পারে? ‘আত্মজীবনী’ কোনো উপন্যাস বা নাটক নয় যে সেখানে সাহিত্যিক উপাদানে পাঠকদের পুলকিত করবে। এটি সরেশ উপাদান, যা একজন ব্যক্তির আচার ও সময়ের নির্ভেজাল ছবিমাত্র। সারা পৃথিবীতে বায়োগ্রাফিক বইগুলো বেশ গুরুত্ব বহন করে। এসব বইয়ে লুকিয়ে থাকা একজন মানুষের বেড়ে ওঠা ও সংগ্রাম পড়ে অনেকেই অনুপ্রাণিত হতে পারে। এখন সেই সময় মানুষদের আত্মজীবনী যদি ‘নিষিদ্ধ’ করা হতো, তাহলে এই পৃথিবীতে ইতিহাসের সোপান তৈরি হতো না।

আমাদের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিককে চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। সেই স্বাধীনতার ওপর যুক্তিসংগত বাধানিষেধ আরোপের এখতিয়ার আছে কেবল আইনের, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই। কোনো বই যদি সত্যিই রাষ্ট্রের আইন ভঙ্গ করে, তার প্রতিকারের পথও আইনে আছে: সরকার প্রজ্ঞাপন দিতে পারে, সংক্ষুব্ধ কেউ আদালতে যেতে পারেন, সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আবার আপিলও করা যায়। নীরবতা এখানে সম্মতিরই নামান্তর। তাই সরকারকে বলতে হবে, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ যদি নিষিদ্ধ না হয়, তাহলে কারা ইউপিএলের কর্মীদের হয়রানি করেছেন, তাঁদের শনাক্ত করা হোক। কোন ক্ষমতাবলে পুলিশ বিক্রি বন্ধের শর্ত দিল, তার ব্যাখ্যা দেওয়া হোক। কেউ বইটির সঙ্গে দ্বিমত করতেই পারেন, এর সম্পাদনা বা প্রকাশনা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারেন। সেই সমালোচনার জায়গা গবেষণা, আলোচনা আর পাল্টা লেখা। বই নিয়ে আপত্তি থাকলে তার জবাব হোক আরেকটি বই, যুক্তির জবাব হোক যুক্তি দিয়ে। দোকানের শাটার নামিয়ে ইতিহাস মোছা যায় না। এর লাখো কপি ইতিমধ্যে মানুষের ঘরে ঘরে আছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে ছড়িয়ে আছে, ই-বুক তৈরি হয়েছে, বইয়ের রিভিউ নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখা হয়েছে, জাতীয় লাইব্রেরিগুলোতে তা সংরক্ষণও করা হয়েছে। এসব কাজ করে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ হারল না, হারল আমাদের আইনের শাসন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিষিদ্ধ করার দাবি ও আইনের শাসনের সংকট

আপডেট সময় : ০৬:৪০:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুগে যুগে এই বাংলায় শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন বই নিষিদ্ধ করেছে। কখনো ক্ষমতা হারানোর ভয়ে, কখনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপে—সব মিলিয়ে এই অঞ্চলে বই নিষিদ্ধ হওয়ার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ব্রিটিশ শাসনামলে যেমন কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিষের বাঁশী’ ও ‘ভাঙার গান’ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তেমনি পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রসংগীত ও রবীন্দ্রনাথকে বাদ দেওয়া হয়নি। স্বাধীনতার পরও বিভিন্ন সময়ে আমাদের লেখক-কবিদের বই বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, এমনকি প্রকাশনীও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে এ কে খন্দকারের লেখা ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ বইটি নিষিদ্ধ করার দাবি তোলা হয়েছিল, যা নিয়ে সেই সময় তুলকালাম হয়।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগার থেকে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু কিংবা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে লেখা বই সরিয়ে নেওয়া হয়। কোথাও পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। বরগুনা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের গ্রন্থাগারে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’সহ চার শতাধিক বই পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল কলেজটির ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে (১৮ আগস্ট ২০২৫)।

এ কথা অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই যে, আওয়ামী লীগ শাসনামলে একুশের বইমেলায় একদল মানুষ শেখ মুজিবকে নিয়ে অদ্ভুত সব বই প্রকাশ করত। শেখ হাসিনার প্রশংসায় ভাসিয়ে বইও লেখা হতো। এসব বইয়ের প্রতি পাঠকদের তেমন আগ্রহ ছিল না। তবে সুবিধাবাদী পক্ষ এসব বই দেখিয়ে নানা সুবিধা আদায়ে পিছপা হতো না। কখনো কখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এসব ‘অসাড়’ বই কেনার তাগিদ দেওয়া হতো, যা নিয়ে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। সব বইয়ের গুরুত্ব যে সমান নয়, তা পাঠকেরাও ভালো করেই বোঝেন। কিন্তু সম্প্রতি এমন একটি ঘটনা ঘটেছে, যা জানার পর প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশ কি সত্যিই মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে? বাংলাদেশে কি শেখ মুজিবুর রহমানের মতো মানুষের পদচারণ ছিল?

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ শুধু বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছেই নয়, ইতিহাস ও সমাজ নিয়ে গবেষণা করেন সারা বিশ্বের এমন গবেষকদের কাছেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর এই আত্মজীবনীতে মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি কেমন ছিল, তার একটি নিখুঁত প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে। যে বই ইতিহাসের পাল্লায় অমূল্য রতন, সেই বইয়ের প্রকাশনা বন্ধ করার তাগিদ দিয়েছেন কিছু যুবক (২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।

গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে প্রকাশনা সংস্থা দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) বলেছে, ২৮ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে কয়েকজন ব্যক্তি বাংলাবাজারের শোরুমে গিয়ে আক্রমণাত্মক আচরণ করেন। তাঁরা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’কে নিষিদ্ধ বই দাবি করে এর বিপণন বন্ধ করার কথা বলেন। একপর্যায়ে শোরুমের শাটার বন্ধ করে ইউপিএলের দুই বিক্রয়কর্মীকে হয়রানি করা হয়। পরে তাঁদের ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আটকে রাখা হয় এবং পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।

এটিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কয়েকজন মানুষ একটি প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনীর কাছে গিয়ে বলবে, ওমুক বই ‘নিষিদ্ধ’ আর পুলিশ কোনো বিচার-বিবেচনা ছাড়াই বিক্রয়কর্মীদের ধরে রাখবে, সেটা কীভাবে সম্ভব? কারা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’কে বন্ধ করতে চায়? ওই ব্যক্তিরা আদৌ কি সেই বইয়ের কয়েকটা পাতা পড়েছে? ঠিক কোন শব্দ বা বাক্যচয়নের জন্য বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তাঁদের বিষোদগার? উল্টো যাঁরা একটি বৈধ ব্যবসায় বাধা দিলেন, তাঁদের পরিচয় কেন জানা গেল না? আইনের রক্ষকেরা যখন আইনবহির্ভূত চাপের কাছে নতি স্বীকার করেন, তখন সাধারণ নাগরিক কার কাছে আশ্রয় চাইবেন?

শেখ মুজিবুর রহমান কোনো লেখক, কবি বা সাহিত্যিক নন, তিনি একজন রাজনীতিবিদ। আর রাজনীতিবিদেরা ইতিহাসের সুরকি। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী এই দেশের ইতিহাসের সুরকি বটে। একজন মানুষ সাড়ে ৪ হাজার দিন জেল জীবন পার করেছেন, জেলের ভিতর থেকে তিনি একটি রাষ্ট্রের জন্মের স্বপ্ন বুনন করেছেন, এর চেয়ে পবিত্র সত্য আর কী হতে পারে? ‘আত্মজীবনী’ কোনো উপন্যাস বা নাটক নয় যে সেখানে সাহিত্যিক উপাদানে পাঠকদের পুলকিত করবে। এটি সরেশ উপাদান, যা একজন ব্যক্তির আচার ও সময়ের নির্ভেজাল ছবিমাত্র। সারা পৃথিবীতে বায়োগ্রাফিক বইগুলো বেশ গুরুত্ব বহন করে। এসব বইয়ে লুকিয়ে থাকা একজন মানুষের বেড়ে ওঠা ও সংগ্রাম পড়ে অনেকেই অনুপ্রাণিত হতে পারে। এখন সেই সময় মানুষদের আত্মজীবনী যদি ‘নিষিদ্ধ’ করা হতো, তাহলে এই পৃথিবীতে ইতিহাসের সোপান তৈরি হতো না।

আমাদের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিককে চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। সেই স্বাধীনতার ওপর যুক্তিসংগত বাধানিষেধ আরোপের এখতিয়ার আছে কেবল আইনের, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই। কোনো বই যদি সত্যিই রাষ্ট্রের আইন ভঙ্গ করে, তার প্রতিকারের পথও আইনে আছে: সরকার প্রজ্ঞাপন দিতে পারে, সংক্ষুব্ধ কেউ আদালতে যেতে পারেন, সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আবার আপিলও করা যায়। নীরবতা এখানে সম্মতিরই নামান্তর। তাই সরকারকে বলতে হবে, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ যদি নিষিদ্ধ না হয়, তাহলে কারা ইউপিএলের কর্মীদের হয়রানি করেছেন, তাঁদের শনাক্ত করা হোক। কোন ক্ষমতাবলে পুলিশ বিক্রি বন্ধের শর্ত দিল, তার ব্যাখ্যা দেওয়া হোক। কেউ বইটির সঙ্গে দ্বিমত করতেই পারেন, এর সম্পাদনা বা প্রকাশনা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারেন। সেই সমালোচনার জায়গা গবেষণা, আলোচনা আর পাল্টা লেখা। বই নিয়ে আপত্তি থাকলে তার জবাব হোক আরেকটি বই, যুক্তির জবাব হোক যুক্তি দিয়ে। দোকানের শাটার নামিয়ে ইতিহাস মোছা যায় না। এর লাখো কপি ইতিমধ্যে মানুষের ঘরে ঘরে আছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে ছড়িয়ে আছে, ই-বুক তৈরি হয়েছে, বইয়ের রিভিউ নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখা হয়েছে, জাতীয় লাইব্রেরিগুলোতে তা সংরক্ষণও করা হয়েছে। এসব কাজ করে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ হারল না, হারল আমাদের আইনের শাসন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo