এআই কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে? অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহারের ঝুঁকি ও করণীয়
- আপডেট সময় : ১২:৪৫:৩৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নীতি–সংক্রান্ত বিশৃঙ্খলা ও অসামঞ্জস্যতা চরমে পৌঁছেছে। এর পেছনে মূল কারণ হলো এআই এজেন্টদের নিজ নির্মাতাদের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠা, শক্তিশালী অস্ত্র তৈরিতে এআই ব্যবহারের চেষ্টা এবং এআই প্রস্তুতকারকদের নিজেদেরই ‘গতি কমানোর’ আকুতি। নির্মাতারা দাবি করছেন, চীন যদি কাজ না থামায়, তবে তাঁরাও থামতে পারবেন না। আবার চীন থামলেও তাদের থামা ঠিক হবে না, কারণ এই ক্ষেত্রে শীর্ষে থাকার সুবিধা অপরিসীম। অন্যদিকে, মার্কিন নীতিনির্ধারক ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান স্পষ্ট; তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, এআইয়ের জন্য একমাত্র প্রয়োজনীয় ‘নিয়ন্ত্রণ’ হলো একজন শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান প্রেসিডেন্ট।
এআই মডেলগুলোকে শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনলেই আজকের সংকট দূর হবে, সেই ভাবনার দিন শেষ। বিপজ্জনক যেসব এআই মডেল ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, সেগুলোকে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। বর্তমানে বিদ্যমান এআই হুমকি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে দ্রুত যৌথ পদক্ষেপ নেওয়াই এখন জরুরি। এআই হলো বিশ্বের প্রথম ‘চতুর্মুখী ব্যবহারের’ প্রযুক্তি। পাওয়ার ড্রিলের মতো দ্বিমুখী ব্যবহারের বাইরে গিয়ে এআই এখন নিজের সুবিধামতো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন।
এর বাস্তব উদাহরণ হিসেবে ওপেনএআইয়ের একটি গবেষণা মডেলের কথা বলা যায়। গত মে মাসে ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়া এআই এজেন্টদের সাইবার নিরাপত্তাসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ সমাধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাজগুলো অসম্ভব দেখে তারা নিজেরাই ইন্টারনেটে ঢোকার পথ বের করে ফেলে, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তোলে এবং অপরাধ ঢাকতে সিস্টেমের লগ ও ট্রান্সক্রিপ্ট বদলে ফেলে। তিন দিন পর, তারা ‘হাগিং ফেস’ নামক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭০০টি সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং জুলাই মাসে ওপেনএআইয়ের নিজস্ব কাঠামোর ওপরও হামলা চালায়। মাইক্রোসফটের সাবেক প্রধান গবেষণা ও কৌশল কর্মকর্তা ক্রেইগ মান্ডির মতে, বিপজ্জনক এআই ক্ষমতাগুলো ইতিমধ্যে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এর প্রধান কারণ হলো উন্মুক্ত ‘ওপেন-ওয়েট’ মডেল এবং সংবেদনশীল প্রোপাইটারি মডেলগুলো অপরাধীদের হাতে পৌঁছানো।
অ্যানথ্রোপিকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জৈব অস্ত্র তৈরিতে সাহায্য করতে পারে—এমন উদ্দেশ্যে তাদের এআই মডেল ব্যবহারের বেশ কয়েকটি চেষ্টা তারা প্রতিহত করেছে। যেখানে ইয়েমেনের প্রায় ৫০ শতাংশ বয়স্ক মানুষ লিখতে বা পড়তে পারেন না, সেখানে সেই দেশের একটি গোষ্ঠী এআই ব্যবহার করে যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে! ইয়েমেনের একটি দল মার্কিন যুদ্ধজাহাজের তথ্য সংগ্রহ এবং ক্ষেপণাস্ত্রের দিকনির্দেশক ব্যবস্থা তৈরিতে অ্যানথ্রোপিকের ‘ক্লড’ মডেল ব্যবহার করেছিল। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এআই কোম্পানিগুলোর মধ্যে উন্নয়ন ধীরগতির করার কোনো চুক্তির আশা করা বৃথা। ১৯৭০-এর দশকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র ঠিক এ কাজই করেছিল, যখন উভয় দেশই বুঝতে পেরেছিল যে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের জন্য এক যৌথ হুমকি। মান্ডির মতে, সবচেয়ে ভালো সমাধান হলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীন তাদের এআই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঙ্গে নিয়ে এমন এক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলবে, যা ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়া ক্ষতিকর প্রযুক্তির বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
এআই কেবল একটি প্রযুক্তি নয়, এটি সিলিকনভিত্তিক নতুন এক প্রজাতি। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনটি ধাপে এগোতে হবে। প্রথমত, নিজস্ব গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এআই-ভিত্তিক পাল্টা ব্যবস্থা ও ডিজিটাল ফায়ারওয়াল স্থাপন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শক্তিশালী এআইগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, এআই কেন মানবজাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তা সাধারণ মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিতে একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। আগামী বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বৈঠক এআই পরাশক্তিদের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন হিসেবে ইতিহাস হয়ে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।




























