ঢাকা ০৪:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সিরাজগঞ্জে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ৪০০ শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দিল ফাউন্ডেশন আফগানিস্তানের আটটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি পাকিস্তানের বাংলাদেশ পুলিশের ১৩ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বদলি ও নতুন পদায়ন গুলশান ও বনানী থানায় নতুন ওসি নিয়োগ কমিউনিটি পুলিশ কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপে পটুয়াখালীতে সেরা দশমিনার আরিফ ট্রাম্পের হুমকিকে কৌশলগত হতাশা বলে আরও তীব্র হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের সরকারি সব কমিটি পুনর্গঠন করা হচ্ছে, বাদ পড়ছেন আওয়ামীপন্থীরা সরকারি কলেজের ক্লাস রুটিন চেয়ে মাউশির জরুরি নির্দেশনা জারি পাঁচ জেলায় ছড়িয়েছে অ্যানথ্রাক্স, আক্রান্ত শতাধিক মানুষ জাতিসংঘে এরদোয়ানের শান্তির আহ্বানে বিশ্ব বিবেকের প্রতিধ্বনি: এমিনি

হেয়ার রোডের ছাগল-কাণ্ড ও রাজনৈতিক ‘প্রতিशोधের’ গল্প

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৩:৪৯:৪৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



শান্তিনিকেতন থেকে নোবেল চুরির ঘটনার মধ্যে একধরনের সূক্ষ্ম শিল্পকর্মের অনুরাগের ভাব থাকলেও, হেয়ার রোডের মন্ত্রীর বাড়ি থেকে ছাগল চুরির ঘটনাটি একেবারেই ভিন্ন ও অস্বস্তিকর। ২০২৪ সালের শেষ দিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ড. আসিফ নজরুলের হেয়ার রোডের সরকারি বাংলো থেকে তাঁর ছোট মেয়ের একটি পোষা ছাগল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। এই ঘটনার রেশ যেন কিছুতেই কাটছে না, বরং তা নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের রূপ নিয়েছে।

घटनाর নেপথ্যে শোনা যায়, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে অপসারণের দাবিতে জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) নেতারা জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু আসিফ নজরুল এই সিদ্ধান্তে দ্বিমত পোষণ করায় ক্ষুব্ধ হন সংগঠনটির নেতারা। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তাঁরা আসিফ নজরুলের বাংলোর একটি পোষা ছাগল জবাই করে খেয়ে ফেলেন এবং অন্য একটি ছাগলের গলায় ‘চুপ্পুর অপসারণ চাই’ লেখা কাগজ ঝুলিয়ে রেখে যান। সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীনের একটি টক শোতে এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নিজেই এই তথ্যটি স্বীকার করেন। তিনি জানান, আসিফ নজরুলকে শিক্ষা দিতেই নাকি এই কাজ করা হয়েছে। পরে ক্ষতিপূরণ হিসেবে আরেকটি ছাগল কিনে দেওয়া হলেও রঙের মিল না থাকায় আসিফ নজরুল সেটি গ্রহণ করেননি।

সম্প্রতি খালেদ মুহিউদ্দীনের আরেকটি অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে এই ঘটনা নিয়ে নিজের গভীর ক্ষোভ ও কষ্টের কথা প্রকাশ করেন আসিফ নজরুল। তিনি এটিকে তাঁর জীবনের অন্যতম হৃদয়বিদারক ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেন। আসিফ নজরুল জানান, ফুলার রোড ছেড়ে যখন তাঁরা হেয়ার রোডে আসেন, তখন তাঁর সাড়ে নয় বছরের মেয়েটি একা হয়ে পড়েছিল। তার কোনো বন্ধুবান্ধব না থাকায় তাকে এই ছাগলটি কিনে দেওয়া হয়। ছাগলটি মেয়েটির অত্যন্ত প্রিয় সঙ্গী হয়ে উঠেছিল এবং তার ফোনের ওয়ালপেপারেও ছাগলটির সাথে ছবি ছিল। ছাগলটি হারিয়ে যাওয়ার পর মেয়েটি দেড় দিন ধরে না খেয়ে কেঁদেছিল এবং অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। মেয়েটির মানসিক ট্রমার কথা চিন্তা করে তাকে বলা হয়েছিল যে দরজা খোলা পেয়ে ছাগলটি পালিয়ে গেছে। আসিফ নজরুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, political প্রতিশোধের নামে যারা এই নিরীহ প্রাণীটিকে হত্যা করেছে, তারা চরম নিষ্ঠুর ও পাষণ্ড। এমনকি ছাগলটিকে অত্যন্ত নির্মমভাবে প্রথমে বটি দিয়ে অর্ধেক কাটার পর কারওয়ান বাজার থেকে ধারালো ছুরি এনে জবাই করা হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তবে আসিফ নজরুলের এই আবেগঘন বক্তব্যের পর এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মধ্যে কোনো অনুশোচনা বা দুঃখপ্রকাশের লক্ষণ দেখা যায়নি। উল্টো তিনি অত্যন্ত আক্রমণাত্মকভাবে মন্তব্য করেন যে, আসিফ নজরুলের একটি নয়, দুটি ছাগলই খেয়ে ফেলা উচিত ছিল। আসিফ নজরুলকে ‘খুব ভালো মানুষ না’ বলে আখ্যায়িত করে তিনি সমালোচনা করেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাত্র এক-দেড় বছরের মাথায় তিনি পুলিশি পাহারায় গরু, ছাগল ও মুরগি পালন শুরু করেছেন। নাসীরুদ্দীনের এমন অনমনীয় ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া অনেককে ইলিয়াস শাহের ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসের ক্ষ্যাপাটে চরিত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়।

আমাদের সমাজে মুরগি বা ছাগল চুরি করে খাওয়ার একটি পুরোনো ও অনানুষ্ঠানিক রেওয়াজ রয়েছে, যা অনেক সময় নিছক কৌতুক হিসেবে দেখা হয়। এমনকি নেলসন ম্যান্ডেলার মতো মহান নেতাও তাঁর আত্মজীবনী ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’-এ শৈশবের ছাগল চুরির গল্প লিখেছেন। কিন্তু যখন এই কাজ রাজনৈতিক ‘প্রতিशोध’ বা ‘শিক্ষা দেওয়ার’ হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা আর নিছক কৌতুক থাকে না। বাংলাদেশে ছাগল এখন কেবল একটি প্রাণী নয়, এটি যেন রাজনৈতিক প্রতীক, প্রতিবাদ ও দর্শনের অংশ হয়ে উঠেছে। যেমনটি দেখা গিয়েছিল শেখ হাসিনা সরকারের পতনের প্রাক্কালে ১৫ লাখ টাকার একটি উচ্চবংশীয় রামছাগলের ঘটনার মাধ্যমে।

প্রাচীন জেরুজালেমে ইয়োম কিপুরের আচারে একটি ছাগলকে বলি দেওয়া হতো এবং অন্যটির ওপর মানুষের পাপের দায় চাপিয়ে মরুভূমিতে পাঠিয়ে দেওয়া হতো, যেখান থেকে ‘এস্কেপগোট’ বা ‘বলির পাঁঠা’ শব্দের উৎপত্তি। হেয়ার রোডের ঘটনাটিও যেন সেই প্রাচীন আচারের কথাই মনে করিয়ে দেয়। আমাদের রাজনীতিতেও বলির পাঁঠার অভাব নেই, যেখানে রাজনৈতিক ক্ষোভ মেটাতে নিরীহ প্রাণীকেও প্রতীকী বলির শিকার হতে হয়। ছাগল চলে গেলেও আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে এই ‘ছাগলামি’র অবসান ঘটেনি।

সারফুদ্দিন আহমেদ: প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক। ইমেইল: sarfuddin2003@gmail.com

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

হেয়ার রোডের ছাগল-কাণ্ড ও রাজনৈতিক ‘প্রতিशोधের’ গল্প

আপডেট সময় : ০৩:৪৯:৪৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শান্তিনিকেতন থেকে নোবেল চুরির ঘটনার মধ্যে একধরনের সূক্ষ্ম শিল্পকর্মের অনুরাগের ভাব থাকলেও, হেয়ার রোডের মন্ত্রীর বাড়ি থেকে ছাগল চুরির ঘটনাটি একেবারেই ভিন্ন ও অস্বস্তিকর। ২০২৪ সালের শেষ দিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ড. আসিফ নজরুলের হেয়ার রোডের সরকারি বাংলো থেকে তাঁর ছোট মেয়ের একটি পোষা ছাগল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। এই ঘটনার রেশ যেন কিছুতেই কাটছে না, বরং তা নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের রূপ নিয়েছে।

घटनाর নেপথ্যে শোনা যায়, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে অপসারণের দাবিতে জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) নেতারা জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু আসিফ নজরুল এই সিদ্ধান্তে দ্বিমত পোষণ করায় ক্ষুব্ধ হন সংগঠনটির নেতারা। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তাঁরা আসিফ নজরুলের বাংলোর একটি পোষা ছাগল জবাই করে খেয়ে ফেলেন এবং অন্য একটি ছাগলের গলায় ‘চুপ্পুর অপসারণ চাই’ লেখা কাগজ ঝুলিয়ে রেখে যান। সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীনের একটি টক শোতে এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নিজেই এই তথ্যটি স্বীকার করেন। তিনি জানান, আসিফ নজরুলকে শিক্ষা দিতেই নাকি এই কাজ করা হয়েছে। পরে ক্ষতিপূরণ হিসেবে আরেকটি ছাগল কিনে দেওয়া হলেও রঙের মিল না থাকায় আসিফ নজরুল সেটি গ্রহণ করেননি।

সম্প্রতি খালেদ মুহিউদ্দীনের আরেকটি অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে এই ঘটনা নিয়ে নিজের গভীর ক্ষোভ ও কষ্টের কথা প্রকাশ করেন আসিফ নজরুল। তিনি এটিকে তাঁর জীবনের অন্যতম হৃদয়বিদারক ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেন। আসিফ নজরুল জানান, ফুলার রোড ছেড়ে যখন তাঁরা হেয়ার রোডে আসেন, তখন তাঁর সাড়ে নয় বছরের মেয়েটি একা হয়ে পড়েছিল। তার কোনো বন্ধুবান্ধব না থাকায় তাকে এই ছাগলটি কিনে দেওয়া হয়। ছাগলটি মেয়েটির অত্যন্ত প্রিয় সঙ্গী হয়ে উঠেছিল এবং তার ফোনের ওয়ালপেপারেও ছাগলটির সাথে ছবি ছিল। ছাগলটি হারিয়ে যাওয়ার পর মেয়েটি দেড় দিন ধরে না খেয়ে কেঁদেছিল এবং অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। মেয়েটির মানসিক ট্রমার কথা চিন্তা করে তাকে বলা হয়েছিল যে দরজা খোলা পেয়ে ছাগলটি পালিয়ে গেছে। আসিফ নজরুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, political প্রতিশোধের নামে যারা এই নিরীহ প্রাণীটিকে হত্যা করেছে, তারা চরম নিষ্ঠুর ও পাষণ্ড। এমনকি ছাগলটিকে অত্যন্ত নির্মমভাবে প্রথমে বটি দিয়ে অর্ধেক কাটার পর কারওয়ান বাজার থেকে ধারালো ছুরি এনে জবাই করা হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তবে আসিফ নজরুলের এই আবেগঘন বক্তব্যের পর এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মধ্যে কোনো অনুশোচনা বা দুঃখপ্রকাশের লক্ষণ দেখা যায়নি। উল্টো তিনি অত্যন্ত আক্রমণাত্মকভাবে মন্তব্য করেন যে, আসিফ নজরুলের একটি নয়, দুটি ছাগলই খেয়ে ফেলা উচিত ছিল। আসিফ নজরুলকে ‘খুব ভালো মানুষ না’ বলে আখ্যায়িত করে তিনি সমালোচনা করেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাত্র এক-দেড় বছরের মাথায় তিনি পুলিশি পাহারায় গরু, ছাগল ও মুরগি পালন শুরু করেছেন। নাসীরুদ্দীনের এমন অনমনীয় ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া অনেককে ইলিয়াস শাহের ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসের ক্ষ্যাপাটে চরিত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়।

আমাদের সমাজে মুরগি বা ছাগল চুরি করে খাওয়ার একটি পুরোনো ও অনানুষ্ঠানিক রেওয়াজ রয়েছে, যা অনেক সময় নিছক কৌতুক হিসেবে দেখা হয়। এমনকি নেলসন ম্যান্ডেলার মতো মহান নেতাও তাঁর আত্মজীবনী ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’-এ শৈশবের ছাগল চুরির গল্প লিখেছেন। কিন্তু যখন এই কাজ রাজনৈতিক ‘প্রতিशोध’ বা ‘শিক্ষা দেওয়ার’ হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা আর নিছক কৌতুক থাকে না। বাংলাদেশে ছাগল এখন কেবল একটি প্রাণী নয়, এটি যেন রাজনৈতিক প্রতীক, প্রতিবাদ ও দর্শনের অংশ হয়ে উঠেছে। যেমনটি দেখা গিয়েছিল শেখ হাসিনা সরকারের পতনের প্রাক্কালে ১৫ লাখ টাকার একটি উচ্চবংশীয় রামছাগলের ঘটনার মাধ্যমে।

প্রাচীন জেরুজালেমে ইয়োম কিপুরের আচারে একটি ছাগলকে বলি দেওয়া হতো এবং অন্যটির ওপর মানুষের পাপের দায় চাপিয়ে মরুভূমিতে পাঠিয়ে দেওয়া হতো, যেখান থেকে ‘এস্কেপগোট’ বা ‘বলির পাঁঠা’ শব্দের উৎপত্তি। হেয়ার রোডের ঘটনাটিও যেন সেই প্রাচীন আচারের কথাই মনে করিয়ে দেয়। আমাদের রাজনীতিতেও বলির পাঁঠার অভাব নেই, যেখানে রাজনৈতিক ক্ষোভ মেটাতে নিরীহ প্রাণীকেও প্রতীকী বলির শিকার হতে হয়। ছাগল চলে গেলেও আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে এই ‘ছাগলামি’র অবসান ঘটেনি।

সারফুদ্দিন আহমেদ: প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক। ইমেইল: sarfuddin2003@gmail.com

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo