ঢাকা ০৫:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হামের উপসর্গে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১২৭০ জন ঢাকা ও উপকণ্ঠের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আধুনিকায়নে এডিবির ২০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ গাজীপুরে ট্রাক ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৩ জাতিসংঘে এরদোয়ানের ভাষণের সময় মোবাইল ফোনে মগ্ন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট মাগুরায় বেশি দামে সার ও মেয়াদোত্তীর্ণ বীজ বিক্রি, ১ লাখ টাকা জরিমানা গণমাধ্যমে সরকার ও বিরোধী দলের কথা সমান গুরুত্বের দাবি শফিকুর রহমানের কোনো শিশুই শিক্ষার বাইরে থাকবে না: সমাজকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ হোসেন খাগড়াছড়িতে ৭৭৮ শিক্ষার্থীকে শিক্ষাবৃত্তি ও সেলাই মেশিন বিতরণ ট্রাইব্যুনাল অবমাননার মামলায় দুই আইনজীবীর শুনানি ২৬ অক্টোবর

কৃষকের সার সংকট: কেবল আইনভঙ্গ নয়, এটি নৈতিকতার প্রশ্ন

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৪:২৩:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে কৃষকদের গুদাম থেকে ১৯৮ বস্তা সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি বর্তমানে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রশাসনের দৃষ্টিতে এটি নিছক আইনভঙ্গের ঘটনা হলেও, এর গভীরে রয়েছে গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। কৃষকেরা কেন এমন একটি চরম পথ বেছে নিলেন, সেই প্রশ্নটিই এখন প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষকেরা সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার পাচ্ছিলেন না। ডিলারদের গুদাম খালি দেখানো হলেও খোলাবাজারে বাড়তি দামে সার পাওয়া যাচ্ছিল, যা স্পষ্ট করে যে সার বাজারে ছিল কিন্তু কৃষকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে ছিল।

কৃষকের কাছে সার কোনো সাধারণ পণ্য নয়; এটি ফসল উৎপাদনের অপরিহার্য উপকরণ। বীজ, সেচ, শ্রম ও ঋণের সঙ্গে এটি সরাসরি জড়িত। সময়মতো সার না পেলে ফলন কমে যাওয়া, বিনিয়োগ নষ্ট হওয়া এবং ঋণের বোঝা বাড়ার ফলে পুরো পরিবারের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই সার পাওয়ার বিষয়টি কৃষকের কাছে জীবন-জীবিকার প্রশ্ন। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ই পি থম্পসনের ‘নৈতিক অর্থনীতি’ ধারণার আলোকে বলা যায়, যখন ব্যবসায়ী ও কর্তৃপক্ষ সমাজের প্রচলিত ন্যায়বোধ ভঙ্গ করে, তখনই সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ তীব্র হয়। ভূরুঙ্গামারীর কৃষকেরা শুধু সারই নেননি, বরং তারা এই ব্যবস্থার নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। ১৯৯৫ সালে গাইবান্ধার মহিমাগঞ্জে ন্যায্য দামে সার পাওয়ার দাবিতে কৃষকদের আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল। সেই সময়ও অভিযোগ ছিল, নির্ধারিত সার বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। জেমস সি স্কটের ‘দুর্বলের অস্ত্র’ তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, যখন প্রাতিষ্ঠানিক পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং ক্ষমতার অসমতা প্রকট হয়, তখন কৃষকেরা দলবদ্ধ হওয়া, রাস্তা অবরোধ কিংবা গুদাম থেকে সরাসরি সার নিয়ে নেওয়ার মতো অনানুষ্ঠানিক প্রতিরোধের পথ বেছে নেন।

কৃষকেরা কোনো দান চান না, তারা কেবল ন্যায্য দামে উৎপাদনের উপকরণ চান। ভূরুঙ্গামারীর এই ঘটনা রাষ্ট্র, বাজার ও কৃষকের মধ্যে আস্থা ভেঙে পড়ার এক করুণ দৃষ্টান্ত। সরকারি বরাদ্দ গোপন রাখা, মজুত লুকানো, কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং ভর্তুকির অপব্যবহারের মতো অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। ডিলার বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায় এড়িয়ে গেলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না।

সংকটের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের উদ্যোগে আয়োজিত সমাবেশে হামলার অভিযোগ এই পরিস্থিতির রাজনৈতিক জটিলতাকেই সামনে আনে। সরকারের উচিত কৃষকের এই বেপরোয়া অবস্থাকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা। সংকট নিরসনে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সার বরাদ্দ, ডিলারের মজুত ও বিক্রির হিসাব স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা এবং নিয়মিত যাচাই করার ব্যবস্থা করতে হবে। স্বচ্ছ তদারকি কমিটি গঠন এবং কৃষকদের জন্য সহজ অভিযোগ ও দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই খাদ্যনিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতি রক্ষার একমাত্র উপায়। কেবল আইনশৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে এই ক্ষোভ সাময়িকভাবে স্তব্ধ করা গেলেও, এর মূল কারণ দূর করা সম্ভব নয়।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

কৃষকের সার সংকট: কেবল আইনভঙ্গ নয়, এটি নৈতিকতার প্রশ্ন

আপডেট সময় : ০৪:২৩:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে কৃষকদের গুদাম থেকে ১৯৮ বস্তা সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি বর্তমানে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রশাসনের দৃষ্টিতে এটি নিছক আইনভঙ্গের ঘটনা হলেও, এর গভীরে রয়েছে গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। কৃষকেরা কেন এমন একটি চরম পথ বেছে নিলেন, সেই প্রশ্নটিই এখন প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষকেরা সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার পাচ্ছিলেন না। ডিলারদের গুদাম খালি দেখানো হলেও খোলাবাজারে বাড়তি দামে সার পাওয়া যাচ্ছিল, যা স্পষ্ট করে যে সার বাজারে ছিল কিন্তু কৃষকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে ছিল।

কৃষকের কাছে সার কোনো সাধারণ পণ্য নয়; এটি ফসল উৎপাদনের অপরিহার্য উপকরণ। বীজ, সেচ, শ্রম ও ঋণের সঙ্গে এটি সরাসরি জড়িত। সময়মতো সার না পেলে ফলন কমে যাওয়া, বিনিয়োগ নষ্ট হওয়া এবং ঋণের বোঝা বাড়ার ফলে পুরো পরিবারের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই সার পাওয়ার বিষয়টি কৃষকের কাছে জীবন-জীবিকার প্রশ্ন। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ই পি থম্পসনের ‘নৈতিক অর্থনীতি’ ধারণার আলোকে বলা যায়, যখন ব্যবসায়ী ও কর্তৃপক্ষ সমাজের প্রচলিত ন্যায়বোধ ভঙ্গ করে, তখনই সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ তীব্র হয়। ভূরুঙ্গামারীর কৃষকেরা শুধু সারই নেননি, বরং তারা এই ব্যবস্থার নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। ১৯৯৫ সালে গাইবান্ধার মহিমাগঞ্জে ন্যায্য দামে সার পাওয়ার দাবিতে কৃষকদের আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল। সেই সময়ও অভিযোগ ছিল, নির্ধারিত সার বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। জেমস সি স্কটের ‘দুর্বলের অস্ত্র’ তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, যখন প্রাতিষ্ঠানিক পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং ক্ষমতার অসমতা প্রকট হয়, তখন কৃষকেরা দলবদ্ধ হওয়া, রাস্তা অবরোধ কিংবা গুদাম থেকে সরাসরি সার নিয়ে নেওয়ার মতো অনানুষ্ঠানিক প্রতিরোধের পথ বেছে নেন।

কৃষকেরা কোনো দান চান না, তারা কেবল ন্যায্য দামে উৎপাদনের উপকরণ চান। ভূরুঙ্গামারীর এই ঘটনা রাষ্ট্র, বাজার ও কৃষকের মধ্যে আস্থা ভেঙে পড়ার এক করুণ দৃষ্টান্ত। সরকারি বরাদ্দ গোপন রাখা, মজুত লুকানো, কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং ভর্তুকির অপব্যবহারের মতো অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। ডিলার বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায় এড়িয়ে গেলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না।

সংকটের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের উদ্যোগে আয়োজিত সমাবেশে হামলার অভিযোগ এই পরিস্থিতির রাজনৈতিক জটিলতাকেই সামনে আনে। সরকারের উচিত কৃষকের এই বেপরোয়া অবস্থাকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা। সংকট নিরসনে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সার বরাদ্দ, ডিলারের মজুত ও বিক্রির হিসাব স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা এবং নিয়মিত যাচাই করার ব্যবস্থা করতে হবে। স্বচ্ছ তদারকি কমিটি গঠন এবং কৃষকদের জন্য সহজ অভিযোগ ও দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই খাদ্যনিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতি রক্ষার একমাত্র উপায়। কেবল আইনশৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে এই ক্ষোভ সাময়িকভাবে স্তব্ধ করা গেলেও, এর মূল কারণ দূর করা সম্ভব নয়।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo