কেন ‘ফ্রাস্ট্রেটেড অ্যাচিভার’রা শেখ হাসিনাকে প্রত্যাখ্যান করল
- আপডেট সময় : ০৩:৫২:২৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬ ২৫ বার পড়া হয়েছে

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে, উন্নয়ন কেবল আয় বৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যদি কোনো শাসনব্যবস্থা মানুষের ক্রমবর্ধমান আকাঙ্ক্ষাকে কার্যকর সুযোগ, ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হয়, তবে দৃশ্যমান উন্নয়ন অর্জনগুলোও দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ জুলাইয়ের এই অভ্যুত্থানকে রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন।
আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণরা উন্নয়নের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না; বরং তারা ছিল এই উন্নয়নেরই সন্তান। তারা তাদের পূর্বসূরিদের চেয়ে বেশি শিক্ষিত, প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তবে এই অর্জনের বিপরীতে তাদের জন্য কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান, সামাজিক মর্যাদা বা রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর নিশ্চিত ছিল না। এই তরুণদের ‘ফ্রাস্ট্রেটেড অ্যাচিভার্স’ বা ‘অর্জন সত্ত্বেও বঞ্চিত প্রজন্ম’ হিসেবে অভিহিত করেছেন নিয়াজ আসাদুল্লাহ। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট কুয়ালালামপুরের অ্যাস্ট্রো আওয়ানির এক সরাসরি সাক্ষাৎকারে তিনি প্রথম এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন।
এই তরুণদের হতাশা মূলত অর্জনের অনুপস্থিতি থেকে নয়, বরং অর্জনকে অর্থবহ জীবনের সুযোগে রূপান্তর করতে না পারা ব্যবস্থার ব্যর্থতা থেকে জন্ম নিয়েছে। শিক্ষা থাকলেও উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব, সনদের বিপরীতে সামাজিক উত্তরণের অনিশ্চয়তা এবং প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রটি ন্যায্য না হওয়া তাদের ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শহরের শিক্ষিত তরুণদের জন্য কাজের সুযোগ কমেছে, আর আইএলওর হিসাবে ২০২৪ সালে ১৫-২৯ বছর বয়সী ২২ শতাংশ তরুণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে ছিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে এই হার ১৫-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ৩৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ, যা সব শিক্ষাস্তরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
সরকারি চাকরির কোটা প্রথা এই প্রেক্ষাপটে একটি বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। যখন মানসম্মত বেসরকারি চাকরির অভাব ছিল, তখন সরকারি চাকরি সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তার একমাত্র মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হতো। কোটা ব্যবস্থার মাধ্যমে উত্তরাধিকারসূত্রে বা পরিচয়ের ভিত্তিতে সুযোগ বণ্টন তরুণদের চোখে ছিল মেধার অবমূল্যায়ন ও নাগরিক সমতার লঙ্ঘন। আন্দোলনের সময় ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ মন্তব্যটি তাদের দেশপ্রেম ও বৈধ নাগরিক পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করায় বিচ্ছেদ আরও গভীর হয়। পরবর্তীতে বলপ্রয়োগ, গ্রেপ্তার ও ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা এই বণ্টনগত দাবিকে সরকার পরিবর্তনের আন্দোলনে রূপ দেয়।
শিক্ষিত তরুণরা আন্দোলনের ভাষা ও সংগঠন দিলেও এটি গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয় যখন বৃহত্তর সমাজের বঞ্চনা, অপমান ও ক্ষোভ এতে যুক্ত হয়। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, অভিভাবক, পেশাজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও রিকশাচালকসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ যখন আন্দোলনে শামিল হয়, তখন এটি ‘সাবঅলটার্ন ফিউরি’ বা প্রান্তিক মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভে পরিণত হয়। শিক্ষিতদের ভবিষ্যৎ হারানোর আশঙ্কা এবং প্রান্তিক মানুষের বর্তমান জীবনের অনিরাপত্তা ও অপমান—এই দুই ধারার মিলনই শেখ হাসিনার পতনের পথ প্রশস্ত করে। পরিহাসের বিষয় হলো, শেখ হাসিনার সরকার যে উন্নয়ন-সাফল্যকে ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অনুমোদন হিসেবে ব্যবহার করেছিল, সেই উন্নয়নই এমন এক অধিকারসচেতন প্রজন্ম তৈরি করেছিল, যারা শেষ পর্যন্ত সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়েছে।





























