গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকার বকেয়া কর দ্রুত আদায়ের নির্দেশ হাইকোর্টের
- আপডেট সময় : ০৪:২০:২০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

পুনর্মূল্যায়নের পর পাঁচটি করবর্ষের বিপরীতে দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা বকেয়া কর গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে আইন অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। প্রতিষ্ঠানটির দুটি পৃথক রিট আবেদন খারিজ করে দেওয়া রায় দুটি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে সোমবার প্রকাশ করা হয়েছে।
বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ১০ সেপ্টেম্বর এই রায় দেন। এর মধ্যে একটি রায় ৩২ পৃষ্ঠার এবং অপরটি ১৫ পৃষ্ঠার। ৩২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের শেষ অংশে ঢাকার সংশ্লিষ্ট কর কমিশনারসহ বিবাদীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন আইন অনুসরণ করে দ্রুততম সময়ে গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে বকেয়া কর আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অন্যদিকে ১৫ পৃষ্ঠার রায়ে বকেয়া কর আদায় সংক্রান্ত বিষয়ে নোটিশ জারির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। নোবেল বিজয়ী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ কল্যাণের প্রতিষ্ঠাতা এবং সাবেক চেয়ারম্যান।
মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ করবর্ষের বিপরীতে গ্রামীণ কল্যাণের কাছে কর কর্তৃপক্ষের ৬৬৬ কোটি টাকার প্রদেয় কর দাবিকে কেন্দ্র করে মূলত রিট দুটি করা হয়। গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী গ্রামীণফোনে বিনিয়োগ করা হয়। সেই চুক্তি অনুসারে গ্রামীণফোনের শেয়ার থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশের অর্জিত মুনাফার ৪২ দশমিক ৬৫ শতাংশ পায় গ্রামীণ কল্যাণ। তবে ওই অর্থ 'লভ্যাংশ আয়' নাকি 'অন্যান্য উৎস থেকে আয়' তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। কর কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি মূলত বিনিয়োগের ওপর প্রাপ্ত সুদের ন্যায় আয় এবং লভ্যাংশ হিসেবে গণ্য না হয়ে 'অন্যান্য উৎস থেকে আয়' হিসেবে বিবেচিত হবে।
রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আবদুস সামাদ আজাদ জানান, আয়কর অধ্যাদেশের ১২০(১) ধারা অনুযায়ী উপকর কমিশনারের (ডিসিটি) কোনো ভুল আদেশ সংশোধনের ক্ষমতা পরিদর্শী অতিরিক্ত কর কমিশনারের রয়েছে। পরিদর্শী অতিরিক্ত কর কমিশনার শুনানির নোটিশ দিয়ে ২০১৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সিদ্ধান্ত দেন যে, গ্রামীণফোনে বিনিয়োগ সূত্রে প্রাপ্ত ওই মুনাফা লভ্যাংশ আয় নয়, বরং অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত আয়। এই আয়ের বিপরীতে গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে উৎস কর কাটা হয়নি এবং সরকারি কোষাগারে কর জমা দেওয়ারও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, পরবর্তীতে গ্রামীণ কল্যাণ আয়কর অধ্যাদেশের ১২১এ(৪)(খ) ধারা অনুযায়ী পুনর্বিবেচনার আবেদন করলেও স্বীকৃত করদাবি পরিশোধ না করায় তা খারিজ হয়ে যায়। হাইকোর্ট তার রায়ে উল্লেখ করেছেন যে, এটি কর ফাঁকি দেওয়ার একটি ধ্রুপদি উদাহরণ। গ্রামীণ কল্যাণ আইনি কোনো ভিত্তি না থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখে কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। রায়ের প্রত্যায়িত অনুলিপি পাওয়ার পর উপকর কমিশনার পাঁচটি করবর্ষের বকেয়া কর আদায়ে দ্রুত নোটিশ জারি করবেন।
এর আগে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ রিট দুটি খারিজ করে আদেশ দিয়েছিলেন। তবে বেঞ্চের দ্বিতীয় বিচারক পূর্বে সহকারী হিসেবে সরকারপক্ষে মামলাটিতে লড়েছিলেন বলে তথ্য উঠে এলে ২৯ আগস্ট রায়টি ত্রুটিপূর্ণ বিবেচনায় প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। পরবর্তীকালে প্রধান বিচারপতি গত ১৩ মে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে পাঠান। আদালতে গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফিদা এম কামাল, আবদুল্লাহ আল মামুন ও সরদার জিন্নাত আলী।
হাইকোর্টের রায়ের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে গ্রামীণ কল্যাণের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে ইতোমধ্যে আবেদন করা হয়েছে। প্রত্যায়িত অনুলিপি পাওয়ার পর লিভ টু আপিল দায়ের করা হবে। তিনি বলেন, ২০০৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যৌথ বিনিয়োগের এই লভ্যাংশ ভাগাভাগি প্রক্রিয়া কর কমিশনের অনুমোদন নিয়েই চলে আসছিল। গ্রামীণফোন লভ্যাংশ দেওয়ার সময় আগেই উৎসে কর কেটে রেখেছিল। ফলে এখন নতুন করে কর দাবি করা হলে তা দ্বৈত কর নির্ধারণ (ডাবল ট্যাক্সেশন) হয়, যা বেআইনি। এসব যুক্তিতেই তারা রিট দায়ের করেছিলেন।



























