কটিয়াদীর এক গ্রামে ৬ বছরে ৫ শিশু ‘বিক্রি’, নেপথ্যে মাদক ও দারিদ্র্য
- আপডেট সময় : ০২:৫৭:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামে গত ছয় বছরে নিজের সন্তানদের বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একাধিক বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, এই সময়ের মধ্যে অন্তত পাঁচটি শিশুকে বিক্রি করা হয়েছে, যার মধ্যে চারটি ঘটনাই ঘটেছে গত দুই বছরে। মূলত মাদকাসক্তি ও চরম দারিদ্র্যের কারণেই এসব ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ গ্রামবাসীর। তবে কয়েকজন বাবা দাবি করেছেন, তাঁরা সন্তান বিক্রি করেননি, বরং দত্তক দিয়েছেন।
সম্প্রতি গত ২ সেপ্টেম্বর এই গ্রামের ফারজানা বেগম এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। অভিযোগ উঠেছে, জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি নবজাতকটিকে বিক্রি করে দেন। এ ঘটনায় ৬ সেপ্টেম্বর ফারজানার স্বামী অটোরিকশাচালক জাকির মিয়া স্ত্রী ও স্বজনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। জাকির জানান, তিনি কিছুই জানতেন না এবং তাঁর স্ত্রী সন্তানের বিনিময়ে ৬০ হাজার টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে ফারজানা ফোনে দাবি করেছেন, তাঁর মাদকাসক্ত স্বামীই সন্তান বিক্রি করেছেন। জাকির মিয়ার মা মিনা বেগম বাড়ির উঠানে রান্না করার সময় জানান, জরাজীর্ণ টিনের ঘরে এখন কোনো নবজাতক নেই। জাকির বলেন, তাঁর তিন সন্তানের একজনও এখন তাঁর কাছে নেই। ফারজানা বাকি দুই সন্তান নিয়ে আত্মগোপনে আছেন। তবে গত ২৯ সেপ্টেম্বর কটিয়াদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানান, জাকির মিয়া তাঁর অভিযোগটি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
জাকিরের প্রতিবেশী সুমন মিয়া বলেন, “চরপুক্ষিয়া আর চরপুক্ষিয়া নাই। মাদকপুক্ষিয়া হইয়া গেছে। মাদকের কারণে সব শেষ। ঘর শেষ, বাড়ি শেষ। অহন নিজের পুতও বেছা শুরু করছে।” স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় ইয়াবা ও গাঁজার বিস্তার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় মাদক নিয়ন্ত্রণ কঠিন হচ্ছে বলে অনেকে জানান। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, মাদকের পাশাপাশি দারিদ্র্যও একটি বড় কারণ।
গ্রামের অপর বাসিন্দা জাকির মিয়া, যিনি ‘বল জাকির’ নামে পরিচিত, এবং তাঁর স্ত্রী ফেরদৌসী বেগমের বিরুদ্ধেও দুই বছর আগে তাঁদের তৃতীয় সন্তানকে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেশীদের দাবি, তাঁরা দুজনেই মাদকাসক্ত ছিলেন। এক বছর আগে ফেরদৌসী দুই সন্তান নিয়ে অন্যত্র চলে যান। বল জাকিরকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি প্রথমে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, পরে দাবি করেন নেশার টাকার জন্য নয়, সন্তানকে দত্তক দিয়েছেন। তবে কার কাছে দিয়েছেন বা সন্তানের বর্তমান খোঁজ তিনি জানেন না বলে স্বীকার করেন।
একই গ্রামের সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধেও দুই সন্তানকে টাকার বিনিময়ে অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেশী রেহেনা বেগম জানান, সাদ্দাম মাদকাসক্ত এবং গত এক দশকে তিনটি বিয়ে করেছেন। প্রথম স্ত্রীর মেয়েকে ছয় বছর আগে এবং তৃতীয় স্ত্রী সোহেনা বেগমের নবজাতক ছেলে আলহাতকে প্রায় ছয় মাস আগে বিক্রি করা হয়। সাদ্দামের ভাই প্রবাসী রাসেল মিয়া এবং মা নূর জাহান বেগমও আলহাতের কোনো খোঁজ দিতে পারেননি। নূর জাহান বলেন, প্রায় ছয় মাস ধরে সাদ্দাম নিখোঁজ। বড় নাতনিকে দত্তক দেওয়া হয়েছিল এবং তার খোঁজ জানা থাকলেও আলহাতের কোনো হদিস তাদের জানা নেই।
এছাড়া প্রায় ১০ মাস আগে আসাদ ফকির ও তাঁর স্ত্রী সোমা আক্তার তাঁদের সদ্যোজাত সন্তানকে বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আসাদ অবশ্য দাবি করেন, প্রতিবেশী কুতুব মিয়ার মাধ্যমে তিনি তাঁর সন্তানকে এক প্রবাসী পরিবারে দত্তক দিয়েছেন, কোনো টাকা নেননি। কুতুব মিয়াও জানান, তাঁর মেয়ে শিশুটিকে দত্তক নিয়েছেন এবং কোনো লেনদেন হয়নি।
এসব ঘটনার কোনোটিরই জন্মনিবন্ধন বা দালিলিক প্রমাণ মেলেনি। কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামিমা আফরোজ জানিয়েছেন, শিশু বিক্রির অভিযোগগুলো তাঁরা খতিয়ে দেখছেন। জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, মা-বাবা আগ্রহী হলে শিশুদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। কটিয়াদী থানার নতুন ওসি রফিকুল ইসলাম জানান, দারিদ্র্য ও অসচেতনতার কারণেই মূলত এসব দত্তক বা বিক্রির ঘটনা ঘটছে। স্থানীয় পঞ্চন মিয়ার রুটির দোকানে বসে প্রবীণ আবু কালাম বলেন, সন্তান বিক্রি করে টাকা পাওয়ার লোভ থেকেই অনেকে এই কাজটিকে স্বভাবে পরিণত করছেন।
























