জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাড়ছে পরিবহন ভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয়
- আপডেট সময় : ০৭:৩৫:২৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

দেশে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পর পরিবহন খাতে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। রাজধানীর গাবতলীসহ বিভিন্ন বাস টার্মিনালে দূরত্বভেদে ভাড়া ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়াও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে শুধু পরিবহন ভাড়াই বাড়বে না, বরং কৃষি উৎপাদন খরচ, কারখানার পণ্য সরবরাহ ব্যয় এবং সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধি পাবে, যা সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষকে চরম সংকটে ফেলবে।
গত রোববার সরকার লোকসান কমানোর কথা বলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর আগে গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের মূল্য লিটারপ্রতি ১৫ টাকা, পেট্রল ১৯ টাকা, অকটেন ২০ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। পরবর্তীতে জুনে পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে দাম বাড়ায় দেশে মূল্য সমন্বয় ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। তবে সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম ২.১১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ ডলারে নেমেছে, যা গত ১৫ সেপ্টেম্বর ছিল ১০৯ ডলার। জ্বালানি বিভাগের দাবি, বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে ২০৫ টাকা খরচ হওয়ায় দাম বাড়ানোর পরও লিটারে ৭০ টাকা লোকসান হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। বাসভাড়া, চাল বা সবজির দাম কিংবা রান্নার খরচ বৃদ্ধি নিম্ন আয়ের মানুষের মাসিক বাজেটে বড় চাপ তৈরি করবে। বিশেষ করে শহরের শ্রমজীবী মানুষ, ডিজেলনির্ভর সেচ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল কৃষক এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন। সরকারের হিসাব সহজ হলেও এর ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বৈষম্য আরও বাড়বে।
এদিকে পরিবহন ভাড়া পুনর্নির্ধারণে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বৈঠক করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং নগর পরিবহনে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সড়ক মন্ত্রণালয় থেকে আসতে পারে। বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান জি আর শহীদ জানান, লোকসান এড়াতে বাসমালিকেরা সাময়িকভাবে বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন এবং দ্রুতই নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করা হবে। গাবতলী টার্মিনালে মাগুরাগামী যাত্রী মো. রমজান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আগের দিন ৫০০ টাকায় ঢাকা এলেও আজ ১০০ টাকা বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে।
পণ্য পরিবহনেও খরচ বাড়ার চিত্র স্পষ্ট। কুষ্টিয়ার এক চালকলমালিক জানান, ২৬৫ বস্তা চাল ঢাকায় পাঠাতে আগে ২০ হাজার টাকা ট্রাকভাড়া লাগলেও এখন তা ২২ হাজার টাকা হয়েছে। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের আড়তদার নুরুল ইসলাম জানান, কুষ্টিয়া থেকে এক ট্রাক পণ্য আনতে আগে যেখানে ৩২ হাজার টাকা লাগতো, এখন তা ৪০ হাজার টাকা চাওয়া হচ্ছে। সাতক্ষীরা থেকে পণ্য নিয়ে আসা ট্রাকচালক মোহাম্মদ নাজমুস জামান জানান, তাঁর আসা-যাওয়ায় ২২৩ লিটার ডিজেল লাগে, যার জন্য এখন অতিরিক্ত ৪,৬০০ টাকা খরচ হবে। বেনাপোলের অর্পা-অপ্সরা ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির স্বত্বাধিকারী হাফিজুর রহমান জানান, বেনাপোল থেকে কাঁচপুরে কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া ১৮-১৯ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২২ হাজার টাকা হয়েছে।
দেশে জ্বালানি তেলের সিংহভাগ ব্যবহৃত হয় ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রে, যার সংখ্যা প্রায় ১৩ থেকে ১৫ লাখ। কৃষি খাতের ১৫ শতাংশ চাহিদা ডিজেল দিয়েই মেটানো হয়। ফলে ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ খরচ ও জেনারেটর চালানোর ব্যয় বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই বর্তাবে। ২০২২ সালের আগস্টে ডিজেলের দাম এক লাফে সাড়ে ৪২ শতাংশ বাড়ানোর পর মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশে উঠেছিল। বর্তমানেও মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবস্থার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বর্তমানে পরিশোধিত জ্বালানি তেল থেকে ২৫ শতাংশ এবং অপরিশোধিত তেল থেকে সাড়ে ২৭ শতাংশ শুল্ক-কর আদায় করে। বিপিসি সূত্র জানায়, বর্তমানে আমদানিকৃত প্রতি লিটার ডিজেলে সরকার ৩৮ টাকা শুল্ক পাচ্ছে। এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক মনে করেন, কেবল দাম বাড়ানোই সমাধান নয়। জ্বালানি সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থার অপচয় এবং সিস্টেম লস কমাতে পারলে ব্যয় কমানো সম্ভব। দক্ষতা না বাড়িয়ে দাম বাড়ানো সহজ পথ হলেও এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।
তাঁর হিসাবে, সাতক্ষীরা থেকে চট্টগ্রাম এসে আবার ফিরে যেতে প্রায় ২৩০ লিটার ডিজেল লাগে।
জনস্বার্থে এ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে ২০১৪ সালে একটি আদেশ জারি করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়।



























