ঢাকা ০৩:৫০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
টাঙ্গাইলের চিকিৎসাসেবা জিম্মি স্বাচিপের দখলে, ব্যাহত জনস্বাস্থ্য আটঘরিয়ায় প্রবাসীর স্ত্রীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার নোবিপ্রবির বাসচালককে মারধর ও লুকিং গ্লাস ভাঙচুর, গ্রেপ্তার ২ ওয়ানডেতে ১৫ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করলেন বিরাট কোহলি কলাপাড়ায় অন্তঃসত্ত্বার পেটে লাথি, নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ বিগ বস বাংলার রান্নাঘরে নন্দিনী ও রাজবীরের তীব্র বাকবিতণ্ডা নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে দুর্বৃত্তের গুলিতে ব্যবসায়ী গুলিবিদ্ধ, আহত ৩ নিয়োগপত্র না পাওয়ায় শাহবাগে প্রাথমিক শিক্ষক প্রার্থীদের বিক্ষোভ জামালগঞ্জে অতিরিক্ত টোল আদায়ের প্রতিবাদে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের মানববন্ধন মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিদর্শন: সোমবার থেকেই সেবা চালুর ঘোষণা

বাইসাইকেলে পোনা বিক্রি থেকে ১৭টি হ্যাচারির মালিক সুবর্ণচরের আজিজ

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৩:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরবাটা ইউনিয়নের চর মজিদ গ্রামের আবদুল আজিজ একসময় বাইসাইকেলের পেছনে পাতিল বেঁধে গ্রামে গ্রামে ঘুরে মাছের পোনা বিক্রি করতেন। সেই সাধারণ পোনা বিক্রেতা আজ ১৫ একর ২০ শতাংশ জমির ওপর গড়ে তুলেছেন ১৭টি বিশাল হ্যাচারি। কঠোর পরিশ্রম আর নিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি আজ বছরে এক থেকে দেড় কোটি রেণু ও পোনা উৎপাদন করছেন। খরচ বাদ দিয়ে বছরে তাঁর নিট আয় হচ্ছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। তাঁর এই অভাবনীয় সাফল্য গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখার পাশাপাশি সৃষ্টি করেছে বহু মানুষের কর্মসংস্থান।

আবদুল আজিজের এই সফলতার যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১২ সালে। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া মাত্র ২০ শতাংশ জমিতে তিনি পোনা উৎপাদন শুরু করেন। শুরুতে তাঁর বড় বাধা ছিল মূলধনের অভাব। রেণুপোনা কেনার মতো টাকা না থাকায় তিনি স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ‘সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা’ থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নেন এবং সেখান থেকে পোনা উৎপাদনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। নিজের অর্জিত আয় থেকে তিনি দুই একর জমি কেনেন এবং আরও ১৩ একর জমি লিজ নেন। খামার সম্প্রসারণের জন্য তিনি সাগরিকা উন্নয়ন সংস্থা থেকে ছয় লাখ টাকা এবং সোনালী ব্যাংক থেকে চার লাখ টাকার কৃষি ঋণ নেন।

চলতি মৌসুমে আবদুল আজিজ তাঁর খামারে প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। ইতিমধ্যে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার মাছের পোনা বিক্রি হয়ে গেছে এবং এখনো খামারে বিপুল পরিমাণ পোনা মজুত রয়েছে। মৌসুম শেষে তাঁর মোট বিক্রয়মূল্য ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে তিনি আশা করছেন। সব খরচ, জমির ভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের পর তাঁর বার্ষিক লাভ থাকে প্রায় ১০ লাখ টাকা।

সনাতন পদ্ধতিতে মাছ চাষে ঝুঁকি বেশি থাকায় সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থার মৎস্য কর্মকর্তাদের পরামর্শে আবদুল আজিজ তাঁর খামারে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেন। সম্প্রতি ওই সংস্থা থেকে তিনি ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকা মূল্যের একটি ‘অ্যারোটর মেশিন’ বা পানিতে অক্সিজেন বাড়ানোর যন্ত্র পান। প্রযুক্তির এই সুফল দেখে তিনি নিজে আরও দুই থেকে তিনটি অ্যারোটর মেশিন কেনেন। এখন পানিতে অক্সিজেনের সঠিক মাত্রা বজায় রেখে বৈজ্ঞানিক উপায়ে রেণুপোনা বড় করছেন তিনি। স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তারা নিয়মিত তাঁর খামার পরিদর্শন করে রোগবালাই দমন ও সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন।

আবদুল আজিজের এই খামার এখন এলাকার ৭০ থেকে ৭২টি পরিবারের জীবিকার উৎস। তাঁর হ্যাচারিতে বর্তমানে ১২ জন স্থায়ী শ্রমিক কাজ করছেন, যাঁদের মাসিক বেতন ৯ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। এ ছাড়া ৬০ জন পোনা বিক্রেতা ও মাছ ব্যবসায়ী তাঁর কাছ থেকে পোনা নিয়ে গ্রামে গ্রামে বিক্রি করে সংসার চালান। পোনা বিক্রেতা মো. জায়েদ জানান, আগে তাঁদের ময়মনসিংহসহ উত্তরাঞ্চল থেকে পোনা আনতে হতো, যার অর্ধেক পথেই নষ্ট হয়ে যেত। এখন স্থানীয়ভাবে ভালো মানের পোনা পাওয়ায় তাঁদের ঝুঁকি কমেছে এবং আয় বেড়েছে।

সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থার মৎস্য কর্মকর্তা মো. শহিদুল আলম বলেন, ভালো পোনা মানেই ভালো মাছ উৎপাদন। প্রান্তিক পর্যায়ের চাষিদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ মৎস্য খাতে বড় অগ্রগতি আনছে। মৎস্য খাতে বিশেষ অবদান, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও স্বাবলম্বী হওয়ার স্বীকৃতি হিসেবে আবদুল আজিজ ২০২২ সালে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ মৎস্যচাষি সম্মাননা পান। এরপর ২০২৫ সালে তিনি জাতীয় মৎস্য পুরস্কার পদকে ভূষিত হন। এ ছাড়া পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) থেকেও তিনি জাতীয় সম্মাননা স্মারক অর্জন করেছেন।

তাঁর এই সাফল্য দেখে চরবাটা ইউনিয়ন ও আশপাশের এলাকার অনেক বেকার যুবক এখন বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। তবে খামার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে শুষ্ক বা খরা মৌসুমে এলাকায় তীব্র পানির সংকট দেখা দেয় বলে জানান আবদুল আজিজ। এই সংকট মোকাবিলায় তিনি সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

বাইসাইকেলে পোনা বিক্রি থেকে ১৭টি হ্যাচারির মালিক সুবর্ণচরের আজিজ

আপডেট সময় : ০৯:৪৩:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরবাটা ইউনিয়নের চর মজিদ গ্রামের আবদুল আজিজ একসময় বাইসাইকেলের পেছনে পাতিল বেঁধে গ্রামে গ্রামে ঘুরে মাছের পোনা বিক্রি করতেন। সেই সাধারণ পোনা বিক্রেতা আজ ১৫ একর ২০ শতাংশ জমির ওপর গড়ে তুলেছেন ১৭টি বিশাল হ্যাচারি। কঠোর পরিশ্রম আর নিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি আজ বছরে এক থেকে দেড় কোটি রেণু ও পোনা উৎপাদন করছেন। খরচ বাদ দিয়ে বছরে তাঁর নিট আয় হচ্ছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। তাঁর এই অভাবনীয় সাফল্য গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখার পাশাপাশি সৃষ্টি করেছে বহু মানুষের কর্মসংস্থান।

আবদুল আজিজের এই সফলতার যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১২ সালে। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া মাত্র ২০ শতাংশ জমিতে তিনি পোনা উৎপাদন শুরু করেন। শুরুতে তাঁর বড় বাধা ছিল মূলধনের অভাব। রেণুপোনা কেনার মতো টাকা না থাকায় তিনি স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ‘সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা’ থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নেন এবং সেখান থেকে পোনা উৎপাদনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। নিজের অর্জিত আয় থেকে তিনি দুই একর জমি কেনেন এবং আরও ১৩ একর জমি লিজ নেন। খামার সম্প্রসারণের জন্য তিনি সাগরিকা উন্নয়ন সংস্থা থেকে ছয় লাখ টাকা এবং সোনালী ব্যাংক থেকে চার লাখ টাকার কৃষি ঋণ নেন।

চলতি মৌসুমে আবদুল আজিজ তাঁর খামারে প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। ইতিমধ্যে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার মাছের পোনা বিক্রি হয়ে গেছে এবং এখনো খামারে বিপুল পরিমাণ পোনা মজুত রয়েছে। মৌসুম শেষে তাঁর মোট বিক্রয়মূল্য ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে তিনি আশা করছেন। সব খরচ, জমির ভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের পর তাঁর বার্ষিক লাভ থাকে প্রায় ১০ লাখ টাকা।

সনাতন পদ্ধতিতে মাছ চাষে ঝুঁকি বেশি থাকায় সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থার মৎস্য কর্মকর্তাদের পরামর্শে আবদুল আজিজ তাঁর খামারে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেন। সম্প্রতি ওই সংস্থা থেকে তিনি ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকা মূল্যের একটি ‘অ্যারোটর মেশিন’ বা পানিতে অক্সিজেন বাড়ানোর যন্ত্র পান। প্রযুক্তির এই সুফল দেখে তিনি নিজে আরও দুই থেকে তিনটি অ্যারোটর মেশিন কেনেন। এখন পানিতে অক্সিজেনের সঠিক মাত্রা বজায় রেখে বৈজ্ঞানিক উপায়ে রেণুপোনা বড় করছেন তিনি। স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তারা নিয়মিত তাঁর খামার পরিদর্শন করে রোগবালাই দমন ও সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন।

আবদুল আজিজের এই খামার এখন এলাকার ৭০ থেকে ৭২টি পরিবারের জীবিকার উৎস। তাঁর হ্যাচারিতে বর্তমানে ১২ জন স্থায়ী শ্রমিক কাজ করছেন, যাঁদের মাসিক বেতন ৯ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। এ ছাড়া ৬০ জন পোনা বিক্রেতা ও মাছ ব্যবসায়ী তাঁর কাছ থেকে পোনা নিয়ে গ্রামে গ্রামে বিক্রি করে সংসার চালান। পোনা বিক্রেতা মো. জায়েদ জানান, আগে তাঁদের ময়মনসিংহসহ উত্তরাঞ্চল থেকে পোনা আনতে হতো, যার অর্ধেক পথেই নষ্ট হয়ে যেত। এখন স্থানীয়ভাবে ভালো মানের পোনা পাওয়ায় তাঁদের ঝুঁকি কমেছে এবং আয় বেড়েছে।

সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থার মৎস্য কর্মকর্তা মো. শহিদুল আলম বলেন, ভালো পোনা মানেই ভালো মাছ উৎপাদন। প্রান্তিক পর্যায়ের চাষিদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ মৎস্য খাতে বড় অগ্রগতি আনছে। মৎস্য খাতে বিশেষ অবদান, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও স্বাবলম্বী হওয়ার স্বীকৃতি হিসেবে আবদুল আজিজ ২০২২ সালে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ মৎস্যচাষি সম্মাননা পান। এরপর ২০২৫ সালে তিনি জাতীয় মৎস্য পুরস্কার পদকে ভূষিত হন। এ ছাড়া পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) থেকেও তিনি জাতীয় সম্মাননা স্মারক অর্জন করেছেন।

তাঁর এই সাফল্য দেখে চরবাটা ইউনিয়ন ও আশপাশের এলাকার অনেক বেকার যুবক এখন বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। তবে খামার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে শুষ্ক বা খরা মৌসুমে এলাকায় তীব্র পানির সংকট দেখা দেয় বলে জানান আবদুল আজিজ। এই সংকট মোকাবিলায় তিনি সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo