সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে মৃত্যু: বেঁচে ফিরেও আতঙ্ক
- আপডেট সময় : ১০:৩১:৫৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে জাহাজ কাটার সময় ‘বিষাক্ত গ্যাসে’ আক্রান্ত হয়ে ১০ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার দিন কারখানায় কাটারম্যান সহকারী হিসেবে কর্মরত ৩২ বছর বয়সী দীপু দাশ সেই ভয়াবহ স্মৃতি এখনো ভুলতে পারছেন না। ১৪ আগস্টের ওই দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই ৯ জন এবং পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বুধবার আরও একজন শ্রমিক মারা যান। ঘটনার সময় দীপুও ওই কারখানায় কর্মরত ছিলেন।
দুর্ঘটনার বর্ণনা দিয়ে দীপু দাশ জানান, সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার দিকে তাঁরা মোট সাতজন (চারজন কাটারম্যান ও তিনজন হেলপার) জাহাজটির ভেতরে কাজ শুরু করেন। তাঁদের দলের বাইরে ফোরম্যান ও সেফটি অফিসারসহ আরও পাঁচজন ছিলেন। তাঁরা তিন ভাগে কাজ করছিলেন। দীপু ও তাঁর ওস্তাদ পলাশ দাশ ঘটনাস্থল থেকে ১০ ফুট ওপরে কাজ করছিলেন। ব্যালাস্ট ট্যাংকের পানি নিষ্কাশনের জন্য ছিদ্র করার পর নাসির ওস্তাদ এবং তাঁর ভাই মনসুর ফোরম্যান ট্যাংকের কাছে যান। ছিদ্রের মুখ খুলতেই নাসির ও মনসুর অচেতন হয়ে পড়ে যান। তাঁদের উদ্ধারের জন্য যে-ই এগিয়ে যাচ্ছে, সেই গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে অচেতন হয়ে পড়ছে। দীপু জানান, তাঁর ওস্তাদ পলাশ দাশ সানি দাশকে উদ্ধার করতে দ্রুত নিচে নামলে তিনিও আক্রান্ত হন। দীপু পেছন পেছন দৌড়ে গিয়ে ওস্তাদের পোশাক ধরে টান দিতেই নাকে বিদঘুটে গন্ধ পান এবং মাথা ঝিম ধরে যায়। তিনি সামনে না এগিয়ে ওপরে উঠে চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘এখানে অনেক লোক মারা গেছে, সবাই দ্রুত আসেন।’
দীপুর চিৎকার শুনে চারপাশ থেকে লোকজন ছুটে আসেন এবং ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। দীপু ঘটনাস্থল দেখানোর জন্য আবার ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করলে মাথা ঘুরে পড়ে যান। পরে স্থানীয়রা তাঁকে এ কে খান এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়। বেলা ২টার দিকে কিছুটা স্বাভাবিক হলে তিনি বাড়ি ফেরেন। পরে প্রতিবেশী নাসির, মনসুর, সানি এবং ওস্তাদ পলাশ দাশের মৃত্যুর খবর শুনে তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং নগরের আরেকটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। গত সোমবার তিনি হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়ে বাড়ি ফিরেছেন, তবে এখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি। সহকর্মীদের মৃত্যুর দৃশ্য তাঁর চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে এবং তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।
কারখানার মাত্র ৫০ মিটার দূরে টিনশেডের ছোট্ট ঘরে স্ত্রী পূর্ণিমা দাশ ও দেড় বছরের ছেলে ঋষি দাশকে নিয়ে দীপুর সংসার। স্ত্রী পূর্ণিমা জানান, দুর্ঘটনার পর চার দিন হাসপাতালে দৌড়াদৌড়িতে তাঁদের হাতে থাকা সব টাকা শেষ হয়ে গেছে। কারখানা কর্তৃপক্ষ চিকিৎসার খরচ দিলেও এর বাইরে কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ বা আর্থিক সহায়তা তাঁরা পাননি। এমনকি দীপুর বকেয়া বেতনও পরিশোধ করা হয়নি। চিকিৎসক ডাবসহ বিভিন্ন পথ্য খেতে বললেও টাকার অভাবে তা কিনতে পারছেন না তাঁরা।
কারখানার কাটারম্যান সুলতান আহাম্মদ জানান, ওই ২ নম্বর ট্যাংকটি কাটার কথা ছিল তাঁর। শুক্রবার হওয়ায় তিনি কাজে যাননি। তিনি জানান, এক মাস আগেও একই কারখানায় ১ নম্বর ট্যাংক কাটার সময় তিনিসহ তিনজন শ্রমিক গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়েছিলেন। সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম জানিয়েছেন, আগামী রোববার হতাহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ ও বকেয়া বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা করা হবে এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গত সোমবার আমাকে সেখান থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।’ঘণ্টায় ৬০ টাকা মজুরিতে কাজ করতেন দীপু।
প্রতি মাসের ৫ ও ২০ তারিখ তাঁদের মজুরি দেওয়া হতো।























