গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত শিল্প খাত, কমছে উৎপাদন ও বাড়ছে লোকসান
- আপডেট সময় : ০৪:৫৪:৪৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

দেশের শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। জ্বালানির ভয়াবহ সংকটে কারখানাগুলোর স্বাভাবিক উৎপাদন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় বিশ্ববাজারে ক্রেতা ও ক্রয়াদেশ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তারা। পরিস্থিতি সামাল দিতে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে শ্রমিকদের কাজের সময় বাড়াতে হচ্ছে, যা তাদের জীবনযাত্রায় চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে।
সাভার, গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন কারখানার মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আট ঘণ্টার ডিউটি করতে এসে শ্রমিকদের ১২ ঘণ্টার বেশি সময় কারখানায় কাটাতে হচ্ছে। কাজ হারানোর আশঙ্কায় অনেকে মুখ খুলছেন না। কোনো কোনো কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ এড়াতে পরিচ্ছন্নতা ও মেরামতের অজুহাতে শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হচ্ছে। বস্ত্র ও পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা জানান, গ্যাস ও বিদ্যুতের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় অধিকাংশ কারখানা ধুঁকে ধুঁকে চলছে। জেনারেটর দিয়ে পুরো কারখানা চালানো সম্ভব হচ্ছে না, ফলে শ্রমিকদের অলস বসে থাকতে হচ্ছে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর ডাইং কারখানাগুলোর অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। কাঙ্ক্ষিত গ্যাস না পেয়ে কেমিক্যালমিশ্রিত লাখ লাখ মিটার কাপড় নষ্ট হচ্ছে। জেনারেটর চালাতে একেকটি কারখানাকে প্রতি মাসে গড়ে ৩ থেকে ১০ কোটি টাকার বাড়তি ডিজেল কিনতে হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে লোকসানের মুখে ফেলছে।
গাজীপুরের সাদামা ফ্যাশনওয়্যারের মহাব্যবস্থাপক মঈনুল ইসলাম জানান, ডাইং কারখানায় নির্দিষ্ট মাত্রার গ্যাস চাপ প্রয়োজন হলেও দিন-রাত চাপ ১ পিএসআইয়ের কম থাকছে। ফলে এক সপ্তাহ ধরে তাদের ডাইং ইউনিট বন্ধ রয়েছে। গ্যাস সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ক্রয়াদেশ বাতিল হতে পারে। ভবানীপুরের মোশাররফ কম্পোজিট টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশাররফ হোসেন জানান, গ্যাস সংকটে সুতা উৎপাদনের অধিকাংশ মেশিন বন্ধ থাকায় সক্ষমতার মাত্র ৩০-৩৫ শতাংশ উৎপাদন হচ্ছে। এই সামান্য উৎপাদন দিয়ে শ্রমিকের বেতন ও ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করে টিকে থাকা অসম্ভব।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, রাশিয়া-ইউক্রেন ও আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি চাপে থাকায় ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা ও ক্রয়াদেশ কমছে। এর মধ্যে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ৩০-৩৫ শতাংশ কম হচ্ছে। উৎপাদন সচল রাখতে কাজের সময় ৯-১০ ঘণ্টা থেকে বাড়িয়ে ১২-১৩ ঘণ্টা করা হচ্ছে, যা তাদের নন-কমপ্লায়েন্ট করে তুলছে এবং খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ডাইং, নিটিং ও ফিনিশিং কারখানাগুলোর উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থান কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সম্প্রতি মোট সরবরাহ ১৭৩ কোটি ঘনফুটে নেমে যাওয়ার পর তা ২৪৪ কোটিতে উঠলেও আবার কমে ২১৮ কোটি ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে অগ্রাধিকার দেওয়ায় শিল্পে সরবরাহ আরও কমেছে। নরসিংদীর মাধবদী, চৌয়ালাসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকটে শত শত কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। বিকল্প হিসেবে কাঠ পুড়িয়ে বয়লার চালাতে দৈনিক ১০ হাজার টাকার বেশি বাড়তি খরচ হচ্ছে। নরসিংদীতে প্রতিদিন কয়েকশ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে এবং কোথাও উৎপাদন ১০ শতাংশে নেমে এসেছে।
রাজধানীর রামপুরার পোশাকশ্রমিক ফাতেমা জানান, বাড়তি সময় কাজ করলেও অতিরিক্ত টাকা দেওয়া হয় না, তবে চাকরি হারানোর ভয়ে তারা মুখ খোলেন না। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকার চিত্রও একই। ফতুল্লা ডাইং অ্যান্ড ক্যালেন্ডারিং কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, মেশিনগুলো বন্ধ এবং সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। শ্রমিকরা হাজিরা দিয়েই চলে গেছেন।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫২টি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১১,৯৩৪ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার মধ্যে গ্যাসের অভাবে ২১টি পুরোপুরি বন্ধ এবং ৮টি আংশিক সচল রয়েছে। এগুলো সচল থাকলে গ্রিডে আরও ৬,৩১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হতো। ঘাটতি মেটাতে আগস্টে প্রতিদিন গড়ে ২,০০০ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হচ্ছে, যা গত ১০ আগস্ট মধ্যরাতের পর রেকর্ড ৩,৭০০ মেগাওয়াটে পৌঁছায়।




























