বাংলাদেশের বিতর্কিত রাষ্ট্রপতিদের ইতিহাস: মোশতাক থেকে সাহাবুদ্দিন
- আপডেট সময় : ০৬:০১:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবন একই সঙ্গে গৌরব, বিতর্ক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ইতিহাস বহন করে আসছে। দেশের ক্ষমতার পালাবদল, সংবিধানের বিবর্তন, সামরিক শাসন এবং গণতন্ত্রের উত্থান-পতনের এক জীবন্ত দলিল এটি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকারী ২২ জন রাষ্ট্রপতির মধ্যে মাত্র চারজন তাদের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পেরেছেন। বাকি ১৭ জনের মধ্যে কেউ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন, আবার কেউ ক্ষমতায় থাকাকালে মারা গেছেন। তবে সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত কে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি জড়িত থাকায় নিরপেক্ষ মূল্যায়ন বেশ কঠিন।
দেশের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত রাষ্ট্রপতির তালিকায় রয়েছেন সদ্য পদত্যাগ করা ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। শুরুতেই তার নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, কারণ তিনি মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দ্বৈত নাগরিক ছিলেন। এমন নাগরিকত্ব থাকা কোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেওয়া সংবিধানসম্মত ছিল না বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচার, বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলমের স্বার্থরক্ষা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে দায়িত্ব পালনকালে দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত অনেক ব্যবসায়ীর ফাইল গায়েব করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্তে তাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়। দায়িত্ব পালনকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগ নিয়ে দেওয়া বক্তব্যসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মন্তব্যের কারণে তিনি ব্যাপক সমালোচিত হন এবং শেষ পর্যন্ত শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গত শুক্রবার পদত্যাগ করেন।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বিতর্কিত ও কলঙ্কিত রাষ্ট্রপতি হলেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। দলটির দাবি, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পেছনে তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল। ক্ষমতায় আরোহণের পর তিনি খুনিদের আইনি সুরক্ষা দিতে বিতর্কিত ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করেন, যার ফলে দীর্ঘ সময় ধরে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া আটকে ছিল।
১৯৮২ সালে ক্ষমতা নেওয়া তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নামের সঙ্গে স্বৈরশাসক শব্দটি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। দীর্ঘ সামরিক শাসনের প্রতীক এরশাদের বিরুদ্ধে সামরিক আইন জারি, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দমন, প্রশাসন ও নির্বাচন ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডেও তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। ১৯৯০ সালে গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা হারিয়ে তিনি কারাবন্দি হন। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসন টিকিয়ে রাখতে তার বড় ভূমিকা ছিল এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণে তিনি এক ধরনের কৌতুকপূর্ণ চরিত্রে পরিণত হন।
২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা এই রাষ্ট্রপতির বিতর্কিত ভূমিকা ২০০৬-২০০৭ সালের রাজনৈতিক সংকটের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী ছিল। তার বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে দেশে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ বা ১১ জানুয়ারির জরুরি অবস্থা তৈরি হয়, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে ব্যাহত করে এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায় হিসেবে পরিচিতি পায়।
অন্যদিকে, ২০০১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী দলীয় বিরোধের জেরে মাত্র কয়েক মাসের মাথায় পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। বিএনপির একটি অংশ অভিযোগ তোলে যে, তিনি দলের প্রত্যাশা অনুযায়ী আচরণ করেননি। বিশেষ করে জিয়াউর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধা জানাতে না যাওয়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক বিরোধের জেরে শেষ পর্যন্ত তাকে বিদায় নিতে হয়।




























