ঢাকা ০৯:৪৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সুনামগঞ্জের যেসব এলাকায় আজ ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না সাগরে ইলিশের আকাল, চট্টগ্রামের জেলেদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ হিমাগারের অভাবে পিরোজপুরে প্রতি বছর নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার পেয়ারা গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকটে অচল নরসিংদীর শিল্পকারখানা, দৈনিক কোটি টাকার ক্ষতি পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বাহিনী ও সেটেলারদের তাণ্ডব, আহত ও গ্রেপ্তার বহু বিশ্বে প্রথম এমআরএনএ ফ্লু টিকা অনুমোদন পেল মডার্নার প্রস্তুতি ম্যাচে ব্যাটিং বিপর্যয়, ৫৪ রানে অলআউট বাংলাদেশ ডিজিএফআইয়ের জেআইসি পরিদর্শনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শাহজালাল বিমানবন্দরের বলাকা লাউঞ্জে মধ্যরাতে আগুন, সেবা সাময়িক বন্ধ বৃক্ষমেলা নাম দিয়ে বাহাদুর শাহ পার্কে শাড়ি-গয়না আর খাবারের বাজার

বৃক্ষমেলা নাম দিয়ে বাহাদুর শাহ পার্কে শাড়ি-গয়না আর খাবারের বাজার

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:০৪:৩৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
print news

পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্কের ভেতরে ঢুকতেই এখন চোখে পড়ে লাল, নীল ও সাদা ত্রিপলের ছাউনি। বড় বড় গাছের গায়ে ও পাশে বাঁশ বেঁধে তৈরি করা হয়েছে সারি সারি দোকান। কোথাও ঝুলছে রঙিন হাতপাখা, কোথাও থালাবাসন, আবার কোথাও শিশুদের খেলনার পসরা। একটু সামনে এগোলে কৃত্রিম ফুল, নারীদের গয়না, চুড়ি আর ঘর সাজানোর সামগ্রীর সমাহার। এর পাশেই রয়েছে কাবাব, মমো, পানিপুরি, আইসগোলা, লাইভ রোলার আইসক্রিম ও ডাবের পুডিংয়ের মতো হরেক রকমের খাবারের আয়োজন। বড় বড় দোকানে সাজানো রয়েছে মিষ্টি, মুরালি, সন্দেশ ও জিলাপি। বাদ যায়নি জামাকাপড় ও শাড়ির দোকানও। দুটি বক্সিং যন্ত্র ঘিরে ভিড় করছে কিশোর-তরুণরা। এক পাশে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে রীতিমতো খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। প্রথম দেখায় এটি পার্ক নাকি কোনো বাণিজ্যিক মেলা, তা বোঝা কঠিন। অথচ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এই জায়গায় অনুমতি দিয়েছিল ‘বৃক্ষমেলা’ করার জন্য।

ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাদের ১০ দিনের জন্য ‘সবুজ আনন্দ মেলা ২০২৬’ আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ৬ থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত এই মেলা চলার কথা। অনুমতির উদ্দেশ্য বৃক্ষমেলা হলেও সরেজমিনে সেখানে বৃক্ষমেলা-সংশ্লিষ্ট মাত্র একটি দোকান দেখা গেছে। মেলার দেখভালের দায়িত্বে থাকা আজিমপুরের বাসিন্দা মো. রনি জানান, পার্কের ভেতরে ৬০টি দোকান বসানোর অনুমতি নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে এখন পর্যন্ত ৩৩টি দোকান বসেছে। বাইরে দোকান বসালে ঝামেলা হয় বলেই পার্কের ভেতরে এগুলো বসানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেলায় অংশ নেওয়া প্রতিটি দোকানের জন্য দৈনিক তিন হাজার টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। বর্তমানে চালু থাকা ৩৩টি দোকান থেকে দিনে আদায় হচ্ছে ৯৯ হাজার টাকা। ১০ দিন ধরে এই পরিমাণ দোকান থাকলে ভাড়ার অঙ্ক দাঁড়াবে ৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা। আর অনুমোদিত ৬০টি দোকানই যদি বসে, তবে ১০ দিনে ভাড়ার পরিমাণ দাঁড়াবে ১৮ লাখ টাকা। সরকারি পার্ক ব্যবহার করে আদায় করা এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং কোন ভিত্তিতে এই ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাদের বৃক্ষমেলা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি করপোরেশনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও জানেন।

ছাত্রদল সূত্র জানায়, সংগঠনটির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক তামজিদ ইমাম ও সদস্য সাদমান সাম্য এই অনুমতি নিয়েছেন। বৃক্ষমেলার নামে অন্যান্য দোকান বসানো প্রসঙ্গে সাদমান সাম্য বলেন, যথাসময়ে সিটি করপোরেশনের অনুমতি না পাওয়ায় বৃক্ষ নিয়ে কাজ করেন এমন সবাইকে আনা সম্ভব হয়নি। মেলায় মানুষকে আকৃষ্ট করতেই গাছের পাশাপাশি খাবার ও প্রসাধনীসহ বিভিন্ন সামগ্রীর দোকান রাখা হয়েছে। তবে মানুষের হাঁটাচলা ও ব্যায়ামের জায়গায় কোনো দোকান বসানো হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, ‘আমরা বৃক্ষমেলা করার জন্য অনুমতি দিয়েছি। এর বাইরে কিছু করলে মেলার অনুমতি বাতিল করে সব তুলে দেওয়া হবে।’

পার্কে নিয়মিত হাঁটতে আসা তাসলিমা জাহান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পুরান ঢাকায় খোলা জায়গা এমনিতেই নেই। এই ছোট পার্কটুকু মানুষ হাঁটা, বসা ও একটু স্বস্তির জন্য ব্যবহার করে। এখন এখানেও যদি বাঁশ গেড়ে বাজার বসানো হয়, তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? ১০ দিনের কথা বলে আজ একজনকে দিলে কাল আরেকজন চাইবে। পার্ক রক্ষা করার দায়িত্ব যাদের, তারাই যদি দোকান বসানোর অনুমতি দেয়, তাহলে দখলদারকে ঠেকাবে কে?’ পার্কের বাইরের এক দোকানি বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘কে ঠেকাইবে, কে বলবে, যে বলবে তারে তো দিবে মাইর। এই আওয়ামী লীগ, এই বিএনপি, সবই এক।’

বাহাদুর শাহ পার্ককে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে পার্কের জায়গা ইজারা দিয়ে খাবারের দোকান চালুর সুযোগ দিয়েছিল ডিএসসিসি। সে সময় গণমাধ্যমে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সংগঠন আন্দোলনে নামে। ঐতিহাসিক পার্ককে বাণিজ্যিকীকরণের প্রতিবাদে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়। তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত সেই ইজারা বাতিল করে খাবারের দোকান সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছরের মাথায় আবারও নাম বদলে ‘বৃক্ষমেলা’র মোড়কে পার্কটিতে দোকানের সারি বসানো হলো।

ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্ক পুরান ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান, যা একসময় ‘আন্টাঘর’ নামে পরিচিত ছিল। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের স্মৃতিবিজড়িত এই পার্কটির নাম ব্রিটিশ আমলে ছিল ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’। পরে শেষ মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহর নামে এর নামকরণ করা হয়। চারপাশে ঘনবসতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক এলাকা থাকায় এই পার্কটি স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন হাঁটা ও বিশ্রামের একমাত্র উন্মুক্ত স্থান।

ঢাকায় মাঠ ও পার্কের তীব্র সংকটের বিষয়টি সরকারি-বেসরকারি গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে। দুই সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪১টিতে কোনো খেলার মাঠ নেই, যার মধ্যে ঢাকা দক্ষিণেরই রয়েছে ৩১টি। অথচ গত জুলাই মাসে জাতীয় সংসদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, খেলার মাঠ ও ফুটপাত থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদে সরকার বদ্ধপরিকর এবং ঢাকার অধিকাংশ পার্ক ও মাঠ ইতিমধ্যে দখলমুক্ত করা হয়েছে। এই ঘোষণার সঙ্গে বাহাদুর শাহ পার্কের বর্তমান চিত্রের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে নগর-পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, পার্ক কোনো বাণিজ্যিক মেলার মাঠ নয়। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে প্রতিটি পার্ক ও মাঠ নাগরিকদের জন্য সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। সাময়িক অনুমতির নামে দোকান বসানোর এই সংস্কৃতি পরে নিয়মে পরিণত হয়। পার্ক এবং খেলার মাঠ যাতে অন্য কোনো বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার না হয়, সেদিকে কঠোর দৃষ্টি দিতে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

বৃক্ষমেলা নাম দিয়ে বাহাদুর শাহ পার্কে শাড়ি-গয়না আর খাবারের বাজার

আপডেট সময় : ০৯:০৪:৩৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬
print news

পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্কের ভেতরে ঢুকতেই এখন চোখে পড়ে লাল, নীল ও সাদা ত্রিপলের ছাউনি। বড় বড় গাছের গায়ে ও পাশে বাঁশ বেঁধে তৈরি করা হয়েছে সারি সারি দোকান। কোথাও ঝুলছে রঙিন হাতপাখা, কোথাও থালাবাসন, আবার কোথাও শিশুদের খেলনার পসরা। একটু সামনে এগোলে কৃত্রিম ফুল, নারীদের গয়না, চুড়ি আর ঘর সাজানোর সামগ্রীর সমাহার। এর পাশেই রয়েছে কাবাব, মমো, পানিপুরি, আইসগোলা, লাইভ রোলার আইসক্রিম ও ডাবের পুডিংয়ের মতো হরেক রকমের খাবারের আয়োজন। বড় বড় দোকানে সাজানো রয়েছে মিষ্টি, মুরালি, সন্দেশ ও জিলাপি। বাদ যায়নি জামাকাপড় ও শাড়ির দোকানও। দুটি বক্সিং যন্ত্র ঘিরে ভিড় করছে কিশোর-তরুণরা। এক পাশে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে রীতিমতো খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। প্রথম দেখায় এটি পার্ক নাকি কোনো বাণিজ্যিক মেলা, তা বোঝা কঠিন। অথচ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এই জায়গায় অনুমতি দিয়েছিল ‘বৃক্ষমেলা’ করার জন্য।

ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাদের ১০ দিনের জন্য ‘সবুজ আনন্দ মেলা ২০২৬’ আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ৬ থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত এই মেলা চলার কথা। অনুমতির উদ্দেশ্য বৃক্ষমেলা হলেও সরেজমিনে সেখানে বৃক্ষমেলা-সংশ্লিষ্ট মাত্র একটি দোকান দেখা গেছে। মেলার দেখভালের দায়িত্বে থাকা আজিমপুরের বাসিন্দা মো. রনি জানান, পার্কের ভেতরে ৬০টি দোকান বসানোর অনুমতি নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে এখন পর্যন্ত ৩৩টি দোকান বসেছে। বাইরে দোকান বসালে ঝামেলা হয় বলেই পার্কের ভেতরে এগুলো বসানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেলায় অংশ নেওয়া প্রতিটি দোকানের জন্য দৈনিক তিন হাজার টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। বর্তমানে চালু থাকা ৩৩টি দোকান থেকে দিনে আদায় হচ্ছে ৯৯ হাজার টাকা। ১০ দিন ধরে এই পরিমাণ দোকান থাকলে ভাড়ার অঙ্ক দাঁড়াবে ৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা। আর অনুমোদিত ৬০টি দোকানই যদি বসে, তবে ১০ দিনে ভাড়ার পরিমাণ দাঁড়াবে ১৮ লাখ টাকা। সরকারি পার্ক ব্যবহার করে আদায় করা এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং কোন ভিত্তিতে এই ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাদের বৃক্ষমেলা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি করপোরেশনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও জানেন।

ছাত্রদল সূত্র জানায়, সংগঠনটির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক তামজিদ ইমাম ও সদস্য সাদমান সাম্য এই অনুমতি নিয়েছেন। বৃক্ষমেলার নামে অন্যান্য দোকান বসানো প্রসঙ্গে সাদমান সাম্য বলেন, যথাসময়ে সিটি করপোরেশনের অনুমতি না পাওয়ায় বৃক্ষ নিয়ে কাজ করেন এমন সবাইকে আনা সম্ভব হয়নি। মেলায় মানুষকে আকৃষ্ট করতেই গাছের পাশাপাশি খাবার ও প্রসাধনীসহ বিভিন্ন সামগ্রীর দোকান রাখা হয়েছে। তবে মানুষের হাঁটাচলা ও ব্যায়ামের জায়গায় কোনো দোকান বসানো হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, ‘আমরা বৃক্ষমেলা করার জন্য অনুমতি দিয়েছি। এর বাইরে কিছু করলে মেলার অনুমতি বাতিল করে সব তুলে দেওয়া হবে।’

পার্কে নিয়মিত হাঁটতে আসা তাসলিমা জাহান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পুরান ঢাকায় খোলা জায়গা এমনিতেই নেই। এই ছোট পার্কটুকু মানুষ হাঁটা, বসা ও একটু স্বস্তির জন্য ব্যবহার করে। এখন এখানেও যদি বাঁশ গেড়ে বাজার বসানো হয়, তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? ১০ দিনের কথা বলে আজ একজনকে দিলে কাল আরেকজন চাইবে। পার্ক রক্ষা করার দায়িত্ব যাদের, তারাই যদি দোকান বসানোর অনুমতি দেয়, তাহলে দখলদারকে ঠেকাবে কে?’ পার্কের বাইরের এক দোকানি বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘কে ঠেকাইবে, কে বলবে, যে বলবে তারে তো দিবে মাইর। এই আওয়ামী লীগ, এই বিএনপি, সবই এক।’

বাহাদুর শাহ পার্ককে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে পার্কের জায়গা ইজারা দিয়ে খাবারের দোকান চালুর সুযোগ দিয়েছিল ডিএসসিসি। সে সময় গণমাধ্যমে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সংগঠন আন্দোলনে নামে। ঐতিহাসিক পার্ককে বাণিজ্যিকীকরণের প্রতিবাদে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়। তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত সেই ইজারা বাতিল করে খাবারের দোকান সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছরের মাথায় আবারও নাম বদলে ‘বৃক্ষমেলা’র মোড়কে পার্কটিতে দোকানের সারি বসানো হলো।

ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্ক পুরান ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান, যা একসময় ‘আন্টাঘর’ নামে পরিচিত ছিল। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের স্মৃতিবিজড়িত এই পার্কটির নাম ব্রিটিশ আমলে ছিল ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’। পরে শেষ মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহর নামে এর নামকরণ করা হয়। চারপাশে ঘনবসতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক এলাকা থাকায় এই পার্কটি স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন হাঁটা ও বিশ্রামের একমাত্র উন্মুক্ত স্থান।

ঢাকায় মাঠ ও পার্কের তীব্র সংকটের বিষয়টি সরকারি-বেসরকারি গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে। দুই সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪১টিতে কোনো খেলার মাঠ নেই, যার মধ্যে ঢাকা দক্ষিণেরই রয়েছে ৩১টি। অথচ গত জুলাই মাসে জাতীয় সংসদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, খেলার মাঠ ও ফুটপাত থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদে সরকার বদ্ধপরিকর এবং ঢাকার অধিকাংশ পার্ক ও মাঠ ইতিমধ্যে দখলমুক্ত করা হয়েছে। এই ঘোষণার সঙ্গে বাহাদুর শাহ পার্কের বর্তমান চিত্রের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে নগর-পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, পার্ক কোনো বাণিজ্যিক মেলার মাঠ নয়। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে প্রতিটি পার্ক ও মাঠ নাগরিকদের জন্য সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। সাময়িক অনুমতির নামে দোকান বসানোর এই সংস্কৃতি পরে নিয়মে পরিণত হয়। পার্ক এবং খেলার মাঠ যাতে অন্য কোনো বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার না হয়, সেদিকে কঠোর দৃষ্টি দিতে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo