বিপিসির ৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিয়ম ভেঙে বারবার পদোন্নতির অভিযোগ

- আপডেট সময় : ০৩:১৯:৪৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় সুপারিশে নিয়ম লঙ্ঘন করে নিয়োগ পাওয়ার পর বছর বছর পদোন্নতি বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ছয় বিতর্কিত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগের পতন হলেও তাদের এই পদোন্নতির ধারা অব্যাহত থাকায় বিপিসি ও এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। চাকরির নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ না হতেই উচ্চগ্রেডের বেতন ও অন্যান্য সুবিধা ভোগ করায় রাষ্ট্রের প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন উপমহাব্যবস্থাপক এস এম জুবায়ের হাসান, সিরাজাম মুনীরা ও মোহাম্মদ নাজিম উদ্দীন এবং ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার আমেনা ফেরদৌসী ও ইসতিয়াক হোসেন। নিয়োগ থেকে শুরু করে প্রতিটি পদোন্নতিতে নিয়ম লঙ্ঘনের যাবতীয় ডকুমেন্ট এখন প্রতিবেদকের হাতে। তবে বিপিসি কর্তৃপক্ষের দাবি, সুপিরিয়র সিলেকশন কমিটির সিদ্ধান্তেই পদোন্নতি হয়েছে এবং কাউকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হয়নি।
বিপিসির চাকরি প্রবিধানমালা-১৯৮৯ অনুযায়ী, ব্যবস্থাপক পদে ৫০ শতাংশ পদোন্নতি ও ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের বিধান থাকলেও বিপিসি প্রতিষ্ঠার পর থেকে সব পদ শতভাগ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হয়েছে। ২০২১ সালের ১৩ এপ্রিল সিনিয়র সিলেকশন কমিটির সুপারিশে পাঁচজন উপব্যবস্থাপককে ৬ মে সরাসরি ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়, যা প্রবিধানমালার সরাসরি লঙ্ঘন। এই তালিকায় ছিলেন এস এম জুবায়ের হাসান, সিরাজাম মুনীরা, মোহাম্মদ নাজিম উদ্দীন, মো. মিজানুর রহমান ও আমেনা ফেরদৌসী। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২ জুলাই এস এম জুবায়ের হাসান, সিরাজাম মুনীরা ও মোহাম্মদ নাজিম উদ্দীনকে উপমহাব্যবস্থাপক পদে এবং ১০ জুলাই ইসতিয়াক হোসেনকে ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। প্রবিধানমালা অনুযায়ী উপব্যবস্থাপক পদে পূর্ণ গ্রেড পেতে ৫ বছর, ব্যবস্থাপক পদে ১০ বছর এবং উপমহাব্যবস্থাপক পদে ১২ বছর চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার কথা থাকলেও অভিযুক্তরা নির্ধারিত সময়ের দুই থেকে তিন বছর আগেই উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা ভোগ করছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর চট্টগ্রাম জেলা সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকতার কবির বলেন, জ্বালানি খাতে এমন অভিযোগ নতুন নয়। সাধারণ মানুষ গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও এই খাতের কর্মকর্তারা ব্রুনাই রাজার মতো জীবনযাপন করেন। ১০ বছরের চাকরির পর যে সুবিধা পাওয়ার কথা, সাত বছরেই তা নেওয়া ভয়াবহ দুর্নীতি। এ ধরনের অনিয়মের বিচার না হলে জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে না।
এস এম জুবায়ের হাসান ২০১০ সালের ১ নভেম্বর সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে যোগ দেন। ২০১৪ সালের ২৬ জুন তিনি উপব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পান, যেখানে তার চাকরিকাল ছিল মাত্র ৩ বছর ৭ মাস ২৫ দিন। অথচ ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার শর্তে ২০১৫ সালের ১ নভেম্বর তার পদোন্নতি পাওয়ার কথা ছিল। তিনি ১৬ মাস আগে থেকেই উচ্চতর গ্রেডের পূর্ণ বেতন ও আনুষঙ্গিক সুবিধা ভোগ করছেন। একইভাবে মো. নাজিম উদ্দীন ২০১৪ সালের ১৩ আগস্ট উপব্যবস্থাপক হিসেবে যোগ দেন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ৩৩ বছর বয়সসীমার শর্ত লঙ্ঘন করে তিনি ৩৪ বছর ৫ মাস ৬ দিন বয়সে চাকরিতে প্রবেশ করেন। ২০২১ সালের ৬ মে তিনি ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পান, যেখানে ১০ বছর চাকরিকালের শর্ত থাকলেও তিনি ৬ বছর ৮ মাস ১৪ দিনে তা পান। এতে তিনি ৩৯ মাস অতিরিক্ত সুবিধা ভোগ করছেন। ২০২৫ সালের ২ জুলাই তিনি উপমহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পান, যা ১২ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল ২০২৬ সালের ১৩ আগস্ট।
মোছা. সিরাজাম মুনীরা ২০১৪ সালের ২৯ জুন উপব্যবস্থাপক হিসেবে যোগ দেন, তখন তার বয়স ছিল ৩৩ বছর ৭ মাস ৩০ দিন, যা নির্ধারিত বয়সসীমার বাইরে। ২০২১ সালের ৬ মে তিনি ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পান, যেখানে ১০ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালের ২৯ জুন। তিনি ৩৮ মাস আগে থেকেই বাড়তি সুবিধা নিচ্ছেন। ২০২৫ সালের ২ জুলাই উপমহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পাওয়ার সময় তার মোট চাকরিকাল ছিল ১১ বছর ৩ দিন, অথচ ১২ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা ভোগ করছেন। এছাড়া মো. মিজানুর রহমান ও আমেনা ফেরদৌসী ২০১২ সালের ২৯ এপ্রিল যোগ দিয়ে ২০১৬ সালের ১৩ জানুয়ারি উপব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পান, যেখানে ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার শর্তে তাদের ২০১৭ সালের ২৯ এপ্রিল পদোন্নতি পাওয়ার কথা ছিল। মো. ইসতিয়াক হোসেন ২০১৬ সালের ২৭ জুন উপব্যবস্থাপক হিসেবে যোগ দিয়ে ২০২৫ সালের ১০ জুলাই ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পান।
অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের দাবি, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিলেকশন বোর্ড যাচাই-বাছাই করেই পদোন্নতি দিয়েছে এবং কোনো নিয়ম লঙ্ঘন হয়নি। তবে বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা জানান, অভিযোগের বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে এবং একটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তদন্ত চলমান থাকায় মন্তব্য করা সমীচীন নয়, তবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



























