দিল্লিতে হাসিনার সংবাদ সম্মেলন ও দেশে ফেরার ঘোষণা নিয়ে বিশ্লেষকদের মত
- আপডেট সময় : ১১:৪৯:০৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বুধবার ভারতের নয়াদিল্লিতে ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে একটি সংবাদ সম্মেলন করেছেন। ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দমনের চেষ্টার সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত পলাতক আসামি। দেশে তাঁর দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দক্ষিণ এশিয়ার ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে অনলাইনে যুক্ত হয়ে তিনি প্রথমে বক্তব্য দেন এবং পরে প্রশ্নের উত্তর দেন। দুই বছর ধরে দিল্লিতে অবস্থান করে তিনি বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিও বার্তা বা ই-মেইলে সাক্ষাৎকার দিলেও দিল্লির কোনো অনুষ্ঠানে সরাসরি অনলাইনে যুক্ত হওয়ার এটিই প্রথম ঘটনা।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, এই ঘোষণার পেছনে তিনটি সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, তিনি হয়তো মনে করছেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীন বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ অন্তর্বর্তী সরকারের চেয়ে তাঁর জন্য বেশি অনুকূল। দ্বিতীয়ত, তিনি আদালতে নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে নিজের নাম কলঙ্কমুক্ত করতে চাইতে পারেন। তৃতীয়ত, তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেশে ফিরে অবসর জীবন কাটাতে ও সেখানেই মৃত্যুবরণ করতে চাইতে পারেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের এক জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, তিনি বিশ্বাস করেন শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফিরতে চান এবং দলের নেতা-কর্মীদের আনুগত্যের প্রতিদান দিতে চান। তবে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও বর্তমান সমালোচক মাহমুদুর রহমান মান্না এই ঘোষণাকে নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন সিকদারের মতে, দেশে ফেরার হুমকি দিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে চান।
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁকে প্রায় নিশ্চিতভাবেই বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার করা হবে। কুগেলম্যানের মতে, তাঁর প্রত্যাবর্তন সমর্থক ও বিরোধী উভয় পক্ষকেই সক্রিয় করে তুলতে পারে, যা সহিংস সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়াবে এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করবে। অধ্যাপক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন সিকদার এএফপিকে বলেন, ভারত থেকে ফেরার পর সরাসরি কারাগারে নেওয়া হলেও সরকার তাঁকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়, বরং এটি রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করবে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানান, সরকার শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারতকে চিঠি দিয়েছে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রস্তুত আছে।
এই সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ সরকার ভারত সরকারের কাছে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ। এর আগে ৩ আগস্ট পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে সতর্ক করেছিলেন যেন ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া না হয়। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল দাবি করেছেন, এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং সেখানে প্রকাশিত কোনো মতামতকে তারা সমর্থন করে না।
মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, ভারত চাইলে এই সংবাদ সম্মেলন ঠেকাতে পারত, তাই ঢাকা একে দীর্ঘদিনের মিত্রকে প্রশ্রয় দেওয়ার উদাহরণ হিসেবে দেখবে। ওপি জিন্দাল গ্লোবাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পথে এটি ধীরগতি বজায় রাখবে। দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তি চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। এছাড়া ভারতের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি, কারণ ৪ হাজার ১০০ কিলোমিটার সীমান্ত ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা ঢাকার সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারত বাংলাদেশের প্রতি ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলেও শেখ হাসিনার বিষয়টি এখনো বড় বিতর্কের কারণ হয়ে আছে।
























