চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘ডেভিড ইমন’ যেভাবে অপরাধ জগতের আতঙ্ক

- আপডেট সময় : ০৬:৩০:৪৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের এক সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান মোবারক হোসেন। বাবা মো. মুসার অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা মোবারক খুব অল্প বয়সেই পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ফেলেন। শৈশব ও কৈশোর ফটিকছড়িতে কাটলেও বড় কিছু করার আকাঙ্ক্ষা ও দ্রুত প্রভাব বিস্তারের নেশায় তিনি পাড়ি জমান বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। অপরাধ জগতে নিজের ভয়ংকর ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি গড়তে তিনি নিজের নামের সঙ্গে ‘ডেভিড’ উপাধি যুক্ত করেন। অনুসারীদের কাছে তিনি ‘ডেভিড ভাই’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং দামি ঘড়ি, বিদেশি ব্র্যান্ডের পোশাক ও বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্টাইলিশ ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে তিনি লাখের বেশি অনুসারীও গড়ে তুলেছিলেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মোবারক হোসেন ইমন অপরাধ জগতের মূল ধারায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি বিদেশে পলাতক চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদার সাজ্জাদ আলী খান ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’-এর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং তার ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। সাজ্জাদ বাহিনীর ‘ছোট সাজ্জাদ’ কারাবন্দি হওয়ার পর অপরাধ সাম্রাজ্যের বড় অংশ ইমনের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা, রাউজান ও হাটহাজারীকে কেন্দ্র করে তিনি অর্ধশতাধিক তরুণ ও কিশোর গ্যাং সদস্য নিয়ে বিশাল ক্যাডার বাহিনী গড়ে তোলেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ডেভিড ইমন অন্তত সাতটি জোড়া ও একক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়ার জোড়া খুন, ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে সন্ত্রাসী ‘ঢাকাইয়া আকবর’ হত্যাকাণ্ড এবং ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট আনিস ও মোহাম্মদ হাসানকে ব্রাশফায়ার করে হত্যার ঘটনায় তার নাম উঠে আসে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যবসায়ী, ডেভেলপার ও ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি ও টেন্ডারবাজিতে তিনি সক্রিয় ছিলেন। গত জুলাই মাসে বাকলিয়ার ‘ডিজিটাল ডট নেট’ (ডিডিএন) প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি এবং টাকা না পেয়ে সশস্ত্র হামলায় ৩৫ লাখ টাকা লুট ও ভাঙচুরের সিসিটিভি ফুটেজ দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। দক্ষিণ পাহাড়তলীতে নির্মাণাধীন ভবনে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। গত ২৭ জুলাই বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে তার দুই সহযোগী আসিফ ও সাইদুল ইসলাম আরিফকে বিদেশি পিস্তলসহ গ্রেপ্তারের পর পুলিশ তার অবস্থান শনাক্ত করে। অবশেষে মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দিবাগত রাতে যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার ধুমধুমপুর এলাকা থেকে চট্টগ্রাম ও যশোর জেলা পুলিশের যৌথ অভিযানে তিনি গ্রেপ্তার হন।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানান, তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে। সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মো. রইছ উদ্দিন বলেন, ডেভিড ইমনের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে একটি বড় অপরাধ সিন্ডিকেটের মূল উৎপাটন সম্ভব হয়েছে। অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মো. এহসানুল হক একে সমাজের জন্য অশনি সংকেত হিসেবে উল্লেখ করে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর জোর দিয়েছেন। সুজন চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সাধারণ সম্পাদক আকতার কবির চৌধুরী এই গ্রেপ্তারকে ইতিবাচক বললেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।


























